হোম » রাজনীতি » বাংলার বাঘ এ. কে. ফজলুল হকের স্বরনে

বাংলার বাঘ এ. কে. ফজলুল হকের স্বরনে

সৈয়দ আহসান: এ. কে. ফজলুল হকের পূর্বপুরুষ আঠারো শতকে ভারতের ভাগলপুর হতে পটুয়াখালী জেলার বাউফল উপজেলার বিলবিলাস গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। এ. কে. ফজলুল হকের দাদা মুহম্মদ আকরাম আলী বরিশাল কোর্টে আইন ব্যবসা করতেন। তার দুই পুত্র কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ, কাজী আবদুল কাদের ও পাঁচ কন্যা। এ. কে. ফজলুল হকের পিতা কাজী মুহম্মদ ওয়াজেদ। তিনি ১৮৪৩ সালে চাখারে জন্ম গ্রহণ করেন।

তিনি কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ালেখা করেন। বাংলার মুসলমানদের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ গ্রাজুয়েট ছিলেন। ১৮৭১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে তিনি বি. এল. পাশ করে আইন ব্যবসা শুরু করেন। মুহম্মদ ওয়াজেদ ১৯০১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বরিশালে মৃত্যুবরণ করেন।এ. কে.এম ফজলুল হক তার দাম্পত্য জীবনে তিনবার বিয়ে করে ছিলেন সর্বশেষ ১৯৪৩ সালে মীরাটের এক ভদ্র মহিলাকে পত্নীত্বে বরণ করেন।তাদের সন্তান এ. কে. ফাইজুল হক ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পাট প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ২০০৭ সালে মারা যান।

কর্মজীবন
এ. কে. ফজলুল হকএকজন বাঙালি আইনজীবী, লেখক এবং সংসদ সদস্য ছিলেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাঙালি কূটনীতিক হিসেবে তিনি পরিচিত লাভ করেন। রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের নিকট শেরে বাংলা এবং ‘হক সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন।১৯১৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে এ. কে. ফজলুল হক বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।১৯১৫ সালে পুনরায় ঢাকা বিভাগ থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯১৩ থেকে ১৯১৬ সাল পর্যন্ত তিনি এ পরিষদের সভায় মোট ১৪৮ বার বক্তৃতা করেন। ১৪৮ বার বক্তৃতার ভেতর ১২৮ বার তিনি দাঁড়িয়েছিলেন মুসলমানদের শিক্ষা সম্পর্কে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য। তার অদম্য চেষ্টার ফলে ১৯১৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কারমাইকেল ও টেইলার হোস্টেল স্থাপন করা হয়েছিল। তৎকালীন শিক্ষা বিভাগের ডি.পি.আই কর্ণেল সাহেব তখন ফজলুল হকের শিক্ষা বিষয়ক উদ্যোগের প্রশংসা করে তাকে বাংলার “বেন্থাম” হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯১৬ সালে মুসলিম লীগ এর সভাপতি নির্বাচিত হন । পরের বছর ১৯১৭ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর সাধারণ সম্পাদক হন । তিনিই ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি একই সময়ে মুসলিম লীগ এর প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেস এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন । আর জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব । ১৯১৮ -১৯ সালে যখন তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তখন তিনি জওহরলাল নেহেরুকে ব্যক্তিগত সচিব বানিয়ে ছিলেন।

মুসলিম লীগ এর লাহোর অধিবেশনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বক্তব্য দিচ্ছেন । হঠাৎ করে একটা গুঞ্জন শুরু হলো, দেখা গেল জিন্নাহর বক্তব্যের দিকে কারও মনযোগ নাই । জিন্নাহ ভাবলেন, ঘটনা কী ? এবার দেখলেন, এক কোণার দরজা দিয়ে ফজলুল হক সভামঞ্চে প্রবেশ করছেন, সবার আকর্ষণ এখন তার দিকে । জিন্নাহ তখন বললেন — When the tiger arrives, the lamb must give away. এই সম্মেলনেই তিনি উত্থাপন করেছিলেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব ।

১৯৪০ সালের ২২-২৪ শে মার্চ লাহোরের ইকবাল পার্কে মুসলিম লীগের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই কনফারেন্সে বাংলার বাঘ আবুল কাশেম ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি তার প্রস্তাবে বলেন, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বাস্তবতায় হিন্দু মুসলিম একসাথে বসবাস অসম্ভব। সমাধান হচ্ছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র এবং পূর্বাঞ্চলে বাংলা ও আসাম নিয়ে আরেকটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে।বর্তমানে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র তার ভিত্তি হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব। তাই ২৩ শে মার্চ কে পাকিস্তানে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

একমাত্র রাষ্ট্রপতি হওয়া ছাড়া সম্ভাব্য সব ধরনের পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন জীবনের কোনো না কোনো সময়ে । তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, পূর্ব বাংলার তৃতীয় মুখ্য মন্ত্রী; পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পূর্ব – পাকিস্তানের গভর্নর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ।

মহাত্মা গান্ধী র নাতি রাজমোহন গান্ধী তার বইতে লিখেছেন — তিন নেতার মাজারে তিনজন নেতা শায়িত আছেন যার মধ্যে দুজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন । একজনকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া হয়নি, অথচ তিনিই ছিলেন সত্যিকারের বাঘ ।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!