
মোঃ মনিরুল ইসলাম
পিআর শব্দের পূর্নরুপ হল সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব। এই পদ্ধতিতে ৩০০ আসনে সরাসরি এমপি নির্বাচিত করার পরিবর্তে সারাদেশের জনগন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে বা মার্কাকে ভোট দেবে এবং ভোটের শতকরা হিসাবে এই দলগুলোর মধ্যে আসন বন্টন করা হবে।এই পদ্ধতিটি একটি জটিল ও ভুতুড়ে পদ্ধতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।এর বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন ও সাংঘর্ষিক এবং এর সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি বলে মনে হচ্ছে। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন ভালো কিছু বয়ে আনবে না বলে বহু সুধীজন বহুভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। এতে করে ছোট ছোট দল তো সুবিধা পাবেই না বরং সেগুলো বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই পদ্ধতির আরেকটি অসুবিধা হলো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ও জয়লাভ করার কোন সুযোগ নেই এবং স্থানীয় জনপ্রিয়তা ও জবাবদিহিতা বলে কিছুথাকবে না। এতে দলীয় প্রধানের ক্ষমতা হাজার গুণ বৃদ্ধি পাবে এবংদলীয় প্রধানের ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী এমপি নির্বাচিত হবে। এটাকে নির্বাচন না বলে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা ও পিঠা ভাগাভাগিও বলা যেতে পারে। এতে করে এমপি পদ ক্রয়-বিক্রয় হবে এবং যাদের টাকা আছে তারা খুব সহজেই রেডিমেড এমপি হিসেবে আবির্ভূত হবে। যেখানে দলীয় প্রধানদের ক্ষমতা সংস্কার করার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে উল্টো এই পদ্ধতিতে দলীয় প্রধানকে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার বিশ্ব রোডম্যাপ তুলে দেওয়া হচ্ছে। এই পদ্ধতি চালু হলে কাউকে কষ্ট করে নমিনেশন আদায় করা, ত্যাগ ও জনপ্রিয়তা যাচাই এর মাধ্যমে কোন কিছু অর্জন করতে হবে না। দলীয় প্রধানের আনুগত্য ও কৃপা পেলেই যে কারোর ভাগ্যে এমপি হওয়ার সুযোগ মিলবে। এতে করে রাজনীতির যে ক্ষতি হবে তা হলো বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের কাছে রাজনীতি বিক্রি হয়ে যাবে। ধরুন বসুন্ধরা গ্রুপের মালিক আহমেদ আকবর সোবহান চাইলেই তার তিন গুণধর পুত্রকে ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে নির্বিঘে যে কোন দল থেকে এমপি বানাতে পারবেন।
এবার আসা যাক জামায়াত কেন পিআর পদ্ধতি চায়। জামায়াত হিসেব করে দেখেছে সাধারণভাবে নির্বাচন হলে তারা যে আসন পাবে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে তার চেয়ে তাদের ৫/৭ টি আসন বেশি পাওয়ার সম্ভাবনারয়েছে। সুতরাং জামায়াত এই সুযোগ কিছুতেই হাত ছাড়া করবেনা। প্রয়োজনে আরেকটি ওয়ান ইলেভেন তৈরি হলে হোক, পিআর তাদের দিতেই হবে। এ লক্ষ্যে তারা সরকার ও বিএনপির ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করে ফায়দা নিতে চায়। জামায়াত প্রথমে ৮ টি সমমনা দলকে নিয়ে আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল বর্তমান সময়ের আলোচিত ও সরকারের আশির্বাদপুষ্ট হিসেবে পরিচিত জাতীয় নাগরিক পার্টি(এনসিপি),গণঅধিকার পরিষদ ও এবি পার্টি জামায়াতের এই কৌশলে পা দেয়নি। ফলে জামায়াত চরমভাবে বেকায়দায় পড়ে গেছে। জামায়াত যেটা ভেবেছিল বাস্তবে সেটা হচ্ছে না বরং পিআর সম্পর্কে জনগনের নেতিবাচক ধারনা ও জামায়াতের সাথে অন্য দলগুলোর শত্রুতা বেড়েছে। এখন বলার মতো হাতে গোনা ২/১ ইসলামী দল ছাড়া জামায়াতের সাথে বড় কেউ নেই এবংযারা আছে তারাও শেষ পর্যন্ত থাকবে কিনা তা নিয়ে যতেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। যেমন হেফাজত ইসলাম জামায়াতের সঙ্গে যাবেনা বলে ইতোমধ্যে ঘোষনা দিয়ে দিয়েছে, এখন একমাত্র তাদের সঙ্গি চরমোনাই।আবার চরমোনাইকে নিয়েও বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তুষ্টি ও অস্বস্তি রয়েছে। চরমোনাই পীর এর আগে বলেছিলেন,‘‘যদি জামায়াত কখনো ক্ষমতায় যায়,তাহলে কওমি মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যাবে। এই জামায়াতের পয়জন যেখানে যেখানে লাগবে ইসলাম সেখানে ধ্বংস হয়ে যাবে।”আবার অতীতে জামায়াতও চরমোনাইদের কে মাঝার পুজারী, মাঝার ব্যবসায়ীসহ যা নয় তাই বলেছে।মনে আছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নির্বাচনী ছায়াসঙ্গী হওয়ার পরও চরমোনাই পীরআওয়ামীলীগের হাতে মার খেয়েআহত অবস্থায় মিডিয়ার সামনে হাজির হয়েছিলেন। যাইহোক সেই চরমোনাইও যেনতেন ভাবে পিআর পদ্ধতির আলোকে একটি এমপি পদ হলেও তা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্ঠা করছে। আজকে জামায়াতকে সমর্থন যোগাতে এবংএকটি আসন বাগাতে চরমোনাই পীরসাহেবদের এই অধঃপতনের সঙ্গে বাংলার চিরাচরিত একটি গল্পের সঙ্গে মিল খুজে পাওয়া যায়। গল্পটি হল-কোন একটি ধর্মীয় রক্ষণশীল পরিবারের কর্তা, যিনি একদিন দেখলেন যে নদীতে একটি ডালডা’র নৌকা ডুবে গিয়েছে। সেই ডালডা পানিতে ভাসতে ভাসতে ও ঢেউয়ের আঘাতে ছোট ছোট টুকরা হয়ে কিনারে ভিড়েছে এবং গ্রামের কতিপয় বউঝি ও বাচ্চারা কৌতূহলবশত সেই ডালডার টুকরোগুলো আছলে কুড়িয়ে বাড়ীতে নিয়ে যাচ্ছে। ডালডা কুড়ানোর এই দৃশ্য সেই রক্ষণশীল মোড়লের চোখ খুলে দিলো এবং সেদিন থেকে মোড়ল তার বাড়ীর বউঝিকে প্রতিদিন নদীতে গোসল করার অনুমতি ও হুকুম দিলেন যাতে করে বউঝিয়েরা গোছলের পাশাপাশিনদী থেকে ডালটা কুড়িয়ে বাড়ীতে নিয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশের জামায়াত ইসলাম ও চরমোনাইরা পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে কেন জানি ডুবে যাওয়া নৌকা থেকে ডালডা কুড়ানোর বৃথা চেষ্ঠা করছে।
বিশ্বের কতিপয় দেশে পিআর পদ্ধতি সিস্টেম চালু থাকলেও এটি যে খুব ভাল কিছু তা কিন্তু নয়। পিআর পদ্ধতি ভাল কিছু হলে প্রতিবেশী দেশভারতসহ অন্যান্য দেশ এই পদ্ধতি গ্রহণ করতো। সাম্প্রতিককালে নেপালের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে পিআর পদ্ধতির করুণতম দৃশ্য দেখতে পাব। নেপালে এই সিস্টেমে গত ১৭ বছরে ১৩ বার সরকারের পতন ঘটেছে। আবার ইটালীতে পিআর পদ্ধতি সেদেশের রাজনীতিতে চরম ধ্বশ ডেকে এনেছে।
