হোম » প্রধান সংবাদ » “ছেতেম বেপারী”

“ছেতেম বেপারী”

শেখ হান্নান: গ্রামে বেশ কয়েকজন মৌসুমী বেপারী আছে। সরিষা, কলাই, গম, ধান, পাট গ্রামের মানুষ যখন যেটা বিক্রি করে, তখন তারা সেটাই কেনে। এরা ফরিয়া হলেও এদের বেপারী বলে। প্রতিদিনই তারা একাট্টা হয়ে সিন্ডিকেটের মতো জিনিসের দাম নির্দ্ধারণ করে, কৃষকের কাছ থেকে স্বল্পমূল‍্যে কৃষিপণ‍্য ক্রয় করে। এই সব বেপারীদের কথা হলো- ‘জিনিস কেনার সময় লাভ করতে না পারলে বিক্রয়ের সময় লাভ হবে না’। এছাড়াও ওজনের কমবেশি, হেরফেরতো করেই। কারণ গ্রামের মানুষের পণ‍্যের দাম যাচাই করার সুযোগ নাই।

ছেতেম বেপারী ওদের মতো নয়। বিক্রেতাকে ঠকিয়ে, নয়ছয় করে জিনিস না কেনা, তার ইমানী বিষয়। তার চাই হলাল ব‍্যবসা, হালাল রুজি। কাজেই লাভ কম হলেও অসুবিধা নেই। ছেতেমের অসুবিধা এবং কষ্টের মধ‍্যে অসময়ে তার স্ত্রী বিয়োগ। তাও মাসচারেক হলো। ঠান্ডা জ্বর আর শ্বাসকষ্ট। এই সামান‍্য অসুখে মানুষ মারা যায়, ভাবা যায় না। সদর হাসপাতালের ডাক্তার পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বলেছিল রোগীর করোনা অসুখ হয়েছে। শেষাব্দী ছেতেমকে নিঃসঙ্গ করে পরলোক যাত্রী হলেন। স্ত্রীর লাশ এ‍্যাম্বুলেন্সে করে এনে সরাসরি দাফন করা হয়। স্ত্রীর করোনা হয়েছিল, ছেতেম আজ পযর্ন্ত সেই কথা কাউকে বলে নাই। তার সংসারে একটা মেয়ে আছে তাকেও বলে নাই। কারণ করোনা আছে এ কথা এখনো সে বিশ্বাস করেনা।

ছেতেমের স্ত্রীর মৃত‍্যু বেদনাকর হলেও পাড়াপ্রতি অহরহই দ্বিতীয় পরিবার গ্রহণের পরামর্শ, প্রস্তাব দিয়ে আসছে। বলাপ্রয়োজন নইমুদ্দিনের ভগ্নিপতি গোলেনুরের স্বামী নববিবিহিত যুবক প্রায় দুইমাস পূর্বে মাঠে বরোধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে নিহত হয়। অর্থাৎ গোলেনুর বিধবা। আকারে ইঙ্গিতে, কখনো ঘটক কখনো নইমুদ্দিন সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব রাখে। কিন্তু ছেতেম বিষয়টি হ‍্যা বলেনা আবার নাও করেনা। কারণ ছেতেমের অনেক বোঝার আছে, অনেক হিসেব আছে। সেই সাথে ঘরে তার তিন বছরের একটি মেয়েও আছে।

শ্রাবণ মাসের শেষের দিক। দুদিন ধরে ক্ষণেক্ষণে বৃষ্টি, কখনো একটানা বৃষ্টি। শ্রাবণের অবিরাম বর্ষণ মানুষের বিরহী মনকে বিষন্নভাবালুতায় আচ্ছন্ন করলেও বৃষ্টির আড়ি সত্বেও নানা ভাবনার বিষয় মাথায় নিয়ে ছেতেম বেপারী নইমুদ্দিন মন্ডলের বাড়িতে ধান কিনতে এসেছে। সাথে দুইজন সহকারী।

গোলেনুর বর্ষার অবিরাম বারিধারার হাহাকারি বর্ষণ, স্বামীহারা হ্নদয়ের সমগ্র বিরহবিষন্নতা নিয়ে বারান্দার খুটি ধরে দাঁড়িয়ে আছে। মায়াবী চেহারা ছলছল চোখের অবয়বে নিঃঙ্গতা আর স্বামী হারানোর বিরহী সুর, টিনের চালে বৃষ্টির শব্দে গোলেনুর যেন শুনতে পাচ্ছে। বৃষ্টি হচ্ছে মুশলধারে। কাক ভেজা হয়ে ছেতেম বাড়িতে ঢুকেই দেখে গোলেনুর। ছেতেম দৌড়ে গিয়ে গোলেনুরের পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো-

