হোম » রাজনীতি » জাসদের ৫০ বছরের পূর্তী “এবং রাজনৈতিক খেলা

জাসদের ৫০ বছরের পূর্তী “এবং রাজনৈতিক খেলা

আব্দুর রাজ্জাকঃ আজ ৩১শে অক্টোবর ‘২০২২ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ এর ৫০তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। এই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটির বহু নেতাকর্মী স্বাধীনতা পূর্ব মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামে, স্বাধীনতা উত্তর জনগণের ন্যায় সংগত অধিকার আদায়ের সংগ্রামে, ৭৫ এর পট পরিবর্তন পর অবৈধ্য ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসক গোষ্ঠীর দৌরাত্ব প্রতিহত করার আন্দোলন- সংগ্রামে, বাঙ্গালী জাতির হাজার বছরের সংস্কৃতির পুনর্জাগরণে রাষ্ট্র পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের সংগ্রামে ,স্বাধীনতার উষ্ণালগ্ন থেকে প্রতিটি গনতান্ত্রিক আন্দোলনে- সংগ্রামে দলের ঐতিহ্যরক্ষার্থে, দূর্নীতি -বৈষম্যের আবসান এবং সুশাসন ও সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র (কৃষক ও শ্রমিক রাজ কায়েম) ব্যবস্থার বিনির্মানে সফলতা-ব্যর্থতায় বহু প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। যা আল্প সময়ে এত আত্ম উৎসর্গীয় নেতা কর্মী এই ভূখন্ডের অন্য কোন রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে বিরল।এক সময় বৃটিশ উপনিবেশিক আমলে তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা- কর্মীদের স্বরাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বহু ত্যাগের ইতিহাস রচিত হয়েছিল ।

ভারতবর্ষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে যেমন বহু বিপ্লবী শহীদ হয়েছে, তারচেয়েও বহু গুনে শহীদ হতে হয়েছে বাঙ্গালীর মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনে।

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ত্রিশ লক্ষ নিরীহ বাঙালির হত্যাকারী, দুই লক্ষ মা-বোনে ইজ্জত হরণকারী। শুধু কি তাই? পাকিস্তানিরা ২৩টি বছর পূর্ব বাংলার সম্পদ লুন্ঠন করেছিল । এখনও তাদের প্রেতাত্মারা বাংলাদেশর আনাচে- কানাচে বিরাজমান। তারা রাজনৈতিক -সামাজিক – অর্থ নৈতিক তথা সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধকতার কর্মকাণ্ডের সহিত জরিত। কখন কখন স্বাধীন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের নিজেদের প্রতিনিধি নিয়োগে সক্ষমতা অর্জন করেছে। বহু দলীয় গনতন্ত্রের নামে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল। হাঁ -না ভোটের মধ্যদিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম ধাপে উন্নয়ন।সামরিক ব্যারাক থেকে রাজনৈতিক দলগঠন এবং অবৈধ্য ক্ষমতা দখল করার লক্ষ্যে সংবিধানকে ধারালো ছুরি দিয়ে কাটাছেঁড়াকরন।

রাষ্ট্রের মহানায়ক- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের হত্যার বিচার রহিতকরন। স্বঘোষিত খুনীদেরকে বিদেশে প্রতিষ্ঠিতকরন এবং রাজাকার – আলবদর – আল সামসকে রাষ্ট্রের পরিচালক হিসেবে মন্ত্রীত্ব প্রদান ।রাষ্ট্রীয় মালিকানা বি-রাষ্ট্রয়ীকরণের নীতিমালার পদক্ষেপ গ্রহণ।২০০১ সালে পট পরিবর্তনের পর সারা বাংলাদেশে তৎকালীন ক্ষমতাশীল বিএমপি – জামাত জোট কর্তৃক সংখ্যালঘু ইিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নাটকীয় তান্ডব।

শাহজাদপুরের পূর্নিমার প্রেস ক্লাবে সাহসী উচ্চারন উৎকৃষ্ট উদাহরন হিসেবে ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ রয়েছে। বাঙলা ভাই – সায়েক আব্দুর রহমানের উথ্থান। জিএমবি জঙ্গিদের কর্তৃক ৬৪ জেলায় এক সঙ্গে সিরিজ বোমা ফাটানো। ২০০৪ সালে তৎকালীন ক্ষমতাশীল সরকার কর্তৃক রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ২১শে আগষ্ট বিরোধী দল আওয়ামীলীগের জনসভায় দিনে – দুপুরে গ্রেনেড হামলা করে মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা। স্বাধীন দেশে নির্বাচনে ভোটের নৈরাজ্য, সুক্ষ্ম – স্থুল কারচুপি, নিয়ন্ত্রনহীন টাকার গতিবেগ , লাঠিয়াল বাহিনীর প্রভাব বিস্তার, অস্ত্রের ঝনঝনানি, রক্তাক্ত রাজপথ, ছায়ানটের রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানমালায় জঙ্গি গোষ্ঠী কর্তৃক গ্রেনেড হামলা।