এবছর শারদীয় দুর্গা উৎসবকে কেন্দ্র করে জামায়াতেরশীর্ষ পর্যায় থেকে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারা সংগঠনটিকেনতুন করে বড় ধরনের ইমেজ সংকটে ফেলেছে। জামায়াতের প্রখ্যাত নেতা, সাবেক এমপি ও কিংবদন্তিতুল্য ইসলামী বক্তা প্রয়াত মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী তার জীবন দশাতে বলে গেছেন “ আমার দুঃখ হয় সেই সকল মাওলানাদের জন্য যারা হিন্দুদের পুজাতে যায়, তারা মাওলানা নামের কলংক।”তিনি আরও বলেন “আমি ১ লক্ষবার বলবো, ১ কোটিবার বলবো দূর্গপুজা হিন্দুদের উৎসব, মুসলমানদের নয়।” অথচ সেইদেলোয়ার হোসেন সাঈদীর পুত্রসহসারাদেশের জামায়াত নেতারা জুব্বা ও টুপি পরে পূজা মন্ডপেগিয়ে গিয়ে ডালডা কুড়ানোর মতো যেভাবে ভোট কুড়ানোর চেষ্ঠা করছেন, সেটা রীতিমতো দৃষ্টিকটু লেগেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে,সাতক্ষীরারএক আমির, অধ্যাপক মতিউর রহমান দুর্গা মন্ডপে গিয়ে গীতা পাঠ করছেন এবং নারী-পুরুষ একসঙ্গে উলুধ্বনি দিচ্ছেন।এটা ছিল গতবছরের দৃশ্য, এর সঙ্গে এবার আরও নতুন নতুন বিতর্ক যুক্ত হয়েছে। সময়ের আলোচিত আইনজীবি ও জামায়াত নেতা শিশির মনির সুনামগঞ্জের পুজা মন্ডবে গিয়ে রোজা আর পুজাকে একাকার করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, ভোটের রাজনীতিতে সেটা জামায়াতকে দেবী দূর্গার সাথে পানিতে বিসর্জন বলা ছাড়া আর কিছু বলা যায়না।পাবনার এক শীর্ষ জামায়াত নেতা পুজা মন্ডবে গিয়ে কৃষ্ণের প্রেমনীলা বর্ননা করতে করতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এগুলো জামায়াতের জন্য ভাল কিছু বয়ে আনবে কি ?বাংলাদেশে ২ শতাধিক ইসলামী দল রয়েছে, তারমধ্যে ৫০টির মতো দল সক্রিয়ভাবে মাঠেও রয়েছে। ইসলামী কোন দলকে হিন্দুদের পুজা মন্ডবে গিয়ে রাজনীতি করতে ও প্রসাদ খেতে হয়না তাহলে ইসলাম নামধারী জামায়াত ইসলামকেন খাচ্ছে ?এর কোন উত্তর জনগণের কাছে নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক হিন্দু সদস্যকেবলতে শোনা যাচ্ছে, “এখন আর হিন্দুদের পুজা করতে পুরোহিতের দরকার হয়না, জামায়াত নেতাদের ডাকলেই গীতা পাঠ করে দেয়।”
আবার জামায়াত তাদের দলীয় লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে আরেক দফা বিতর্কের জম্ম দিয়েছে। তাদের পূর্বের লোগোতে শুরুতেই ছিল আরবিতে লেখা আল্লাহর নাম আল্লাহু এবং তার নিচে লেখা আকিমুদ্দিন অর্থাৎ দীন কায়েম কর। নতুন লোগোতে এই শব্দ দুটিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ঠিক কি কারনে জামায়াত এই শব্দ দুটি বাদ দিলো বা কেন তাদের আল্লাহর নাম বাদ দিয়ে লোগো পরিবর্তন করতে হলো তার ব্যাখা জামায়াত কিন্তু যেনতেন ভাবে দেওয়ার চেষ্ঠা করছে। অনেকেই মনে করছেন অ্যামেরিকা বা ভারতকে খুশি করতে জামায়াত এই উদ্যোগ নিয়েছে। আবার ভারত সম্পর্কে জামায়াতের অবস্থান ও বক্তব্যকে ঘিরেও রয়েছে নানা রহস্য। