
বাংলাদেশ আজ এক চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর মানুষ ভেবেছিল, হয়তো দেশে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নামে যে কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে, তার কোনো কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা আজ ভেঙে পড়েছে, প্রশাসন নিস্ক্রিয়, আর রাজপথে চলছে মবের শাসন।
ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে সামনে এনে মানুষ ভেবেছিল, একটি নিরপেক্ষ, জ্ঞানভিত্তিক ও সুশাসনের যুগ শুরু হবে। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই সেই আস্থার ভাটা পড়েছে। সাধারণ মানুষ, এমনকি একজন রিকশাওয়ালা পর্যন্ত আজ বলতে শুরু করেছে— “আগের সরকারই ভালো ছিল।” এটি নিছক আবেগ নয়, বরং বর্তমান পরিস্থিতির প্রতি মানুষের অসহায়তার বহিঃপ্রকাশ।
রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো এনজিও প্রকল্প নয়। এখানে শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান কিংবা আন্তর্জাতিক পুরস্কারের ঝলকানি দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হয় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, জনসম্পৃক্ততা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা দিয়ে। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় তার কোনো লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। ফলে রাষ্ট্র আজ কার্যত নেতা-শূন্য হয়ে পড়েছে।
আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে। অপরাধী শাস্তির ভয়ে নয়, বরং মবের ছায়ায় আশ্রয় নিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বাকস্বাধীনতার ভণ্ডামি চলছে। কেবলমাত্র কতিপয় রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্টজন ছাড়া সাধারণ মানুষ আজও তার মত প্রকাশ করতে নিরাপদ বোধ করছে না। অর্থনীতিও টালমাটাল। বিনিয়োগ নেই, বাণিজ্যে আস্থার সংকট, কর্মসংস্থান কমে আসছে। ফলে সামাজিক অস্থিরতা আরও বেড়ে যাচ্ছে।
একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে কেবলমাত্র রাজনৈতিক সরকার। কারণ রাজনৈতিক সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়, তাই তাদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। রাজনৈতিক সরকার জানে, রাষ্ট্র পরিচালনা মানে কেবল আইন-শৃঙ্খলা নয়, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির সুসংহত ব্যবস্থাপনা। জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া কোনো সরকার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে যে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এনজিওভিত্তিক বা অরাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যর্থ হবে। জনগণের আস্থা ফিরে পেতে হলে অবিলম্বে একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতন্ত্রের চর্চা ও জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশে যে সংকট আজ দৃশ্যমান, তার মূল কারণ রাজনৈতিক সরকারের বিকল্প খোঁজার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। যত তাড়াতাড়ি আমরা এই সত্য মেনে নেব, তত দ্রুতই দেশ পুনরায় স্থিতিশীলতার পথে ফিরে আসবে।
লেখক: শাহজাহান সিরাজ সবুজ, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।