
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের প্রসঙ্গটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ বলছেন এটি পরিবর্তন করা দরকার আবার কেউ কেউ বলছেন এটি পরিবর্তন করা ভাল কিছু বয়ে আনবেনা বরং সংকট সৃষ্টি করবে, জাতিকে বিভক্ত করবে। তবে গানটি যে প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল সেটি ছিল বাংলাদেশ ধারনার একেবারেই পরিপন্থি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সমর্থনে এই গানটি রচিত হয়েছিল। বাউল গায়ক গগন হরকরার গান “আমি কোথায় পাব তারে আমার মনের মানুষ যেরে’’ এই গানের সুর নকল করে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর তৎকালীন নদীয়া জেলা বর্তমানে কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহ কুঠিতে বসে গানটি রচনা করেছিলেন।
১৯০৫ সালে প্রকাশিত রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের “বাউল” নামক গ্রন্থে গানটি অন্তর্ভুক্ত আছে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন ছিল পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের মানুষের অধিকার খর্ব করার আন্দোলন। বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য আয়োজিত ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট একটি প্রতিবাদ সভায় কলকাতা টাউন হলে সর্বপ্রথম এই গানটি গাওয়া হয়। ওই বছরই ৭ সেপ্টেম্বর (১৩১২ বঙ্গাব্দের ২২ ভাদ্র) সঞ্জীবনী পত্রিকায় রবিন্দ্রনাথের স্বাক্ষরে গানটি মুদ্রিত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদদের ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদ কর্তৃক ১৯৫৩ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি আমার সোনার বাংলা গান এদেশে প্রথমবার পরিবেশন করা হয়। এরজন্য অবশ্য কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করেছিল। কারন পাকিস্থান আমলে বিভিন্ন কারনে রবিন্দ্রচর্চা এদেশে একপ্রকার নিষিদ্ধই ছিল বটে।
১৯৫৩-১৯৫৪ সালের ঢাকসুর অভিষেক অনুষ্ঠানে গানটি দ্বিতীয়বার গাওয়া হয়। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে পশ্চিম পাকিস্থানের কিছু গণপরিষদ সদস্যদের সম্মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ও কাজী নজরুল ইসলামের গানের পাশাপাশি লোকগান পরিবেশন করা হয়। পূর্ব পাকিস্থানের তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সেই অনুষ্ঠানে রবিন্দ্র সঙ্গীতজ্ঞ সনজীদা খাতুনকে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইবার জন্য অনুরোধ করেন। সনজীদার মতে পাকিস্থানিদের কাছে গানটির প্রতি প্রীতি ও ভালোবাসার জানান দিতে এবং গানটি বাঙালিকে কতখানি আবেগ তাড়িত করে তা বোঝানোর জন্যে অতিথিদের গানটি তিনি শোনাতে চেয়েছিলেন। আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারির পর ১৯৫৮ সালে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বাজ্ঞালিপনা এবং রবীন্দ্র চর্চাকে পাকিস্থান বিরোধী আচরন হিসেবে দমন করার হুসিয়ারী প্রদান করে। তৎকালীন নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্তে¡ও ১৯৬১ সালে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবিন্দ্র জয়ন্তি উৎযাপন করা হয়।
১৯৬৭ সালে পাকিস্থানের জাতীয় সংসদেও রবিন্দ্রনাথ বিষয়ে সরকারী ও বিরোধীদলের মধ্যে তুমুল বাকবিতন্ডা হয় এবং এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে রবিন্দ্র সংগীত চর্চা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ করা হয়। তারপর বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। ৩ জানুয়ারি ১৯৭১ সালে ঢাকার পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ আয়োজিত এক জনসভায় গানটি গাওয়া হয়। একই দিন রাতে শেখ মুজিবুর রহমান তার জামাতা ও বড় মেয়ে শেখ হাসিনার স্বামী এম এ ওয়াজেদ মিয়াকে ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্থান স্বাধীন হলে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানকে গ্রহণ করার উপদেশ দেন। ১ মার্চ ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হওয়ার দুই দিন পরে ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভা শেষে ঘোষিত স্বাধীনতার ইশতেহারে এই গানকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শুরু হওয়ার আগেও গানটি গাওয়া হয়। আবার ২৩ মার্চ স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা কুচকাওয়াজে গানটি গাওয়া হয়। ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ সালে প্রবাসি বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে মুজিবনগরে এই গান জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গাওয়া হয়। যুদ্ধ চলাকালে আমার সোনার বাংলা গানটি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত পরিবেশিত হতো এবং সেই সময় গানটির বর্তমান প্রচলিত যন্ত্রসুর করেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরকার অজিত রায়। ১৯৭২ সালের ১৩ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ভূমিকা বিবেচনা করে আমার সোনার বাংলা গানটির প্রথম দশ চরণ সদ্যগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত হয়। ১৯৭৮ সালে জাতীয় সংগীত গাওয়ার জন্য সরকার কর্তৃক পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশ স¦াধীন হওয়ার আগে যেকোন আন্দোলন- সংগ্রামে প্রতিবাদ হিসেবে আমার সোনার বাংলা গানটি গাওয়া হতো। তাইতো গানটি গাইতে গাইতে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে বিনাতর্কে জায়গা করে নিয়েছে।
রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার সোনার বাংলা গানটি যেসকল কারনে বিতর্কিত তার মধ্যে এখানে বাংলা বলতে শধু বাংলাদেশকে বুঝায় না সাথে পশ্চিম বাংলাকেও বুঝিয়েছেন। সেকারনে এটি শুধু বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের পরিপূর্ন পরিচয় বহন করেনা। তাছাড়া গানটি বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রচিত বিধায় এটি তৎকালীন বাংলাদেশের মানুষের অধিকার হরনের সাথে যুক্ত। বঙ্গভঙ্গ বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ন অধ্যায়। অতীতে বঙ্গপ্রদেশের আয়তন ছিল ৪ লক্ষ ৯০ হাজার বর্গ কিঃ মিঃ এবং এর জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৮৫ লক্ষ। এত বিস্তৃত এলাকা একটি মাত্র প্রশাসনের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। তাছাড়া তৎকালীন বঙ্গপ্রদেশ অর্থ্যাৎ বাংলাদেশসহ পূর্বাঞ্চল শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে খুবই দুর্বল ছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার দরুন এবং এ অঞ্চলের উন্নতির কথা চিন্তা করে ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পূর্ববঙ্গ ও আসামকে নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ করা হয় এবং ঢাকাকে করা হয় এর রাজধানী।
১৯০৫ সালের ১৯ জুলাই বঙ্গভঙ্গ ঘোষনা আর ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করা হয়। এর মাধ্যমে সংখাগরিষ্ঠ মুসলমান অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলের উন্নতির সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘকাল ধরে কলকাতার বুনিয়াদি হিন্দুরা যে সর্বক্ষেত্রে বিস্তৃত সুবিধা পেত সেটির পরিধি কিছুটা খর্ব হয়। এটি রবিন্দ্রনাথের পরিবারসহ কলকাতার হিন্দু জমিদার শ্রেণী মেনে নিতে পারে নাই। যার ফলে বাংলাকে ভাগ করা হয়েছে এই অযুহাতে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে কলকাতাসহ পশ্চিমবাংলায় ব্যাপক রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। পশ্চিম বাংলার হিন্দু জমিদার শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতায় এ অঞ্চলে প্রতিবাদের নামে সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। ভারতে সর্বপ্রথম গোপন বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলেন মহারাষ্ট্রের বাসুদেব পাদকে। মহারাষ্ট্রের মতো বাংলায়ও বহু বিপ্লবী গুপ্ত সংগঠন গড়ে উঠে। এদের মধ্যে কলকাতার যুগান্তর এবং ঢাকার অনুশীলন সমিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯০১ সালে অনুশীলন সমিতি গঠিত হলেও প্রমথনাথ ১৯০৫ সালে বিপিন চন্দ্র পালের সাথে ঢাকায় এসে অনুশীলন সমিতির দ্বিতীয় প্রধান কার্যালয় স্থাপন করেন। চিত্তরঞ্জন দাস ও অরবিন্দু ঘোস এ সমিতির জন্য বহূ অর্থ ব্যয় করেন। ঢাকায় অনুশীলন সমিতির নেতা ছিলেন পুলিন বিহারী দাস। সন্ত্রাসবাদীদের দ্বিতীয় দল যুগান্তর সমিতি ১৯০৬ সালে কলকাতায় জন্ম হয়। অরবিন্দু ঘোসের নেতৃত্বে এই সংগটনটি যাত্রা শুরু করে। একইভাবে বরিশালের স্বদেশী বান্ধব, ফরিদপুরের ব্রতি, ময়মনসিংহের সাধনা ইত্যাদি সংগঠন আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন আদায় করতে থাকে। বঙ্গভঙ্গ রদের নামে তারা অসহযোগ আন্দোলন থেকে শুরু করে ব্রিটিশপন্য বর্জন, চরমপন্থি ও উগ্রজাতীয়তাবাদী আন্দোলনসহ সর্বাত্বক সকল প্রকার প্রতিবাদ, আন্দোলন সংগঠিত করেছে। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের মূল হাতিয়ার শুধু পিস্তল, রিভলবারেই সীমাবদ্ধ ছিলনা বরং এসময় তারা বোমার অনুপ্রবেশ ঘটায় এবং আন্দোলনকে সহিংস করে তোলে ।
