বাংলাদেশে ব্যক্তিগতভাবে কিছু সৎ, সাহসী ও দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক নেতার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো—এখনও পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক দলও দেশপ্রেমকে তাদের দলীয় আদর্শ, আচরণ ও কর্মসূচির ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এখানে রাজনীতি মানে জনসেবা নয়; রাজনীতি মানে ক্ষমতা। ক্ষমতা দখল, ক্ষমতা ধরে রাখা এবং ক্ষমতা হারালে প্রতিশোধ—এই তিনটি শব্দেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে দলীয় রাজনীতির সংজ্ঞা।
রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই আদর্শচ্যুত হয়ে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রায় অনুপস্থিত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনমূলক, আর ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখাই যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এর অনিবার্য ফল হিসেবে রাজপথে অশান্তি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাহীনতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে চরম অনিশ্চয়তা নেমে এসেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ব্যর্থতার দায় নিতে নারাজ। ক্ষমতায় থাকলে রাষ্ট্রকে দলীয় সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, আর ক্ষমতার বাইরে গেলে রাষ্ট্রকেই অচল করে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এই আত্মকেন্দ্রিক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়—এটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক নির্মম আঘাত।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
যে রাজনীতির ভিত্তিতে দেশপ্রেম নেই, আদর্শ নেই, নৈতিকতা নেই, সেই রাজনীতি গণতন্ত্রের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে না। বরং সেটিই হয়ে ওঠে গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় অভিশাপ।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ একটিই—দেশপ্রেমভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কার। রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে উঠে আদর্শ, নৈতিকতা ও জবাবদিহিকে রাজনীতির মূল ভিত্তি করতে হবে। রাজনীতি যদি জনগণের কল্যাণের হাতিয়ার না হয়, তবে তা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নেয় না—বরং পিছিয়ে দেয়। বাংলাদেশ আজ সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।
লেখক: শাহজাহান সিরাজ সবুজ, কলামিস্ট ও সাংবাদিক