
মোঃ মনিরুল ইসলাম
আগামী ৯ সেপ্টেম্বর আসন্ন ডাকসু নির্বাচন। এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশের প্রাচীনতম ও ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে চলছে উৎসব মুখর পরিবেশ ও নির্বাচনী প্রচারনা। ডাকসুর রয়েছে দীর্ঘ গৌরবময় ইতিহাস। দেশের সবচেয়ে প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ সালের ফলাফল স্থগিত হওয়া নির্বাচনসহ মোট ৩৮ বার কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ বার হয়েছে ব্রিটিশ ও পাকিস্থান আমলে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে মাত্র ৮ বার, তাও আবার ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের পর প্রথম ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে। সেবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ও ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয় ২০১৯ সালে। ডাকসু নির্বাচনের অতীত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর প্রায় সব নির্বাচনে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোই সাফল্য পেয়েছে ঘুরেফিরে। যদিও ২০১৯ সালের নির্বাচন ছিল ব্যতিক্রম ও একতরফা, যেখানে ছাত্রদলসহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনগুলির নির্বাচন করার নূন্যতম সুযোগও ছিলনা। মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ২০ মে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয় আটটি ছাত্রসংগঠন ভোটে অংশ নেয়। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে। ১৯৭২ সালের ডাকসুতে সহসভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচিত হন ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থী মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, যিনি পরবর্তীতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি হন এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে জয়ী হন একই সংগঠনের মাহবুব জামান। এই নির্বাচনে ছাত্রলীগের দুটি অংশের মধ্যে শহীদ-মনির পরিষদ (শেখ হাসিনার খালাতো ভাই শেখ শহীদুল ইসলাম ও মনিরুল হক চৌধুরী) একটি পদেও জয় পায়নি। আর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারন সম্পাদক শাজাহান সিরাজের নেতৃত্বাধীন সিরাজপন্থী ছাত্রলীগের জিনাত-মোয়াজ্জেম প্যানেল (জিনাত আলী ও মোয়াজ্জেম হোসেন) ডাকসুর একটি সদস্যপদে নির্বাচিত হয়।
পরবর্তী ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর। তবে ওই নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হলেও শেষ পর্যন্ত ফল ঘোষণা করা সম্ভব হয়নি। কারন ১৯৭৩ সালের ডাকসু নির্বাচনে ব্যালট বক্স ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটে। আগের বছর নির্বাচনে পরাজয়ের পর বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যৌথভাবে জোট গঠন করে প্যানেল প্রদান করে। ভিপি পদে প্রার্থী ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের নূহ-উল-আলম লেনিন ও সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন ছাত্রলীগের ইসমত কাদির গামা এবং আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে জাসদ ছাত্রলীগ অর্থাৎ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের ভিপি প্রার্থী ছিলেন মাহবুবুল হক এবং জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন জহুরুল ইসলাম। ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও সন্ধ্যার পর থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন হলে ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ফলে এই নির্বাচনের ফলাফল আর প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। বেশ কয়েক বছর বিরতির পর ১৯৭৯ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় ডাকসুর ৩য় নির্বাচন। তখন দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। এনামুল করিম শহীদের নেতৃত্বে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপির ছাত্রসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। তবে সেবার কোনো পদেই তারা জয়ী হতে পারেনি। এর আগে ১৯৭৩ সালের স্থগিত হওয়া নির্বাচনে একসঙ্গে থাকলেও এবার আলাদা আলাদাভাবে মাঠে নামে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। এই নির্বাচনে ৩ হাজার ২৩৭ ভোট পেয়ে ভিপি নির্বাচিত হন জাসদ ছাত্রলীগের মাহমুদুর রহমান মান্না। একই প্যানেলের আখতারুজ্জামান ২ হাজার ৭০০ ভোট পেয়ে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ডাকসুর ১৯টির মধ্যে ১৫টি পদে জয় পায় তাদের প্যানেল। এদিকে, হল সংসদ নির্বাচনে মোট ১৫১টির মধ্যে মান্না-সমর্থিত জাসদ ছাত্রলীগ জয় পায় ৮৯ টি পদে। তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছাত্রলীগ (কাদের-চুন্নু) জয়ী হয় মাত্র চারটি পদে। এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায় আগেরবারের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছাত্র ইউনিয়ন এবং ডাকসুতে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে মাহমুদুর রহমান মান্না সমর্থিত জাসদ ছাত্রলীগ।
স্বাধীনতার পর চতুর্থ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮০ সালের ১১ নভেম্বর। এই নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের মতো সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন মাহমুদুর রহমান মান্না এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হন আখতারুজ্জামান। আগের নির্বাচনে তাঁরা ছিলেন জাসদ ছাত্রলীগের প্রার্থী, তবে এবার অংশ নেন নবগঠিত বাসদ ছাত্রলীগের ব্যানারে। ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালের ডাকসুতে মাহমুদুর রহমান মান্নার কাছে ২ বারই পরাজিত হন বর্তমান আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। ১৯৮০ সালের ৭ নভেম্বর জাসদের একাংশ আলাদা হয়ে গঠন করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। মান্না ও আখতারুজ্জামান তখন বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে যুক্ত হন এবং ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বাসদ)-এর নেতৃত্বের দায়িত্ব পান মান্না। ভোটের ফলাফলে ভিপি পদে মান্না পান ৪ হাজার ৪৩১ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন ছাত্রলীগের ওবায়দুল কাদের, যিনি পান ২ হাজার ৫৬৫ ভোট। জিএস পদে জয়ী হন আখতারুজ্জামান, তিনি পান ৩ হাজার ১৮০ ভোট। খুব কাছাকাছি লড়াইয়ে ছাত্রলীগের বাহালুল মজনুন চুন্নু জিএস পদে হেরে যান মাত্র ১৫৭ ভোটে। এখানে ছাত্রদলের এম এ কামাল জিএস পদে উল্লেখযোগ্য পরিমান ১ হাজার ১৪৪ ভোট পেয়ে ভালকিছুর বার্তা প্রদান করেন। এই নির্বাচনে ডাকসুতে মান্না-আখতারুজ্জামান প্যানেল ছয়টি পদে জয়ী হয়। তবে বড় পরিবর্তন আসে হল সংসদে। প্রথমবারের মতো জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ১১টি হলে মোট ১৩২টি পদের মধ্যে ২১টিতে জয়ী হয় এবং ফজলুল হক, শহীদুল্লাহ হল ও জসীমউদ্দীন হলে ভিপি পদে এবং মুহসীন ও রোকেয়া হলে জিএস পদে জয় পায় তারা। যদিও ডাকসুতে গোলাম সারোয়ার মিলন ও এম এ কামালের নেতৃত্বে লড়ে কোনো পদ পায়নি ছাত্রদল। তবে হল সংসদে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও সক্ষমতার বার্তা প্রদান করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের পর এক বছরের ব্যবধানে ১৯৮২ সালের ২৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ডাকসু নির্বাচন। সেবারের নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) পদে জয় পান মান্না-সমর্থিত বাসদ ছাত্রলীগের আখতারুজ্জামান। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচিত হন জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। এদিকে ছাত্রদলের গোলাম সারোয়ার মিলন ও নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন প্যানেল হল সংসদে আগের বারের মতো এবারও দারুন সাফল্য বয়ে আনে। ১১টি হল সংসদে মোট ১৩২ আসনের মধ্যে ছাত্রদল জয় পায় ৬৫টিতে। এই নির্বাচনের পরিবেশ ছিল বেশ উত্তেজনাপূর্ণ ও সহিংস এবং গ্রেনেড বিস্ফোরণের মতো ঘটনাও ঘটেছিল সেবার।
