প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২১, ২০২৬, ৯:২৩ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ মার্চ ৩, ২০২৬, ৩:৩৩ পি.এম
ইরানে ইসরায়েল–মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ ও বাংলাদেশের অবস্থান | শাহজাহান সিরাজ সবুজ

শাহজাহান সিরাজ সবুজ
ইরানে ইসরায়েল–মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ইস্যুতে দেশের সরকার, প্রধান বিরোধী দল এবং জনমতের মধ্যে এক ধরনের সূক্ষ্ম পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যেখানে দেখা গেছে সতর্ক, ভারসাম্যপূর্ণ ও কূটনৈতিক ভাষা, সেখানে সাধারণ মানুষের একটি অংশের প্রতিক্রিয়ায় ছিল স্পষ্ট আবেগ, যা ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল।
বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংঘাতের প্রসঙ্গে সকল পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রচলিত ধারার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোনো সংঘাতে সরাসরি পক্ষ নেওয়া বা তীব্র ভাষায় নিন্দা করা ছোট ও মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবসময় বাস্তবসম্মত হয় না। বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রবাসী শ্রমবাজার, জ্বালানি নির্ভরতা এবং বহুমাত্রিক বৈদেশিক সম্পর্ক বিবেচনায় সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
তবে সমালোচকদের একটি অংশের মতে, যখন কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তখন কেবল “সব পক্ষকে সংযম” বললে তা পরোক্ষভাবে আক্রমণকারী পক্ষকে সুবিধা দিতে পারে। কারণ এতে নির্দিষ্ট করে দায়ী পক্ষের নাম উল্লেখ করা হয় না। এই যুক্তি থেকেই কেউ কেউ সরকারি ভাষাকে নীরব বাস্তববাদ বা সতর্ক কূটনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। যদিও সরকার সরাসরি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেয়নি, তেমনি ইরানের পক্ষেও প্রকাশ্য সমর্থন ঘোষণা করেনি।
ক্ষমতাসীন দল বিএনপি তাদের বক্তব্যেও মানবিক উদ্বেগ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বানকেই প্রাধান্য দিয়েছে। এতে বোঝা যায়, বৈদেশিক নীতির প্রশ্নে সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল প্রায় একই ধরনের বাস্তববাদী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যের মধ্যে বাংলাদেশকে সাবধানে চলতে হয়—এই উপলব্ধি স্পষ্ট।
অন্যদিকে জামায়াত ও কিছু ইসলামপন্থী সংগঠন তুলনামূলকভাবে কঠোর ভাষায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার সমালোচনা করেছে এবং ইরানের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্যে বিষয়টি শুধু ভূরাজনৈতিক নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের ওপর আগ্রাসনের প্রশ্ন হিসেবেও উপস্থাপিত হয়েছে। ফলে জনপরিসরে একটি ভিন্ন সুর শোনা গেছে।
বাংলাদেশের জনমতের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে ফিলিস্তিন প্রশ্নে সংবেদনশীল। ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির সমালোচনা নতুন নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইরানের প্রতি সমর্থনসূচক প্রতিক্রিয়া, প্রতিবাদী মন্তব্য এবং পশ্চিমা শক্তির সমালোচনা এই মনোভাবকেই প্রতিফলিত করেছে। এখানে রাষ্ট্রীয় কূটনীতি ও জনআবেগের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রকে অর্থনীতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক, প্রবাসী নিরাপত্তা ও বহুমাত্রিক স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কিন্তু জনগণ প্রায়ই বিষয়টিকে ন্যায়–অন্যায়, নৈতিকতা ও ধর্মীয় সংহতির আলোকে বিচার করে।
সরকার বা ক্ষমতাসীন দল সরাসরি ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নেয়নি; একইভাবে তারা ইরানের পক্ষেও প্রকাশ্য রাজনৈতিক সমর্থন ঘোষণা করেনি। কিন্তু সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে প্রশ্ন উঠছে—সংঘাতে দায়ী পক্ষের নাম উল্লেখ না করে কেবল সংযমের আহ্বান কি এক ধরনের নীরব পক্ষপাত নয়? এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্রিক নয়। একদিকে এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তব রাজনীতি, যেখানে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে কৌশলী হতে হয়, অন্যদিকে নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট না করলে জনমতের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অবস্থানের দূরত্ব বাড়তে পারে।
ইরান সংকট তাই কেবল একটি আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রতিফলন নয়, এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক মানসিকতারও একটি প্রতিচ্ছবি। কৌশলগত ভারসাম্য ও নৈতিক অবস্থানের এই টানাপোড়েন ভবিষ্যতেও বৈদেশিক নীতি নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক সৃষ্টি করবে—এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
লেখক: কলামিস্ট ও কবি।
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.