
ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমানঃ কিছুদিন পর পরই লক্ষ করা যাচ্ছে যে, দেশে বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকান্ড ও শত শত মানুষের মৃত্যু,যা এই আধুনিক যুকে এসে মোটেই কাম্য নয়। এটি একটি দৃষ্টিকটু বিষয় যা দেশ ও আন্তর্জাতিক মহলে একটি প্রভাব বিস্তার করে। শিল্প কারখানা, বহুতল ভবন, বাণিজ্যক ভবন, শপিং মল, আবাসন, লঞ্চ আর মালামালের ডিপো ইত্যাদি কোনো কিছুই রেহায় পাচ্ছে না অগ্নি দূর্ঘটনা থেকে। তাহলে এর পিছনে কারণটা কি? কেন আমাদের বারবার আগুনের সাথে যুদ্ধ করতে হচ্ছে, প্রাণ দিতে হচ্ছে তাজা প্রাণ!।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্র্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর পরিসংখ্যান মোতাবেক ১৯৯৭ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আনুমানিক ২ লক্ষ ৫০ হাজার অগ্নি দূর্ঘটনা হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে নূন্যতম ১৯৭০ জন লোক মারা যায় ঐ সকল দূর্ঘটনা গুলোতে।
শিল্প কারখানার অগ্নি দূর্ঘটনা অনেকটাই এখন নিয়ন্ত্রণে আসলেও ক্রমেই বেড়ে চলেছে আনুসাঙ্গিক যেমন- গোডাউন, বহুতল কর্পোরেট অফিস, হাসপাতাল, লঞ্চ এমনকি স্বনামধন্য এলাকায় আবাসিক ভবনও এর বাহিরে নয়। কারখানাগুলোর অগ্নি দূর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে প্রথম ও প্রধান কারণ হচ্ছে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ। তারপর হচ্ছে অগ্নিনির্বাপন যন্ত্রাদি মজুদকরণ এবং সঠিক নিয়ম মেনে তা ইন্স্টলেশন। কারখানাতে এখনও ছোটখাটো আগুনের খবর পাওয়া যায়, যা অল্পতেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় কর্মরত শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের কারণে।
কিভাবে আমরা আগুনের হাত থেকে মানুষ ও প্রাণি সম্পদ এবং পরিবেশকে রক্ষা করতে পারিঃ
অগ্নি দূর্ঘটনার পর পরিবেশ যে পরিমাণে দূষিত হয়, তা রক্ষা করা হচ্ছে সবচেয়ে আধুনিক ব্যবস্থাপনা, যা উন্নত বিশ^ ইতিমধ্যে তার প্রতিফলন দেখাতে সামর্থ হয়েছে। আর আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও স্বল্প আয়ের দেশ মানুষ এবং প্রোপারটি সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সাধারণত ফায়ার সেফটি কনসেপ্ট অনুযায়ী প্রাণি, সম্পদ বা প্রোপারটি ও পরিবেশ এই তিনটি গভীরভাবে একে অপরের সাথে জড়িত। এটিকে একটি সার্কেল হিসেবে ধরা যায়। কারণ অগ্নি দূর্ঘটনায় কোনো কারণে যাদি আপনার মৃত্যু নাও হয়, কিন্তু আপনার বাসা বাড়ি বা অফিস যদি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যায় তাহলে আপনার পথে বসে যেতে হবে, যা কিনা মৃত্যুর চেয়েও কোন অংশে কম নয়। অন্যদিকে আগুনে পুড়ে যাওয়া বিষাক্ত পদার্থ বায়ুমন্ডলকে দীর্ঘ সময়ের জন্য দূষিত করে রাখে, যার নেতিবাচক প্রতিফলন খুবি ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসে।
আমি এমন কিছু সাস্টেনেবল বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা করতে চায় যা মেনে চললে হয়তো বা তাৎক্ষণিক ফলাফল না পাওয়া গেলেও, ক্রমে এর ইতিবাচক ফলাফল পাবার সম্ভাবনা রয়েছে এ বিষয়ে নিশ্চিত ধারনা করা যায়।
নির্মিত অবকাঠামো ও পরিবেশের অগ্নি নিরাপত্তার চ্যালেন্সঃ