দীর্ঘ সাত বছর বিরতির পর ১৯৮৯ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ডাকসু নির্বাচন। আগে থেকেই ছাত্রদলের প্রভাব ঠেকাতে একত্রিত হয় ছাত্রলীগসহ ৭ টি ছাত্রসংগঠন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র মৈত্রী, বাসদ ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্রলীগ (মু-না) এবং ছাত্রলীগ (সু-র) মিলে গঠন করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ফলাফলে দেখা যায়, ডাকসুর সব পদে জয় পায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ভিপি নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হন জাসদ ছাত্রলীগের মুশতাক হোসেন এবং সহকারী সাধারণ সম্পাদক হন ছাত্র ইউনিয়নের নাসির। অপরদিকে, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ছাত্রদলের শামসুজ্জামান দুদু ও আসাদুজ্জামান রিপন। এই নির্বাচনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ প্রায় সকল পদে জয়লাভ করলেও ছাত্রছাত্রীদের আশা আখাঙকা পূরনে সম্পূর্নরুপে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়। ছাত্রছাত্রীদের প্রানের চাওয়া তথা ডাকসুর প্রধান এজেন্ডা ছিল স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটানো কিন্তু সুলতান মনসুর আহমেদের নেতৃত্বাধীন ডাকসুর এই কমিটি দুর্বার স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকে না পেরেছে বেগমান করতে না পেরেছে স্বৈরাচারী এরশাদ শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। ফলে দরকার হয় একটি কালজয়ী ও কার্যকরী নির্বাচন। ১৯৯০ সালের ৬ জুন ডাকসু নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনি একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন। সেবার ডাকসুতে প্রায় পূর্ণ প্যানেলে জয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ছাত্রদলের প্রচারণায় স্থান পায় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অঙ্গীকার, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। সেবার মোট ভোটার সংখ্যা ছিল প্রায় ২৭ হাজার। এই নির্বাচনে সহসভাপতি (ভিপি) পদে জয়ী হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান ও সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হন খায়রুল কবির খোকন এবং এজিএস হন নাজিমুদ্দিন আলম। ১৯৯০ সালের ডাকসু নির্বাচনে ডাকসু ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট ১৮৮ আসনের মধ্যে ১৫১ টিতেই বিজয়ী হয় ছাত্রদল। তবে পুরোপুরি একপেশে হয়নি নির্বাচন। ছাত্রলীগের শাহে আলম ও কামরুল আহসানের নেতৃত্বাধীন প্যানেল দুটি হলে পূর্ণ প্যানেলে জয় পায়। অন্যদিকে রোকেয়া, শামসুন্নাহার ও এ এফ রহমান হলে সাতটি পদ দখল করে ছাত্র ইউনিয়ন।
প্রায় ২৯ বছর পর ২০১৯ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সহসভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের প্যানেল থেকে নুরুল হক নুর। তিনি বর্তমানে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি। ২০১৯ সালে ডাকসুতে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হন ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে জয়ী হন ছাত্রলীগের (সাবেক সভাপতি) সাদ্দাম হোসেন। নুরুল হক নুর ভিপি পদে ১১ হাজার ৬২টি ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন পান ৯ হাজার একশ ২৯টি ভোট। জিএস পদে গোলাম রাব্বানী ১০ হাজার ৪৮৪ ভোট পান। এজিএস পদে সাদ্দাম হোসেন ১৫ হাজার ৩০১ ভোট পান। মোট ২৫টি পদে ভোটগ্রহণ হয়। একমাত্র ভিপি এবং সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক পদ ছাড়া বাকী ২৩টি পদে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন। সমাজসেবা বিষয়ক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হওয়া আখতার হোসেন তখন ছাত্র অধিকার পরিষদের প্রার্থী ছিলেন, যিনি বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পাটির (এনসিপি) সদস্যসচিব।