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এর আগে বলেছিলেন, “জামাত কখনো ভারত বিরোধী ছিল না।”তিনি আরও বলেন,“ভারত নিকটতম প্রতিবেশী, আমরা ভারতকে অহেতুক কষ্ট দিতে চাই না। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে চায় জামায়াত ইসলামী।”গত ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ইনকিলাব পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়, ভারতীয় এজেন্ডা নিয়ে মাঠে রয়েছেজামায়াত। আবার বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকেন জানি জামায়াতের প্রশংসা করেবললেন,“জামায়াত চিতাবাঘ, নির্বাচনে ভালো ফলাফল করতে পারে।” সাম্প্রতিক কালে এটাওশোনা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত নাকি জামায়াতকে ক্ষমতায় যাওয়ার গ্রীন সিগন্যাল দিয়েছে। এটা জামায়াতের নিজস্ব প্রোপাগান্ডা নাকি নিছক গুজব সেটা অবশ্য বোঝা যাচ্ছেনা। এদিকে জামায়াতের সেকেন্ড ইন কমান্ড ও প্রভাবশালী নেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ তাহের ভারতের সাথে যেচে যুদ্ধের বার্তা দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা দেশের সর্বসাধারন কিন্তু ভাল ভাবে নেয়নি। আবার তিনি বিশ্বেরমুসলিম উম্মার যাকাত যেভাবে বাংলাদেশে আনার কথা বলেছেন, সেটাকে অত্যন্ত লজ্জার ও শ্বশুর বাড়ীর আব্দার হিসেবে উল্লেখ করে অনেকেই তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছেন। জামায়াত শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ও বর্তমান এবি পার্টির চেয়ারম্যান মঞ্জু জোড় দিয়ে বলেন,“জামাতকে বিএনপি ৫০ টি আসন দিতে চাইলে২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি নয় ২০২৪ সালের অক্টোবরেই তারা নির্বাচনে যেতে রাজি হবে, কোন পিআর পদ্ধতিও লাগবেনা।” বিএনপি মহাসচীব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তো একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, জামায়াত তাদের কাছে ৩০ টি আসন চেয়েছিল বিএনপি তাতে রাজি হয়নি,বিএনপিতাদেরকে এর চেয়ে কম আসন দিতে চেয়েছে তাজামায়াতেরকাছে নাকি পছন্দ হয়নি। তিনি আরো উল্লেখ করেন,“জামায়াতকে আর আমরা মাথায় তুলবো না, জামায়াত যতটানা শক্তিশালী তার চেয়ে বেশি সম্মান আমরা দিয়ে ফেলেছি।” জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে ১৯৯১ সালে ১৭৫১৭, ১৯৯৬ সালে ১৮০২৯ এবং ২০০১ সালে ১২৪১৫ ভোট পেয়েছেন। তার তিনবারের মোট ভোট যোগ করলেও এমপি নির্বাচিত হওয়ার অর্ধেক ভোটও হয় না। তাহলে জামায়াত কেন পিয়ার পদ্ধতি চাইবে না একবার ভাবুন ?যেহেতু দলটি সব সময় রাজনীতিতে ডাবল গেম খেলে অভ্যস্ত সেহেতু অনেকেই আবার বলছেন পিআর পদ্ধতি আসলে জামায়াতের আসল চাওয়া নয়। তাদের আসল চাওয়া হল জাতীয় পার্টিকে নিষিদ্ধ করা, তাহলে তাদের প্রধান বিরোধী দল হতে সুবিধা হয়। এমনিতেই আওয়ামীলীগকে নিষিদ্ধ করে জামায়াত ক্ষমতার যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। আর যাই হোক ভোটের মাঠ যে বিএনপির দখলে এটা তারা বুঝতে পেরেছে।