প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২১, ২০২৬, ৯:৪৯ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ মার্চ ২, ২০২৬, ১:০৫ পি.এম
ইরান সংকট: নীরব মুসলিম বিশ্ব, হিসেবি রাশিয়া–চীন

শাহজাহান সিরাজ সবুজ
ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য, জ্বালানি ও বাণিজ্য রাজনীতি এবং বৈশ্বিক প্রভাব-প্রতিযোগিতার প্রতিফলন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য ও তৎসংলগ্ন ২৩টি মুসলিম রাষ্ট্র স্বার্থের কারণে নীরব—এমনকি প্রকাশ্য বিবৃতি বা কার্যকর পদক্ষেপও দেখা যাচ্ছে না। এই নীরবতা কেবল আবেগের অভাব নয়, বরং স্বার্থ-ভিত্তিক কৌশলগত অবস্থান।
প্রথমত, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো গভীরভাবে বিভক্ত। উপসাগরীয় আরব শক্তিগুলো এবং ইরানের মধ্যে বহু বছরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। যারা প্রকাশ্যে সমর্থন জানাবে, তারা অন্যপক্ষকে ক্ষুব্ধ করবে; যারা বিরোধিতা করবে, তারা নতুন রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়বে। নিরাপত্তা স্থাপত্যের বড় অংশ পশ্চিমা জোটনির্ভর। সামরিক সহায়তা, অস্ত্র চুক্তি ও অর্থনৈতিক সংযোগ—সবকিছু মিলিয়ে ঝুঁকি নেওয়া তাদের জন্য অসুবিধাজনক। এছাড়া, অনেক দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট বা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রয়েছে, তাই বাইরে উচ্চকণ্ঠ হওয়া ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্য ও তৎসংলগ্ন ২৩টি মুসলিম রাষ্ট্র স্বার্থের কারণে নীরব থাকতে বাধ্য।
এই শূন্যস্থানটি কাজে লাগাচ্ছে রাশিয়া। মস্কো সরাসরি সংঘাতে ঝাঁপ দেয়নি, কিন্তু আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ব্যবহার করছে:
১. সামরিক ও কৌশলগত সমর্থন:** ইরানের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বজায় রাখছে, অস্ত্র সরবরাহ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা শক্তিশালী করছে।
২. কূটনৈতিক সমর্থন:** আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানের অবস্থানকে স্বীকৃতি দিচ্ছে এবং পশ্চিমা শক্তির সমালোচনা করে তাদের বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষা করছে।
৩. অস্থিরতা ব্যবহার:** মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বজায় রেখে পশ্চিমা মনোযোগ বিভক্ত করছে, যা রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধিতে সহায়ক।
রাশিয়ার কৌশল পরিমিত; তারা জানে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়া বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে। তাই তারা হিসাব করে পদক্ষেপ নিচ্ছে—ইরানকে শক্তিশালী রাখছে, কিন্তু নিজের সরাসরি ঝুঁকি সীমিত রাখছে।
অন্যদিকে চীন সম্পূর্ণ হিসেবি অবস্থান নেয়ার পথে। চীনের অগ্রাধিকার তিনটি: জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক পথের নিরাপত্তা, এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। ইরান চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অংশীদার। উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কও তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। তাই চীন সরাসরি কোনো পক্ষ নেয় না; বরং সংলাপ, সংযম এবং স্থিতিশীলতার আহ্বান জানিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করছে।
সংক্ষেপে—মধ্যপ্রাচ্য ও তৎসংলগ্ন ২৩টি মুসলিম রাষ্ট্র স্বার্থের কারণে নীরব। রাশিয়া কৌশলগত সহায়তা ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে প্রভাব বাড়াচ্ছে; চীন হিসাব অনুযায়ী স্থিতিশীলতার ভাষায় নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করছে। এই সংকট কেবল ইরানের সমস্যা নয়, এটি পুরো আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির প্রতিবিম্ব।
শেষ প্রশ্নটা থেকে যায়—এই হিসেবি নীরবতা কি সাময়িক নিরাপত্তা দেবে, নাকি ভবিষ্যতে আরও বড় অস্থিরতার বীজ বপন করবে?
লেখক: কলামিস্ট ও কবি
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.