এবার আসা যাক, ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনের আলোচনায়। আগামী ৯ সেপ্টেম্বরই হতে যাচ্ছে ডাকসু নির্বাচন। এরই মধ্যে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, এনসিপি, বাগসাস ও বামজোটসহ মোট ৬ টি প্যানেল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। অধিকাংশ মানুষের ধারনা মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে। এবারের ডাকসু নির্বাচনের অন্যতম আলোচনার ইস্যু হলো বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উত্থান। গত বছরের ৫ আগাস্ট পরবর্তি সময়ে তারা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের হলগুলোতে দ্রুত অবস্থান নিয়ে সাংগঠনিকভাবে নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। ফলে তাদের হল ও ক্যাম্পাস ভিত্তিক রাজনীতি ও সামাজিক কার্যক্রমগুলি ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে। জুলাই আন্দোলনে তাদের ভূমিকাকে ব্যবহার করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিটি স্তরে নিজেদের লোক নিয়োগসহ ব্যাপক রাজনৈতিক বলয় গড়ে তোলে এই সংগঠনটি। ৫ আগাস্ট এর পর সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে শিবির নিজেদের ভিসিকে ঢাকা বিশ^দ্যিালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দিতে সক্ষম হয়েছে। নিরপেক্ষতার ধুয়া তুলে ও একধরনের মব সৃষ্টি করে বিএনপি পন্থী ভিসির নিয়োগ বন্ধ করে শিবির নিজেদের দলীয়লোক প্রফেসর নিয়াজ কে ভিসি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। অবশ্য সেসময় জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়করা বুঝে হোক আর নাবুঝে হোক শিবিরের নিরপেক্ষতার ধুয়াতে হাওয়া দিয়েছিল। তারপর থেকে শিবিরকে আর ঠেকায় কে ? এবার আসা যাক মূল আলোচনায়। ঢাকসু নির্বাচনে বলতে গেলে শুরুতে হল ও ক্যাম্পাসের রাজনীতিতে শিবির কিছুটা এগিয়ে ছিল। একারনে শিবিরের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস, উদ্দিপনা ও অহমিকাও ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সময়ের আবর্তে ও নানাবিদ কারনে ঢাকসু নির্বাচনে শিবিরের সেই শক্তিশালী অবস্থান বেশ দুর্বল হয়ে গেছে এবং সময় যতো গড়াচ্ছে নির্বাচনে শিবিরের জয়লাভের সম্ভাবনা ততোই কমছে। এর প্রধানতম কারন শিবিরের ভিপি ও জিএস প্রার্থী যথাক্রমে সাদিক কায়িম ও এসএম ফরহাদের বিরুদ্ধে গুপ্তছাত্রলীগ করার ব্যাপক তথ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তাদের জিএস প্রার্থী এসএম ফরহাদের বিরুদ্ধে হলে ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক পদ গ্রহণের অভিযোগে একজন নারী জিএস প্রার্থী হাইকোর্টে মামলা পর্যন্ত করেছে, যার ফলশ্রুতিতে নির্বাচন বন্ধ হওয়ার মতো নাটকীয়তাও তৈরী হয়েছিল। শুধু তাই নয় এই রিটকারী নারী প্রার্থীকে গণধর্ষনের হুমকি দিয়েছিল যে শিক্ষার্থী সেও আবার শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত। এদিকে শিবিরের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়িমের নৌকার মিছিল করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অবনীলায় ভেসে বেরাচ্ছে। ছাত্রশিবিরের এক নারী প্রার্থীর নাচের ভিডিও ভাইরাল হয়ে মুখরোচক সমলোচনার জম্ম দিয়েছে। ১৯৭১ সালে জামায়াত শিবিরের বিতর্কিত ভূমিকার পাশাপাশি বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধকে কটাক্ষ করা ও জাতীয় সংগীতকে অবমাননা করার মতো অভিযোগ উঠছে তাদের বিরুদ্ধে। আবার শিবিরের রক্ষা কবজ হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর নিয়াজের বিরুদ্ধেও গুপ্ত আওয়ামীলীগ করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামীলীগ আমলে নিজ উদ্যোগে ১৫ আগস্ট এর শোক দিবস পালনের একক আয়োজন করে শেখ মুজিব ও ১৫ আগস্টে নিহতদের স্নরনে