হোম » অন্যান্য বিভাগ » শেরপুর শহরে চাষ করা হচ্ছে মরুভূমির সুস্বাদু ত্বীন ফল

শেরপুর শহরে চাষ করা হচ্ছে মরুভূমির সুস্বাদু ত্বীন ফল

Saudi Arabia's 'teen fruit' is being cultivated for the first time in Sherpur

মোঃ শরিফ উদ্দিন, শেরপুর জেলা প্রতিনিধি: ত্বীন মূলত মরুভূমির সুস্বাদু ফল। এ ফলের স্বাদ হালকা মিষ্টি। এটি দেখতে কিছুটা ডুমুর ফলের মতো। বাংলাদেশে ত্বীন ফল ড্রাই ফ্রুটস হিসেবে আমদানি করা হয়। ত্বীন ফল মরুভূমিতে চাষ হলেও গত এক দশকের বেশি সময় থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চাষ শুরু হয়েছে। আমাদের দেশে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে।

পবিত্র কুরান শরীফের সুরা ত্বীনের মধ্যে যে ত্বীন ফলের বর্ণনা করা হয়েছে, সেই ত্বীন ফল এবার শেরপুর জেলা শহরে প্রথম বারের মতো চাষ করা হচ্ছে। এ ফল চাষি তার বাড়ির ভেতর ১৫ শতক জমিতে মূলত মিশ্র বারোমাসি ফল বাগানের সঙ্গে এ ত্বীন ফলের ২০ টি চারা রোপণের পর এক বছরের মাথায় প্রচুর ফল আসে গাছে। তবে এ ফল বিক্রি না করে নিজেরা এবং আশপাশের লোকজন এবং আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে বিতরণ করেন। ফলন ভালো হওয়ায় তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আগামীতে আরও গাছের চারা রোপণ করে বাণিজ্যিকভাবে ত্বীন ফল বাগানের ইচ্ছে রয়েছে বলে জানায় ত্বীন ফল চাষি ওই বাগান মালিক।

জানা গেছে, শেরপুর পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কান্দাপাড়া মহল্লার আরিফুল আলম রাসেল তার প্রায় দের একর পৈত্রিক বাড়ি ভিটের মধ্যে ১৫ শতক জমিতে কয়েক বছর আগে বারোমাসি মিশ্র ফল বাগান করেন। যা কী না জেলা কৃষি বিভাগের মাধ্যমে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি প্রকল্প থেকে প্রদর্শনী মাঠের সহযোগিতা করা হয়।

চাষি আরিফুল ইসলাম রাসেল জানায়, তিনি যখন জর্ডানে সফরে যান তখন এ ত্বীন ফলের বাগান দেখা থেকে এবং আমাদের দেশে এ ফলের বিশেষ করে শুকনো ত্বীন ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এক হাজার টাকা কেজি দরে শুকনো ত্বীন ফল বিক্রি হয়। তবে পাকা ফলেরও চাহিদা রয়েছে দেশে। তাই সে এ ত্বীন ফলের বাগান করার উদ্দেশে প্রাথমিকভাবে গত বছর জুন মাসে মাত্র ২০ টি চারা বগুড়া থেকে সংগ্রহ করে রোপণ করেন তার মিশ্র বাগানে। এক বছরের মধ্যেই ব্যাপক ফলন হয় প্রতিটি গাছে। তবে বর্তমানে ফল প্রায় শেষের দিকে। এ বছর তিনি ২০ টি গাছ থেকে প্রায় ৭ থেকে ৮ কেজি ফল পেয়েছেন। তবে তা নিজেদের ও আত্মীয়দের মধ্যেই খাওয়া হয়। কোন ফল বিক্রি করা যায়নি। তারপরও ত্বীন ফল চাষের খবর পেয়ে আশপাশের অনেক মানুষ ভিড় করে ওই ত্বীন গাছও ফল দেখেতে। এ সময় তারা বেশ আনন্দ উপভোগ করেন। এদিকে ত্বীন ফল গাছের খবর পেয়ে দূর থেকে আগত অনেক চাষি এ ফল বাগানের গাছের সৌন্দর্য উপভোগ এবং ফল দেখে নিজের এলাকায় এ ত্বীন ফল চাষ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। রাসেলের বাড়ির লোকজনও এ ত্বীন চাষ নিয়ে বেশ খুশি এবং তারা আশা করছে আগামীতে আরও বেশি করে গাছের চারা রোপণ করবে।

ত্বীন ফল নানা দেশে নানা নামে পরিচিত। ত্বীন ফলের গাছ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমান্বয়ে ফল দেওয়ার হারও বৃদ্ধি পায়। কৃষিবিদদের মতে, ত্বীন ফলের গাছে প্রথম বছরে ফল দেওয়ার হার ১ কেজি, দ্বিতীয় বছরে ৭ কেজি, তৃতীয় বছরে ২৫ কেজি। এভাবে ক্রমবর্ধমান হারে ৩৪ বছর পর্যন্ত ফল দেয়। ত্বীন ফলের গাছের আয়ু সাধারণত প্রায় একশ বছর। তবে অবস্থা ও জাত ভেদে এ পরিসংখ্যানের তারতম্য হয়। বাংলাদেশে ফলটি ত্বীন নামে পরিচিত হলেও বিশ্বের অন্যান্য দেশ যথাক্রমে মিশর, তুরস্ক, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং জর্দানে ‘আঞ্জির’ নামে পরিচিত।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ জানায়, মাঠে ও ছাদে টবে লাগিয়ে ফল উৎপাদন সম্ভব। এটির কাটিং চারা লাগানোর চার থেকে পাঁচ মাস পর থেকেই ফল দিতে শুরু করে । প্রতিটি গাছ থেকে প্রথম বছরে এক কেজি, দ্বিতীয় বছরে সাত থেকে ১১ কেজি, তৃতীয় বছরে ২৫ কেজি পর্যন্ত ফল ধরে। এভাবে টানা ৩৪ বছর পর্যন্ত ফল দিতে থাকে। গাছটির আয়ু হলো প্রায় ১০০ বছর। প্রতিটি পাতার গোঁড়ায় গোঁড়ায় ত্বীন ফল জন্মে থাকে। প্রতিটি গাছ ছয় থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয় এবং একটি গাছে ৭০ থেকে ৮০টি ফল ধরে। ত্বীন ফলে প্রচুর পরিমানের ভিটামিন-এ, বি, সি, কে, পটাসিয়াম, মেগনিশিয়াম জিঙ্গ, আইরন, কপারসহ কার্বোরাইড থাকায় বাজারে এর বেশ চাহিদা রয়েছে।

কৃষি বিভাগের পৌর এলাকার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল মালেক জানায়, আরব দেশের এ ত্বীন ফল নিয়ে আমরা খুবই আশাবাদী। গাছ ও ফল দেখে তারা আশা করছে প্রচুর ভিটামিন সমৃদ্ধ এ ত্বীন ফল চাষ বাণিজ্যিকভাবে করা সম্ভব। আমরা এ ফল চাষে কৃষকদের নানা সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে আসছি।

এদিকে কুরআন শরীফের বর্ণিত এ ত্বীন ফলের প্রতি সাধারণ মানুষের রয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তাই আগামীতে এ ফল চাষ জেলায় বিস্তৃত করতে পারলে জেলায় বিদেশি ফলের চাহিদা মেটানোসহ একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছে স্থানীয়রা।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!