প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২১, ২০২৬, ৫:২১ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ মার্চ ৪, ২০২৬, ৩:০৮ পি.এম
ইরান ইরাক নয়: শক্তি, কৌশল ও ভূরাজনীতির নতুন বাস্তবতা | শাহজাহান সিরাজ সবুজ

শাহজাহান সিরাজ সবুজ
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে ঘিরে একটি বাক্য বারবার উচ্চারিত হচ্ছে—“ইরান কিন্তু ইরাক নয়।” এই বক্তব্য কেবল আবেগপ্রসূত স্লোগান নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে জটিল সামরিক, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। অতীতের অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের স্মৃতি অনেকের মনেই আছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানকে একই মানদণ্ডে বিচার করা বাস্তবতার সরলীকরণ মাত্র।
ইরাক যুদ্ধের সময় দেশটি ছিল দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক দুর্বলতায় ক্ষতিগ্রস্ত। আন্তর্জাতিক পরিসরেও ইরাক কার্যত একঘরে ছিল।
অন্যদিকে ইরান গত দুই দশকে নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও একটি স্বনির্ভর প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলেছে। তাদের সামরিক পরিকল্পনা মূলত দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ-ভিত্তিক—যেখানে সরাসরি আক্রমণের বদলে প্রতিপক্ষকে ব্যয়বহুল ও জটিল পরিস্থিতিতে ফেলে দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য।
ইরানের প্রতিরক্ষা দর্শন মূলত ‘অসামান্য যুদ্ধনীতি’ বা asymmetric warfare-এর ওপর নির্ভরশীল। তারা জানে, প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দেওয়া কঠিন। তাই তারা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ মিসাইল, ড্রোন প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক মিত্রশক্তির সমন্বয়ে এক বহুমাত্রিক প্রতিরোধ কৌশল গড়ে তুলেছে। স্বল্পব্যয়ের ড্রোন বা রকেট দিয়ে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চ্যালেঞ্জ করা—এই অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতাই আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা।
ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে একটি কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী—বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট—ইরানের নিকটবর্তী। এই অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা বৈশ্বিক তেলবাজার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে পূর্ণমাত্রার সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া কেবল একটি দেশের বিরুদ্ধে অভিযান নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব বিস্তার করেছে। এই প্রভাববলয় সরাসরি সংঘাতকে আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিতে পারে। ফলে সম্ভাব্য যে কোনো সামরিক পদক্ষেপ একাধিক ফ্রন্ট খুলে দিতে সক্ষম—যা পরিস্থিতিকে জটিল ও অনিশ্চিত করে তোলে। এ দিক থেকে ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, বরং একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক শক্তি কাঠামো।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশ্বের অন্যতম উন্নত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধে প্রযুক্তির লড়াই একমুখী নয়। ড্রোন স্বর্ম, সাইবার হামলা, স্যাটেলাইট-নির্ভর টার্গেটিং—সব মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র এখন বহুমাত্রিক। আকাশসীমা ‘নিশ্ছিদ্র’ রাখার দাবি বাস্তবে আপেক্ষিক হয়ে পড়েছে। প্রতিরক্ষা যত উন্নত হচ্ছে, আক্রমণ কৌশলও তত দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে।
বর্তমান বিশ্ব আর একমেরু নয়। বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, কূটনৈতিক মেরুকরণ এবং আঞ্চলিক জোট-রাজনীতি যে কোনো সংঘাতকে জটিল করে তোলে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রশ্নে বিভিন্ন শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বার্থ জড়িত। ফলে সরাসরি সামরিক সমাধানের পথ সহজ নয়।
সবদিক বিবেচনায় “ইরান ইরাক নয়”—এই মন্তব্যের ভেতরে একটি কৌশলগত বাস্তবতা নিহিত আছে। অতীতের অভিজ্ঞতা দিয়ে বর্তমানকে ব্যাখ্যা করা সহজ হলেও তা সবসময় সঠিক নয়। ইরান আজ একটি ভিন্ন সামরিক কাঠামো, ভিন্ন কৌশল এবং ভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীকরণের অংশ। তাই যে কোনো সম্ভাব্য সংঘাত হবে বহুমাত্রিক, ব্যয়বহুল এবং অনিশ্চিত।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আধুনিক যুদ্ধ কেবল ট্যাংক ও যুদ্ধবিমানের সংঘর্ষ নয়; এটি প্রযুক্তি, অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও কূটনীতির সমন্বিত এক জটিল সমীকরণ। সেই সমীকরণ বোঝা ছাড়া কোনো সরল তুলনা বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন দিতে পারে না।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও কবি
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.