তার দেয়া বিয়োগাত্ব ও শোকাহত ভাসনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ধন্য করার পাশাপাশি তার ভিসি পদ ও ছাত্রশিবিরের নির্বাচনী বৈতরনীকে জলে ডুবিয়েছে বলে অনেকেই মনে করছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রতিদিনই শিবিরের বিরুদ্ধে কোন না কোন অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করা হচ্ছে। ফলে ঢাকসু নির্বাচন এখন জামায়াত শিবির ও তাদের মব থেকে উঠে আসা ভিসি প্রফেসর নিয়াজ ও তার প্রশাসনের জন্য গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছে। অপরদিকে, নির্বাচনের শুরুতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কিছুটা পিছিয়ে ছিল। আওয়ামী দুঃশাসন ও নির্যাতনের কারনে ছাত্রদল দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস ও হলের বাইরে থাকার কারনে নির্বাচনে তাদের প্রার্থীতা দিতে ও গুছিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগে যায়। তবে বড় আশার কথা হলো তারা ভিপি, জিএস ও এজিএস পদসহ সকল পদে যোগ্য ও গ্রহনযোগ্য প্রার্থী দিয়ে নিজেদেরকে সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে একটি শক্তিশালী প্যানেল হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন ও জুলাই আন্দোলনে ছাত্রদলের প্রার্থীদের ভূমিকা ইতোমধ্যে বিভিন্নভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বিশেষ করে ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান আবিদের যোগ্যতা, ব্যক্তিত্ব, বাচনভঙ্গি, লিডারশিপ ও জুলাই আন্দোলনের তার ভূমিকা ছাত্রদলকে ঘুরে দাড়াতে দারুনভাবে সাহায্য করেছে। অসম্ভব যোগ্যতা সম্পন্ন ও নেতৃত্বের অধিকারী আবিদের নেতৃত্বে আবিদ- হামীম-মায়িদ পরিষদ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ৪০ হাজার ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে একটি আবেগের জায়গা তৈরী করতে পেরেছে বৈকি! সেই সাথে সাথে ১৯৯০ সালের ঢাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের আমান-খোকন-আলম পরিষদের অসামান্য সাফল্য গাথা ও সোনালী অতীত ফিরিয়ে আনতে পারবে বলে অনেকেই মনে করছে। আমান-খোকন-আলম পরিষদও তখনকার ২৭ হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে একটি স্বপ্ন দেখিয়েছিল এবং নির্বাচিত হয়ে অতীতের সকল ডাকসু নেতৃত্বের ব্যর্থতা ঘুচিয়ে মাত্র ৪ মাসের ব্যবধানে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটিয়ে ছিল। তবে এবারের নির্বাচনে যারাই জয়লাভ করুকনা কেন তাদেরকে বিশ^বিদ্যালয়ের প্রধান সমসা আবাসন সংকট সমাধানে জোর দিতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৯টি আবাসিক হল, চারটি ছাত্রাবাস রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজারের মতো শিক্ষার্থী থাকলেও সবগুলো হল ও ছাত্রাবাস মিলিয়ে ঠাঁই হয়েছে মাত্র ২০ হাজার শিক্ষার্থীর। বাকি অর্ধেক শিক্ষার্থী অনাবাসিক হিসেবে নিজস্ব বাসা অথবা বিভিন্ন মেস ও ব্যক্তিমালিকানাধীন হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের মাত্রা এতোই তীব্র হয়েছে যে, হলগুলো বর্তমানে ধারণক্ষমতার প্রায় তিনগুণ শিক্ষার্থী ধারণ করছে। হলগুলোর চার সিটের প্রায় সব কক্ষেই আট থেকে বারো জন এবং দুই সিটের কক্ষে চার-পাঁচজন অবস্থান করছেন।আবাসন সংকটের কারণে হলগুলোতে তৈরি হয়েছে ‘গণরুম’। প্রতিটি হলেই চার থেকে ১০টি পর্যন্ত এ ধরনের কক্ষ রয়েছে। চার সিটের এ কক্ষগুলোতে ৩০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করেন। ৫ আগাস্ট সকালে জীবন মরনের সন্ধিক্ষনে দাড়িয়ে আবিদ বলেছিলেন ‘প্লিজ কেই কাউকে ছেড়ে যাইয়েনা’। তার সেই সেদিনের বানী ইতিহাস হয়ে ধরা দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে। এবার দেখার পালা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে আবিদরা আগামীর ফিনিস্ক পাখি হতে পারেন কিনা ? সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।
সমাপ্ত।
লেখক: ব্যাংকার, লেখক ও কলামিস্ট