-নইমুদ্দিন ভাই কই? গোলেনুরও জানে ছেতেম বেপারীর সাথে তার সমন্ধের কথা হচ্ছে। হঠাৎ তার সামনে ছেতেম বেপারী। তাই বৃষ্টির ভাবনা তিরোহিত হয়ে গোলেনুর অপ্রস্তুতভাবে উত্তর দিলো-
-ভাই হাটখোলা গেছে। আপনারে ধান
মাইপা নিতে কইছে।
-এইডা কথা হইলো! ধানের মালিক
নাই, আমি তার ধান কিনা নিয়া যাই।
আমি এ কাম পারমু না।
-না! অসুবিধা নাই। আমি তো আছি। ছেতেম গোলেনুরের কথা সন্তুষ্ট হয়ে দুই সহযোগীকে হুকুম দিলো বেড় থেকে ধান নামাতে। বৃষ্টি আরো জোরে ঝুমঝুম শব্দে পাগলা হাওয়ায় মাতালের মতো পড়তে লাগলো। ছেতেম অশিক্ষিত হলে আজ তার নিঃসঙ্গ বিরহী মনটা আনচান করে উঠলো। মনে হলো বর্ষণমুখরতা মানুষের মনে বিরহ সৃষ্টি হলে ধান কিনতে এসে এ যেন ছেতেমের ভাবিপ্রিয়ার সাক্ষাত মিলন অভিসার।

ছেতেমের কাছে হেরে গেলো কালিদাসের মেঘদূত। ছেতেম অপলক নেত্রে দেখতে লাগলো গোলেনুরের সুন্দর দেহবল্লরী। এই ধানের বেপারীর আরো মনে হলো বর্ষণ চলুক, বৃষ্টি না থামুক, আকাশ আরো মেঘলা হোক। ঘড়ির কাটা থেমে থাক একই স্থানে। গোলেনুরের বুঝতে বাকি রইলো না ছেতেমের চোখের ভাষা, মনের আকুতি, হ্নদয়ের সমগ্র অনুভূতির যাচনা। অবস্থা বোঝে গোলেনুর বললো-
-ভাইয়ের আসতে দেরি হইবো।
চলেন বেড় থেইকা ধান নামাইয়া
মাইপা ফালাই।
-হ‍্যাঁ চলো।

ধানে পাল্লা ধরলো ছেতেম। সামনে মায়াবী মমতায় জড়ানো আকর্ষণীয় হাস‍্যোজ্জ্বল চেহারা এবং মাঝে মধ‍্যে মুক্তাঝরানো হাসির ঝিলিক নিয়ে পরিমাপ পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো গোলেনুর। ছেতেম ধান মাপছে-
-আরে লাবিস লা, লাবিস লা।
গারোস গা, রারোস বা, পোনাট
পো, পোনাট পো, এই দাড়ি ষোল। এই ভাবে ধানের মাপ বার বার ভুল হচ্ছে, ভুল হয়েছে। কতধান মেপেছে, কত বস্তা ভরেছে ছেতেম কিন্তু ধান মাপের বোল আর সুর ছন্দের এমন ভুল, গড়পর আগেতো কখনো হয়নি। একপাল্লা ধান মাপে আর চোখ পরে গোলেনুরের অনিন্দ‍্য সুন্দর চেহারায়। মানুষের মনোজগতের প্রিয় মানুষের অনুসঙ্গ, বর্ষা বিরহের সমান্তরাল হয়ে প্রবাহিত জীবন, নদীর জোয়ার ভাটায় বয়ে চলে সবসময়। সহযোগী দুজন ধান নিয়ে চলে গেলেও ধানের টাকা গোলেনুরের হাতে দিলো ছেতেম। টাকা গুণতেও বারবার ভুল হচ্ছে ছেতেমের। কোনো রকমে টাকা গুলো গোলেনুরের হাতে দিয়ে, বেসামাল ভুল মাপের ধান কিনে, ছেতেম এখন বাড়ির পথে। পেছনে তাকিয়ে দেখে গোলেনুর তাকিয়ে আছে ছেতেমের দিকে। হয়তো বর্ষা বিরহ কেটে নতুন সম্পর্ক স্থাপনের সোনালি আশায়। মন্দ কি ধানের বেপারী!
(অনুগল্প)”

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!