প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৪, ২০২৬, ৫:৪৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ১৭, ২০২৩, ১২:২৫ অপরাহ্ণ

মোহাম্মদ হানিফ: দেশের সবচেয়ে প্রাচীন দল আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে পরিচিত ‘হাইব্রিডদের’ ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছেন উপেক্ষিত ‘ত্যাগী ও যোগ্য’ নেতাকর্মীরা। ক্ষমতাসীন দলটির হাইকমাণ্ডের নির্দেশনার পরেও মূল্যায়ন হচ্ছেন না তারা।
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে সংগঠনটিতে ভিড় করছেন নানা দিক থেকে ছুটে আসা ক্ষমতালোভীরা—যারা পরিচিতি পেয়েছেন অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিড হিসেবে। অভিযোগ উঠেছে, এখন ‘তারাই’ দলটির কেন্দ্রের উপ-কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদ পাচ্ছেন।
অনুপ্রবেশকারী এসব হাইব্রিডদের রসানলেও পড়তে হচ্ছে আওয়ামী লীগের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের। দলের দুঃসময়ে যারা এগিয়ে আসেন তাদের কেন মূল্যায়ন হয় না—এখন এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
গত ২৪ মার্চ ২০২৩ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমিনুল ইসলাম বাকের, সহ-সভাপতি ভিপি মাহফুজুর রহমান বাহার, সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাবুল বাবুকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অশালীন ভাষায় মন্তব্য করেছিলেন যা মিডিয়াতে প্রকাশ হয়েছে ।
এসব বিষয় নিয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক সিনিয়র নেতা জানান, ‘এ ব্যাপারে দলের সভাপতির একটি সুনির্দিষ্ট বক্তব্য রয়েছে। তিনি ত্যাগীদের মূল্যায়নের বিষয়ে বার বার বলেছেন।
তারপরও ত্যাগীদের মূল্যায়ন হয় না। এর কারণ কি? তাহলে কি হাইকমাণ্ডের নিদের্শনা উপেক্ষা করা হয়? আসলে সবাই দায়িত্ব পেলেই ত্যাগীদের মূল্যায়নের বিষয়টা ভুলে যান। তার চারপাশে থাকা আপনজনদেরই দায়িত্ব দেন।
ত্যাগীরাও মান-অভিমানে অনেক সময় দূরে থাকেন। তাদের অভিমানে হাইব্রিডরা দলে প্রবেশের সুযোগ পায়।’পুলিশ ও আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, সোনাইমুড়ী উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি দেলওয়ার হোসেন সুজন ও শ্যামল উদ্দিন দীর্ঘ বছর ধরে কমিটি চালিয়ে আসছেন।
শুক্রবার বিকেলে ছাত্রলীগের কর্মী আরিফ হোসেনকে সভাপতি ও রাসেল মাহমুদকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা দিতে সোনাইমুড়ী মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের হলরুমে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসময় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সোনাইমুড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমিনুল ইসলাম বাকের, সহ-সভাপতি মাহফুজুর রহমান ভিপি বাহার।
এসময় পূর্বের কমিটির সভাপতি দেলওয়ার হোসেন সুজন ও সাধারণ সম্পাদক শ্যামল উদ্দিনের নেতৃত্বে অনুষ্ঠানস্থলে নেতাকর্মীরা এসে অনুষ্ঠান পণ্ড করে দেয়। দুই পক্ষ পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল ছুঁড়তে থাকে।
এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা চেষ্টা করি ত্যাগীদের মূল্যায়ন করতে। জেলা মূল্যায়ন করবে উপজেলাকে। উপজেলা মূল্যায়ন করবে ইউনিয়নকে। ইউনিয়ন মূল্যায়ন করবে ওয়ার্ডকে। এমন তো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা কি হয়? আমরা কি আসলেই ত্যাগীদের মূল্যায়ন করতে পারছি?’
আওয়ামী লীগে এরোএকজন নেতা আরো বলেন, ‘বর্তমানে ত্যাগী বা পরীক্ষিতদের বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, দলের গঠনতন্ত্র না মানা। আমরা যারা কেন্দ্রের দায়িত্বে আছি তারা কি উপজেলা বা ইউনিয়নের সকল ত্যাগীকে চিনি? হয়তো কয়েকজনকে চিনতে পারব। কিন্তু সেখানে যারা দায়িত্বে রয়েছেন তারা তো চিনে। তাহলে তারা কেন ত্যাগীদের কমিটিতে রাখেন না।
সেটা খুঁজলেই দেখা যাবে অন্য বিষয়। যারাই দায়িত্ব পায় তারাই বলয় সৃষ্টি করতে চায়।’তিনি আরো বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের কমিটিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে। স্বজনপ্রীতি ও নিজেদের লোক দিয়ে কমিটি দেয়া হয়েছে কিনা— তা খতিয়ে দেখাতে হবে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা বাদ পড়লে তা কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। সবাইকে বলব, সামনে যে কমিটিগুলো গঠন করা হবে, সেগুলোতে অবিতর্কিত এবং ত্যাগীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।’
তিনি বলেছেন, ‘নিজের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য নয়, জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের রাজনীতি করতে হবে। অনেকেই ক্ষমতা পেয়ে বেপরোয়া হয়ে যান—যা মোটেই কাম্য নয়। টাকা খেয়ে খারাপ লোকের নৌকায় উঠাবেন না । ত্যাগীরাই সুখে-দুঃখে দলের পাশে থাকবেন। তাই সত্ ও ভালো মানুষদের মূল্যায়ন করতে হবে। দুঃসময়ে বসন্তের কোকিলরা পাশে থাকবে না।