আমরা যদি পনের থেকে বিশ বছর আগের কথা ভাবি তখনকার সময় শহরে এতো ঘন ঘন উচু দালান ছিল না। বসবাসরত মানুষের পরিমাণ অনেক কম ছিল। অফিস আদালত, বাণিজ্যিক ভবন ও বিভিন্ন শিল্প কারখানা, খাবারের দোকান অনেকাংশে সিমিত ছিল। তখন অগ্নি নিরাপত্তার জন্য এতটা উদ্বিগ্ন দেশের সরকার ও জনগন ছিল না। বাসা বাড়িতে ও খাবারের দোকানে সিলিন্ডার গ্যাস খুবি কম ব্যবহৃত হত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। তাই পূর্ব নির্মিত অবকাঠামো গুলোকেও আস্তে আস্তে যতটুকু কমপ্ল্যাইন্সের আওতায় আনা যায় সেদিকে সকলে নজর দিতে হবে। বনানি এফ আর টাওয়ারে অগ্নি দূর্ঘটনার পর সকল নতুন বৈদ্যুতিক কানেকশানের পূর্বে ভবনের সেইফটি প্লান দক্ষ প্রকৌশলী দ্বারা প্রস্তুত করতে হবে এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স থেকে অনুমোদন নিতে হবে। পরবর্তীতে ভবনের সেইফটি ইকুইপমেন্ট্স প্রতিস্থাপন ও ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শনের সাপেক্ষে একটি এন.ও.সি দেওয়া হয়ে থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়পর সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে যে সকল ভবনগুলো পূর্ব নির্মিত সেখানে পর্যাপ্ত অগ্নি নিরাপত্তার যন্ত্রাংশ যথেষ্ট পরিমাণে নেই ও গুণগত মান ঠিক নেই, সেই সমস্ত ভবনগুলো বেশি ঝুকিপূর্ণ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই ভবনগুলোকেও এন.এফ.পি.এ ১০১ ও বি.এন.বি.সি এর বিভিন্ন ক্যাটাগরির অধীনে এনে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
নিরাপদ ফায়ার সেইফটি বিষয়টি ডিজাইনের মৌলিক বিষয়ঃ
সাধারনত আমাদের বিল্ডিং এর ধরন অনুসারে সিস্টেম ডিজাইন করতে হয়। আবাসিক এবং বাণিজ্যিক ভবনগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি রেখে ফায়ার পাম্প এর পানি প্রবাহের ক্ষমতা ও পাশাপাশি রিজার্ভ ট্যাংক এর ধারণ ক্ষমতা নির্ধারণ করতে হয়। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর গেজেট মোতাবেক যেকোনো বিল্ডিং এর নূন্যমত ৫০ হাজার গ্যালন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভার রাখতে হয়, যা ভবনের সম্মুখে রাস্তার উপর নির্ভর করে আরো বাড়ানো রাখতে পারে। ভবনটি ৩ অথবা ৫ তারকা হোটেল হলে ১ লক্ষ গ্যালন পানি মজুদ রাখতে হবে। পাশাপাশি বজায় রাখতে হবে সিস্টেমে নূন্যতম প্রেশার,যা ৫/৬ বার বা ৭০-৮০ পি.এস.আই। তাছাড়া অটোমেটিক স্মোক ডিটেকশান সিস্টেম অধিব জরুরি একটি বিষয়। ডিটেকশন সিস্টেম ফায়ার সার্ভিস স্টেশনগুলোর সাথে ইন্টারকানেক্টেড করার পরিকল্পনা ভবিষ্যতে সরকার করতে পারে। এর সুবিধা হচ্ছে কোন ভবনে অগ্নি দূর্ঘটনা বা আগুনের সূত্রাপাত হলে সয়ংক্রিয়ভাবে নিকটস্থ ফায়ার ষ্ট্যাশনে তার নোটিফিকেশান চলে যাবে। যার মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস থেকে সরাসরি বিল্ডিং ম্যানাজার বা কর্মকর্তার কাছে সরাসরি যোগাযোগ করা যাবে এবং দ্রæততার সাথে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। সকল বহুতল বিশিষ্ট ভবনে জরুরি বহির্গমন সিঁড়িকে দুই ঘন্টা ফায়ার রেটেড ডোর দিয়ে লবি থেকে অবশ্যই পৃথক করে রাখতে হবে এবং সিঁড়িতে ব্যাটারি অপারেটেড ইমারজেন্সি লাইট স্থাপন করতে হবে একটি নির্দিষ্ট ফ্লোর পর পর রিফিউজ এরিয়া রাখতে হবে এবং প্রতিটি ফ্লোরে ঐ ফ্লোরের’ই ফায়ার সেইফটি প্লান নিরাপদ এবং কমন এরিয়াতে ভিজুয়াল অবস্থায় রাখতে হবে।
অগ্নিনির্বাপন প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রাদি রক্ষনাবেক্ষনঃ
