
যৌনতা মানব জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের শরীর, মস্তিষ্ক ও আবেগে যৌনতা সক্রিয়ভাবে কাজ করে। এটি শুধু প্রজননের মাধ্যম নয়, বরং সুস্থ শারীরিক ও মানসিক জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিজ্ঞান। অথচ আমাদের সমাজে যৌনতা নিয়ে আলোচনা করলে লজ্জা, ভয় কিংবা অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠে। এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন খোলামেলা বৈজ্ঞানিক আলোচনা ও যৌন শিক্ষা।
যৌনতা মানে কেবল শারীরিক সম্পর্ক নয়। মানুষের শরীরে হরমোন যৌন আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে, মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অক্সিটোসিন নামের রাসায়নিক ভালোবাসা ও আনন্দের অনুভূতি দেয়, আর প্রজনন অঙ্গ নতুন জীবন সৃষ্টির সুযোগ করে দেয়। তাই যৌনতা অশ্লীল নয়; বরং এটি জীববিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।
যৌন শিক্ষা হলো— বৈজ্ঞানিকভাবে যৌনতা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও সম্পর্কের বিষয়ে জ্ঞান অর্জন। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়, যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও পরিবার পরিকল্পনা সহজ হয়। একইসঙ্গে ভুল ধারণা ও কুসংস্কার থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, যৌন আকাঙ্ক্ষাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হয় এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মান ও সম্মতির গুরুত্ব বোঝা যায়।
বাংলাদেশে যৌন শিক্ষা এখনো উপেক্ষিত। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌনতা নিয়ে কথা বলা নিষিদ্ধের মতো, ফলে তরুণরা ইন্টারনেট ও অশ্লীল উৎস থেকে ভুল শিক্ষা নিচ্ছে। বাল্যবিবাহ আজও বহুল প্রচলিত, অথচ কিশোররা প্রজনন বা দাম্পত্য সম্পর্কে অজ্ঞ। নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য অবহেলিত হয়, মাসিক ও গর্ভনিরোধ নিয়ে অকারণ লজ্জা তৈরি করা হয়। একইসঙ্গে যৌন হয়রানি ও সহিংসতা বেড়ে চলেছে, কারণ সম্মতির ধারণা এখনো অস্পষ্ট।
বাংলাদেশে যৌন শিক্ষা চালু হলে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ ও যৌনবাহিত রোগ অনেকাংশে কমে যাবে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে। নারীরা নিজের অধিকার ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হবে, শিশু ও তরুণরা যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সক্ষম হবে। একইসঙ্গে অশ্লীল কৌতূহল কমে গিয়ে একটি সচেতন, দায়িত্বশীল সমাজ গড়ে উঠবে।
অতএব, যৌনতা কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং এটি মানুষের শরীর ও মনের সঙ্গে সম্পর্কিত গভীর বিজ্ঞান। বাংলাদেশে যৌন শিক্ষা না থাকার কারণে তরুণ সমাজ ভুল তথ্য ও ভ্রান্ত ধারণার শিকার হচ্ছে। সময় এসেছে যৌনতাকে অশ্লীলতার গণ্ডি থেকে মুক্ত করে বিজ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করার। পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ পর্যন্ত যৌন শিক্ষা চালু করা গেলে সমাজ ভণ্ডামি থেকে মুক্ত হয়ে আরও সচেতন, সুস্থ ও মানবিক হয়ে উঠবে।

✍️ সংকলন ও সম্পাদনায়: শাহজাহান সিরাজ সবুজ, কলামিস্ট ও সাংবাদিক ।