তাই তাদের বর্তমান টার্গেট হল প্রধান বিরোধী দল হয়ে সংসদে যাওয়া। আবার ভারত ও আওয়ামীলীগের একটি বড় অংশ জাতীয় পার্টির মাধ্যমে আওয়ামীলীগকে পুনর্বাসন করতে চাচ্ছে। এটা যদি সত্যি হয় তাহলেজামায়াতের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।এখন প্রশ্ন উঠতে পারে জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হতে অসুবিধা কোথায় ? জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের বিষয়টি সহজই ছিল কিন্তু জামায়াত সেটাকে জটিল করে ফেলেছে। জামায়াত জনগনের বৃহত্তর স্বার্থে নয় বরং নিজেদের ক্ষমতা পাকা করতে এটাকে আর একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে নিয়েছে,যেটা কিনা প্রধান রাজিৈতক দল বিএনপিসহ অন্যান্য দল বুঝতে পেরেছে। তাছাড়া বিএনপির সঙ্গে লাগামহীন বিরোধীতা ও বৈরী আচরন, বিএনপি সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারনা এবং ইসলামকে রাজনৈতিক হাতিয়ার ও দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার কারনে জামায়াতের এই চাওয়ার সঙ্গে বিএনপিসহ অন্যরা সায় দিচ্ছেনা। এছাড়াও কোন দলকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিদেশীরা ভালভাবে নেয়না বিধায় সরকারও এবিষয়ে জামায়াতের চাওয়ার সঙ্গে একমত হতে পারছেনা।
৫ আগস্টের পর জামায়াত মনে করেছিল বিএনপিকে যেকোন মূল্যে বিতর্কিত করতে পারলেই তারা ক্ষমতায় যেতে পারবে। আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর মাঠ পর্যায়ে বিএনপির নেতা কর্মীরা নানাভাবে দখলদারিত্ব ও চাদাবাজির মতো বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়লে সেটাকে ইস্যু করে জামায়াতের মিডিয়া সেল, কূটনৈতিক সেল ও বট বাহিনী বিএনপিকে জনগণের সামনে আওয়ামীলীগের চেয়েও খারাপভাবে উপস্থাপন করেছে।এছাড়াও নির্বাচন ও সংস্কার প্রশ্নে বিএনপি যা বলেছে জামায়াত তার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। নির্বাচন পিছানো, এনসিপি গঠন, ইউনুস সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতার থাকার ফাঁকা বুলি প্রদান ও পিআর পদ্ধতিসহ নানাবিধ ইস্যুতে বিএনপিকে বড্ড বেকায়দায় ও অস্বস্তিতে রেখেছে এই দলটি। আবার জামায়াত প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এনসিপি দল গঠনে সহায়তার মাধ্যমে এবং সেটাকে বিএনপির বিরুদ্ধে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পেরেছে বৈকি। এটা জামায়াতের একটি বড় সাফল্য হিসেবে ধরা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো জামায়াততার দীর্ঘ ২৫/২৬ বছরের রাজনৈতিক মিত্রের সঙ্গে কোন যৌক্তিক কারন ছাড়াই কেন শত্রুতা সৃষ্টি করলো।তার উত্তর একটাই হতে পারে ক্ষমতায় যাওয়ার লোভ জামায়াত কে অন্ধ করে দিয়েছে।অথচ এই জামায়াতের জন্য বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি না করেছে।২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে যখন যুদ্ধ অপরাধের দায়ে বিচার শুরু করে, তখন বাংলাদেশের সমস্ত পত্র-পত্রিকা, দেশ-বিদেশের বুদ্ধিজীবীরা সবাই আওয়ামীলীগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।জামায়াতের পক্ষে কথা বলার কেউ ছিল না, একমাত্র বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াএই বিচারের বিরোধিতা করে আলেম-ওলামা ও রাজনীতিবিদদের বিচারের নামে প্রহসনের নিন্দা ও মুক্তির দাবী জানিয়ে ছিলেন। তার জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে সেইসময় যা নয় তাই বলেছিল আওয়ামীলীগ ও তাদের বুদ্ধিজীবীরা। জামায়াতের কর্মকান্ড, বক্তব্য ও শ্লোগান দেখলে এবং শুনলে মনে হয় আওয়ামীলীগের সাথে তাদের কোন কালে কোন দ্বন্দ্ব ছিলনা বরং সকল শত্রুতা ও বৈরিতা ছিল বিএনপির সঙ্গে এবং বিএনপি হলো জামায়াতের একমাত্র শত্রু। এর আগে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এক জনসভায় বলেছিলেন “বিএনপি ক্ষমতার ৮০ ভাগ ইতোমধ্যে দখল করেছে। ফুটপাত থেকে, ফকিরের থালা থেকে শুরু করে সব তার দখল করেছে। যা আওয়ামীলীগ সাড়ে ১৫ বছর সাজিয়ে ছিল তার ৮০ ভাগ বিএনপি দখল করেছে।” একবার ভাবুন বিএনপি সম্পর্কে জামায়াতের সর্বোচ্চ নেতার এই বক্তব্য। তারেক রহমান কিংবা মির্জা ফকরুল ইসলাম কখনো কি জামায়াত সম্পর্কে এধরনের বক্তব্য দিয়েছেন ?
আপনাদের একটু মনে করিয়ে দেই,২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর, সেই লগি বৈঠার মিছিল থেকে শুরু করে পরবর্তি সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামীলীগ জামায়াত শিবিরের হাজার হাজার নেতা কর্মী ও শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে হত্যা করেছে। সাতক্ষীরাসহ দেশের নানা প্রান্তের শত শত শিবির কর্মীর লাশ কিন্তু জামায়াত আজও খুজে পায় নাই। তখন জামায়াত বলেছিল, প্রতিটি শহীদের প্রতিটি রক্ত বিন্দুর হিসেব নেওয়া হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো জামায়াত সেইসকল শহীদ ও সর্বশেষ জুলাই আন্দোলনের শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানী করে আওয়ামীলীগ এবং তৎকালীন গণবিরোধী হত্যাকান্ডের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা ও কর্তাব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোন থানায় কোন মামলা করেনি। জামায়াত কেন, কি কারনে এই স্ববিরোধী অবস্থান নিয়েছে তার কোন ব্যাখা জানা নেই। সারাদেশের মানুষ যেখানে আওয়ামীলীগের গণহত্যার বিচায় চায় জামায়াত সেখানে রহস্যজনক কারনে ও স্বস্তা জনপ্রিয়তা লাভের আশায় আওয়ামীলীগকে ক্ষমা করার ঘোষনা দেয়।এখন প্রশ্ন হলো জামায়াত আওয়ামীলীগকে ক্ষমা করার কে ? আসলে জামায়াত বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অভিশাপ হয়ে থাকতে পছন্দ করে। ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার প্রশ্নে যারা দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে,যারা মদিনার ইসলাম বাদ দিয়ে মওদুদীর ইসলাম ধারন করে এবংযারা ক্ষমতার যাওয়ার জন্য আল্লাহর নাম বাদ দিতে পারে জানিনা ভবিষ্যতে তারা আর কতো কি বাদ দিবে।
সমাপ্ত।
ব্যাংকার, লেখক ও কলামিস্ট