আর এ সকল সহিংস আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন অরবিন্দ ঘোষের পাশাপাশি বারীণ ঘোষ, হেমচন্দ্র কানুণগো প্রমূখ। হেমচন্দ্রতো রীতিমত বোমা তৈরির স্কুল খোলেন পাঁচ ছাত্রকে নিয়ে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংস ফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে তার তৈরি বোমাটিই নিক্ষেপ করেছিলেন ঐতিহাসিক ক্ষুদিরাম বসু কিন্তু ভুল করে কিংস ফোর্ডের গাড়ীর পরিবর্তে ব্যারিস্টার কেনেডির স্ত্রী ও কন্যার গাড়ীতে বোমা নিক্ষেপ করেন। এতে কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা উভয়ই নিহত হন। এই ঘটনার জেরে ১৯০৮ সালে বাংলার নিরিহ বিপ্লবী ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয় এবং পুলিশ বিভিন্নস্থানে হানা দিয়ে ৩৪ জন বিপ্লবীকে গ্রেফতার এবং বোমা বানানো বিষয়ক বইপত্র ও সরঞ্জাম আটক করে। ১৯০৭ সালে সুরাটে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস সম্মেলনে লাঠালাঠি, চেয়ার ভাঙ্গাভাঙ্গি, মাথা ফাটানোর মত ঘটনা ঘটে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে বেগমান করতে এসময় প্রচুর জাতীয়তাবাদী গান ও কবিতা লেখা হয়েছিল। কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর, সিরাজগঞ্জের রজনী কান্ত সেন, রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায় প্রভৃতি রচিত স্বদেশী গান বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলেছিল। বরিশালের চারনকবি মুকুন্দ দাসতো গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে আন্দোলনের পক্ষে মানুষের মনে দেশপ্রেম জাগাতেও সক্ষম হন।
রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর তার আমার সোনার বাংলা গানটি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনকে উৎসাহ যোগানোর জন্যই রচনা করে ছিলেন এটি নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের সুযোগ নেই। শুধু তাই নয় ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন ধার্য করা হয়- কংগ্রেস সেদিন দেশব্যাপি শোক দিবস পালন করে। কবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সেদিন বাঙালির ঐক্য ও ভাতৃত্বের প্রতিক হিসেবে রাখি-বন্ধন উৎসবের প্রচলন শুরু করেন। বঙ্গভঙ্গের মতো অবিবেচ্যতার বিরুদ্ধে প্রতিক হিসেবে একে অপরের হাতে রাখি বেধে দেন, শোক প্রকাশের চিহ্ন স্বরুপ সকলে উপবাস করেন, দোকান পাঠ ও অন্যান্য কাজকর্ম বন্ধ রাখেন, আত্ব সুদ্ধির জন্য সূর্যোদয়ের পূর্বে বন্দে মাতারাম গান গাইতে গাইতে খালি পায়ে হেটে গঙ্গা¯œানে যান ইত্যাদি। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দুদের মধ্যে উগ্র জাতীযতাবাদ জাগ্রত করাই ছিল এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য। এক পর্যায়ে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় এবং ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর এটি রদ করে দুই বাংলাকে আবার এক করে দেন। কলকাতার হিন্দু জমিদার শ্রেণী তথা বুদ্ধিজীবি, কবি-সাহিত্যিক, হিন্দু উগ্রজাতীয়তাবাদী রবি ঠাকুরদের এই অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ির কারনে শুধুমাত্র যে ঢাকা তার রজধানী হারায় তা নয় পাশাপাশি কলকাতা থেকেও ভারত বর্ষের রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর করা হয়। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে গিয়ে তারা নিজেদেরও অনেক বড় ক্ষতি ডেকে আনেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের বিষয়টি অনেকবারই উঠে এসেছে কিন্তু কেউই পরিবর্তনের জন্য জোড়ালো কোন উদ্যোগ গ্রহন করে নাই। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এর পর ক্ষমতায় এসেছিলেন খন্দকার মোস্তাক আহমেদ, তার ৮৩ দিন ক্ষমতার শাসনামলে যে কয়টি উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের উদ্যোগটিও ছিল। তখনকার কমিটি কাজী নজরুল ইসলামের চল চল চল এবং ফররুখ আহমেদের পাঞ্জেরী কবিতাটিকে জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করে। পরবর্তিতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আমলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রি শাহ আজিজুর রহমান প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ গানকে জাতীয় সংগীত করার প্রস্তাব করে। তৎকালীন মন্ত্রি পরিষদ বিভাগ একটি চিঠিতে রেডিও, টেলিভিশন এবং সরকারী অনুষ্ঠানে প্রথম বাংলাদেশ গানটি প্রচারের নির্দেশনা জারি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই গানটিকেও আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় সংগীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসলে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর আমির ও তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আলী আহসান মুজাহিদ জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের জন্য একটি যৌথ সুপারিশপত্র জমা দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রি বেগম খালেদা জিয়ার কাছে। তখনকার প্রধানমন্ত্রি বেগম খালেদা জিয়া দুই মন্ত্রীর সেই যৌথ সুপারিশকে সংস্কৃতি মন্ত্রালয়ে পাঠিয়ে দেন। সংস্কৃতি মন্ত্রালয় তাদের এখতিয়ার নয় বলে এটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করে।
তারপর এটি আর আলোর মুখ দেখেনি। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের বিষয়টি আবারও নতুন করে উঠে এসেছে জামায়াত ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আজমের সন্তান ব্রিগিডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহ হিল আমান আযমিরের এক বক্তব্যের মাধ্যমে। তিনি দীর্ঘ ৮ বছর হাসিনা সরকারের আয়না ঘরের বন্দিত্ব দশা থেকে মুক্ত হওয়ার পর ভার্চুয়াল একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেন- ‘আমি জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের বিষয়টি সরকারের উপড় ছেড়ে দিলাম কিন্তু এই জাতীয় সংগীত যেটা আছে সেটা আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্বের পরিপন্থি।’ এরপর থেকেই জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের বিষয়টি জোড়েসড়ে আলোচনায় উঠে এসেছে। কেউ বলছেন এটি পরিবর্তন করা সময়ের দাবী আবার কেউ বলছেল এটি পরিবর্তন করা সমীচিন হবেনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে এর পক্ষে বিপক্ষে ঝর উঠেছে। পরিবর্তনের পক্ষে বিপক্ষে নেটিজেনদের অবস্থান চোখে পরার মতো।
দেশের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকসহ এ বিষয়ে প্রতিবাদও ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশ উদিচি শিল্পগোষ্ঠিসহ একাধিক সাংস্কৃতিক সংগঠন জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের উদ্যোগের বিরুদ্ধে সারাদেশ ব্যাপি প্রতিবাদ জানিয়েছে। বাংলাদেশের মতো একটা স্পর্ষকাতর দেশে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের বিষয়টি সত্যি অনেক কঠিন হবে এতে সন্দেহ নাই। ২০২৪ সালের ছাত্রদের সফল গনঅভুত্থানের কারনে বিতর্কিত হাসিনা সরকারের পতন ঘটেছে এবং রাষ্ট্রের নানা জায়গায় পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। সেই ধারাবাহিকতায় জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনার শীর্ষে রয়েছে। অবশ্য জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের আদৌ কোন উদ্যোগ সরকার নেবে কিনা সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার কোন ধারনা দেওয়া হয় নাই। তবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের নজির রয়েছে। ২০০১ সালের ১ জানুয়ারী অষ্ট্রিয়ার জাতীয় সংগীত পরিবর্তন করা হয়েছে। অষ্ট্রেলিয়া, জার্মানী, কানাডার মত দেশেও জাতীয় সংগীতের আংশিক পরিবর্তন এসেছে। ২০০০ সালে রাশিয়ার জাতীয় সংগীতেও আংশিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ নেপালে ২০০৮ সালে নতুন জাতীয় সংগীত গৃহিত হয়েছে। আরেক প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্থানের জাতীয় সংগীত একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। এছাড়াও রুয়ান্ডা ও দক্ষিন আফ্রিকার জাতীয় সংগীতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
মোঃ মনিরুল ইসলাম
সিনিয়র ব্যাংকার, জনতা ব্যাংক পিএলসি.
রাজশাহী।

আরও পড়ুন
‘বাড়ি জামালপুরে’—এটুকুই মনে আছে; পরিচয়হীন অসহায় নারী খুঁজছেন স্বজনদের
শহীদ জিয়ার ৪৫তম শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সাকিব রাইয়্যানের উদ্যোগে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
কাউখালীতে মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার, ৪০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার