সকাল গড়িয়ে দুপুর। ক্লাস শেষে ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। কারো হাতে রুটি, কারো হাতে ডিম, কেউ আবার বিস্কুট আর কলা নিয়ে খুশিতে মেতে উঠেছে। হাসিমুখে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে খাবার খাচ্ছে তারা। এমনই এক আনন্দঘন দৃশ্য এখন ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিদিনের চিত্র।
সরকারের স্কুল ফিডিং কর্মসূচি যেন নতুন প্রাণ এনে দিয়েছে এই শিক্ষাঙ্গনে। শুধু পেট ভরানো নয়, এই কর্মসূচি শিশুদের মনে জাগিয়ে তুলছে স্কুলের প্রতি ভালোবাসা, তৈরি করছে নতুন আগ্রহ।
সম্প্রতি তজুমদ্দিন আইডিয়াল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ১৬০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনায় ব্যস্ত। ক্লাস শেষে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে পুষ্টিকর খাবার। সপ্তাহজুড়ে নির্ধারিত মেন্যু অনুযায়ী রবিবার ডিম-রুটি, সোমবার রুটি-দুধ, মঙ্গলবার বিস্কুট ও কলা এবং বৃহস্পতিবার রুটি-ডিম দেওয়া হয়।
এই খাবার সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছেন জেলার একজন ঠিকাদার। সরকারের পক্ষে তিনি প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। এরপর ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের মাঝে তা বিতরণ করা হয়।
খাবার পেয়ে শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে নির্মল আনন্দ। শিশুশ্রেণির শিক্ষার্থী সিদরাতুল মুনতাহা ছোট্ট কণ্ঠে জানায়, “স্কুলে এসে খাবার পাই, আমার খুব ভালো লাগে। ডিম-রুটি আমার সবচেয়ে পছন্দ। বন্ধুদের সঙ্গে বসে খেতে খুব মজা লাগে। তাই আমি প্রতিদিন স্কুলে আসতে চাই।”
তার এই সরল উচ্ছ্বাসই যেন বলে দেয় এই কর্মসূচি কতটা প্রভাব ফেলছে শিশুদের মনে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ জামাল উদ্দিন জানান, আগে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে চাইত না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। “খাবারের কারণে হলেও শিক্ষার্থীরা স্কুলমুখী হচ্ছে। এতে তাদের উপস্থিতি বেড়েছে, পাশাপাশি পড়াশোনার প্রতিও আগ্রহ তৈরি হচ্ছে,” বলেন তিনি।
অভিভাবকরাও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করছে না, বরং তাদের ভবিষ্যৎ গঠনের পথকেও সহজ করছে।
শিক্ষকরাও জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের হাতে খাবার তুলে দিতে পারা তাদের জন্য এক ধরনের তৃপ্তির বিষয়। এতে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ঘুরে দেখা যায়, একই চিত্র খাবার হাতে হাসিমুখে বাড়ি ফিরছে ছোট ছোট সোনামণিরা। অনেকেই আগে অনিয়মিত থাকলেও এখন নিয়মিত স্কুলে আসছে। খাবারের আকর্ষণ যেন তাদের বিদ্যালয়ের সঙ্গে এক অদৃশ্য বন্ধনে বেঁধে ফেলেছে।
উল্লেখ্য, সারা দেশের সঙ্গে একযোগে তজুমদ্দিন উপজেলায় ১১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই স্কুল ফিডিং কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। চাঁদপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ রেজাউল ইসলাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ রিয়াজুল আলম, সাবেক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম, গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থার অতিরিক্ত পরিচালক আজাদ হোসেনসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সরকারের এই উদ্যোগ শুধু একটি খাবার বিতরণ কর্মসূচি নয়—এটি শিশুদের জন্য আনন্দ, আগ্রহ আর নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।