আমরা জানি, যে কোন ধরণের প্রশিক্ষণ একটি চলমান বিষয়। যা কিনা নির্দিষ্ট সময় পর পর আয়োজন করতে হয়। আবাসিক, বাণিজ্যিক অথবা কারখানায় বসবাস বা কর্মরত সকল মানুষকেই একটি ন্যূনতম প্রশিক্ষণ দেওয়া থাকলে অন্তত ৫০% দূর্ঘটনাকে সহজেই নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব। আর খুবি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আপনি নিরাপত্তার জন্য অনেক ব্যবস্থা রাখলেন, কিন্তু সময় মত সেই সিস্টেম যদি কাজ না করে তাহলে সবই বৃথা। সেজন্যে প্রতি মাসে অন্তত দুবার ফায়ার হাইড্রেন্ট ও ডিটেকশান সিস্টেমের পরিক্ষা-নিরিক্ষা ও প্রয়োজনীয় রক্ষনাবেক্ষনের ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা এবং রেকর্ড সংরক্ষণ করা দরকার। আমি মনে করি, দেশের বৃহত্ত শহর গুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে একটি সম্মিলিত টিম (ফায়ার,ইলেক্ট্রিক্যাল,স্ট্রাকচারাল) এর অন্তত বছরে ৩/৪ বার ভবনগুলোর পরিদর্শনের পরিকল্পনা রাখা যেতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে প্রাথমিক অথবা মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত একাডেমিক কারিকুলামে ফায়ার সেইফটি এডুকেশনটিকে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে।
গত বছর ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় ২৪ হাজার অগ্নি দূর্ঘটনার রেকর্ড পাওয়া যায়, এতে প্রায় ১০০ জন লোক মারা যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৩৯ শতাংশ অগ্নি দূর্ঘটনা হয়েছিল ইলিক্ট্রিক্যাল শর্ট-সার্কিট এর মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এর প্রতিবেদন অনুযায়ী অগ্নি দূর্ঘটনাগুলোর জন্য ২০২২ সালে ৩৪২ কোটি টাকার মত সম্পদ নষ্ট হয়। মানসম্মত ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল যন্ত্রাদি ব্যবহার ও অগ্নি নির্বাপনে আধুনিক সরঞ্জাম এবং এদের সঠিকভাবে রক্ষনাবেক্ষন করলে বাংলাদেশে অগ্নিকান্ডের হার অনেকাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। আমাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদের’ই নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যে বাসা বাড়িতে থাকছি বা যেখানে অফিস করছি সেখানকার নিরাপত্তার সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। কারন আমাদের দিনের অনেকটা সময় কর্মস্থলে থাকতে হয়, সেই স্থান বা পরিবেশকে সকল দিক বিবেচনা করে একটি নিরাপদ পরিবেশ হিসেবে বেছে নিতে হবে। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ প্রকৌশলী অথবা কনসালটেন্ট দ্বারা পরিদর্শন এর মাধ্যমে ভবনের ধরন অনুযায়ী ফায়ার ডিটেকশান, প্রটেকশান, সাপ্রেশান সিস্টেম ইন্সটলেশান করতে হবে এবং জরুরী বহির্গমন পথকে আইন অনুযায়ী সুরক্ষীত রাখতে হবে।
ফায়ার ফাইটিং এবং এর ব্যবস্থাপনা এমন একটি কনসেপ্ট যা কিনা কাল্পনিকভাবে ভবিষ্যতে কি হতে পারে তা চিন্তা করে অগ্রিম ব্যবস্থাপনা নিতে হয়। আল্লাহ না করুন, যে কোনো ধরনের দূর্ঘটনা হতেও পারে আবার নাও হতে পারে কিন্তু আল্লাহ সবসময় এ বিষয়ে মানুষকে সতর্ক থাকতে বলেছেন। দূর্ঘটনা মোকাবেলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতিই হচ্ছে নিরাপত্তা।
মাসুদুর রহমান
ডেপুটি রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার
ফায়ার এন্ড মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশান সিস্টেম
কনকর্ড গ্রুপ