এই সমস্ত সব কিছুই হলো রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি – স্বাধীন দেশে অব্যবস্থাপনা কায়েমের লক্ষ্যে পরাজিত উপনেবেশিক প্রভুদের নিঃসৃত শক্তির এজেন্ট নিয়োগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।অপর দিকে চৌদ্দ দলীয় জোটের আন্দোলন সংগ্রামের ফসল তত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক সমগ্র বাঙালির সঠিক নাগরিকত্ব নিশ্চিতকরণে আইডি কার্ডের প্রচলন, পঞ্চম সংশোধিত সাংবিধানিক অধ্যাদেশ বাতিলকরন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার, যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার কোর্টের আয়ত্তে আনা,মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন, পদ্মা সেতু নির্মান, পায়রা বন্দর তৈরী,রুপপুর পারমানবিক বিদুৎ কেন্দ্র নির্মান, একশত ইকোনমিক জোন তৈরির পদক্ষেপ হলো চৌদ্দ দলীয় জোটের সুফসল। আর এই চৌদ্দ দলীয় জোটের রুপকার হলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে বিএলএফ এর প্রশিক্ষক, সাবেক তথ্য মন্ত্রী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনু এমপি।

তিনি শত প্রতিকুল অবস্থায় এখন পর্যন্তও চৌদ্দ দলীয় জোটের ঐক্য প্রক্রিয়া চালু সহ দলের কান্ডারী হিসেবে পরিগনিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন। স্বাধীনতার ৫১ বছরে এটা চরম সত্যি কথা যে রাজনৈতিক ভাবে জাতিটি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। মুক্তি যোদ্ধের চেতনা এবং সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন গোষ্ঠী। এই উপমহাদেশে শুধু একটি বড় রাজনৈতিক দল ছিল কংগ্রেস। কিন্তু কালের বিবর্তনে মুসলমানদের স্বার্থ সংরক্ষনে গঠিত হলো মুসলীমলীগ। ফলাফল ধর্ম ভিত্তিক দুইটি রাষ্ট্র পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান। অথচ ইতিহাস বলে বহুবছর মুসলমান শাসকগোষ্ঠী ভারতবর্ষকে শাসন করেছে। তার পরেও কেন প্রয়োজন পড়লো মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র? ধর্মের প্রয়োজনে যদি আলাদাভাবে রাষ্ট্রের প্রয়োজন হয় তাহলে ভারতবর্ষে না হলেও কমপক্ষে ৫০টি রাষ্ট্রের প্রয়োজন হতো! ভাগ্য ভাল অন্য ধর্মে কায়দে আজম জিন্নাহ মত নেতার আত্মপ্রকাশ ঘটে নাই। সম্রাট অশোকের ন্যায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিবেকমান ব্যাক্তির আবির্ভাব ঘটে নাই। তা না হলে ভারত বর্ষে বৌদ্ধধর্মালম্বীদের আলাদা রাষ্ট্রের প্রয়োজন হতো।

খ্রীষ্টান ধর্মালম্বীদের জন্যে আলাদা রাষ্ট্র প্রয়োজন হতো।এই ভাবে প্রতিটি ধর্মালম্বী সম্প্রদায়ের জন্যে একটি একটি করে পৃথক রাষ্ট্রের প্রয়োজন হতো। কিন্তু বাস্তবে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের যে প্রয়োজন ছিল না, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো বাংলাদেশ। ২৩ বছরের মাথায় – ৩০ লক্ষ শহীদ এর বিনিময়ে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর্জন । তাই বাংলাদেশে কখনও উচিত নয় ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারিত করার সুযোগ দেয়া।

পাক ভারত স্বাধীনতার সময় ভারতবর্ষের মুসলমানদের দায়ীত্ব নিয়েছিল মুসলিম লীগ, পাকিস্তান আমলে মুসলমানদের দায়ীত্ব নিয়েছিল মুসলীম লীগ ঘরানার সামরিক বাহিনীর হর্তাকর্তা। তার ফলাফল কখনও ভাল হয় নাই; কি অর্থনৈতিক, কি রাজনৈতিক বা কি সাংস্কৃতিক! বাকী থাকে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র ; ৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর দীর্ঘ দিন সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্বে দেশ পরিচালিত হয়েছে, যেটা কখনও আমাদের জন্য মঙ্গলকর ছিল না। বহুকষ্টে বাঙালি জাতি এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ এর নেতৃবৃন্দ এই সমস্ত আন্দোলন সংগ্রামে সর্বদায় রাজপথে সোচ্চার থেকেছে।যা আজও তাঁরা বুকে ধারণ করে। সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখে।

মেহনতি মানুষের মুক্তির পথ সমাজতন্ত্রের বিকল্প নাই, তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে। সেই লক্ষ্যে দলটি আগামী দিনগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগ্রাম রচনা করবে এবং মুক্তিযু্দ্ধের চেতনা যতদিন পর্যন্ত না বাস্তবায়ন হবে – ততদিন পর্যন্ত স্বাধীনতার পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট বদ্ধপরিকর থাকবে।

এই মূলমন্ত্র হউক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ এর ৫০ বছর পূর্তির অঙ্গীকার। ব্যাক্তির চেয়ে দল বড়,আর দলের চেয়ে দেশ বড়।একজন সুনাগরিকের দায়িত্ব হলো দেশের মঙ্গল কামনা করা । জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল আগামী দিনগুলোতে আন্দোলন সংগ্রামে সেই সুফল নিয়ে আসবে অবশ্যই। এই প্রত্যাশা ব্যাক্ত করছি।

জয় হউক সমাজতন্ত্রের
জয় হউক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের
জয় হউক বাঙালি জাতিস্বত্বার
জয় হউক মেহনতি মানুষের
জয় বাংলা।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!