
আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্ষমতালিপ্সা ও অতীতের ভুল পদক্ষেপ বহুবার জাতিকে হতাশ করেছে। ইতিহাস সাক্ষী, যে কোনো দল বা নেতৃত্ব বারবার একই ভুল করলে জনগণ তাদের আর ক্ষমা করে না। আজকের নতুন প্রজন্ম আর অন্ধভাবে কোনো দল বা নেতার পেছনে হাঁটতে রাজি নয়; তারা যুক্তি, জবাবদিহি ও সততার ভিত্তিতে রাজনীতিকে মূল্যায়ন করছে।
এই প্রেক্ষাপটে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উচিত অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া। তাদের ভাষা হতে হবে সংযত, আচরণ হতে হবে নম্র, আর নীতি হতে হবে বাস্তববাদী ও জনগণের কল্যাণকেন্দ্রিক। দাম্ভিকতা, হিংস্রতা ও ক্ষমতার অহংকার কেবল তাদের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে।
একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে নেতাদের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে জনগণকে সম্মান করা, তাদের কণ্ঠস্বর শোনা এবং ভিন্নমতকে মূল্য দেওয়া। নতুন প্রজন্ম আজ পরিবর্তনের দাবিতে সোচ্চার—এটি যেমন একটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি একটি সুযোগও। যারা সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে, তারাই আগামী দিনের নেতৃত্বে জায়গা করে নেবে।
বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ঙ্কর চিত্র হলো—মুখ বদলায়, কিন্তু চরিত্র বদলায় না। আজ যারা নতুন রাজনৈতিক শক্তির মুখপাত্র, তাদের অনেকের ভেতরেও আমরা পুরোনো আওয়ামী মানসিকতার প্রতিচ্ছবি দেখছি। একসময় যারা আওয়ামী লীগের গুণকীর্তন করতে করতে নিজেদের হারিয়ে ফেলেছিল, তারাই এখন নতুন দলে কেন্দ্রীয় নেতা। অথচ তাদের বক্তব্য, ভঙ্গি ও অভিযোগ—সবকিছুতেই সেই পুরোনো অসহিষ্ণুতা ও দোষ চাপানোর সংস্কৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দল পাল্টেছে, কিন্তু মানসিকতা পাল্টায়নি।
ভিন্নমতাবলম্বী বা বিরোধী মতকে মিথ্যা অভিযোগে দমন করা, মবকে উসকে দেওয়া—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন অভিযোগ উঠছে। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে তাদের যে বিশাল অবদান ছিল, সেটি স্বীকার করতেই হবে। সেই অবদানের জন্য তাদের প্রতি সম্মান জানাই। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, তারাও আজ গতানুগতিক রাজনীতির স্রোতে ভেসে গেছেন। জাতি আপনাদের মাধ্যমে নতুন সূর্যোদয় দেখতে চায়। তরুণ প্রজন্ম জাতির প্রত্যাশা পূরণ করবে—বিনয়ী, গঠনমূলক, শিক্ষণীয়, অনুকরণীয় আচরণ করবেন, প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করবেন—এমনটাই জাতি আশা করছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি হলো—এখানে সত্য বলা এক ধরনের অপরাধে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে যেমন সত্য উচ্চারণ করলেই কাউকে সঙ্গে সঙ্গে “বিএনপি-জামায়াতের দোসর” বানানো হতো, আজও সেই একই চর্চা নতুন নামে চলছে। এখন যদি কেউ সত্য বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়—তখন তাকেও “আওয়ামী লীগের দোসর” তকমা দিয়ে সামাজিকভাবে একঘরে করা হচ্ছে, অপমান করা হচ্ছে, মিথ্যা দোষ চাপানো হচ্ছে।
এখানেই বোঝা যায়—আমাদের সমস্যাটা ব্যক্তি নয়, সিস্টেম নয়, বরং চরিত্র। ক্ষমতা বদলেছে, কিন্তু রাজনীতির অসুস্থ সংস্কৃতি একই রয়ে গেছে। প্রতিপক্ষকে যুক্তি দিয়ে পরাজিত করার বদলে মিথ্যা প্রচারণা, গালাগালি আর মবের হাতে তুলে দেওয়াই হয়ে উঠেছে রাজনীতির মূল অস্ত্র।
এই মব সংস্কৃতি শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নয়, গোটা সমাজকেই ভয় দেখায়। আজ আমি লিখছি, কিন্তু কাল কিংবা পরশু আমি নিজেই মবের শিকার হবো না—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ বাস্তবতা আমাদের গণতন্ত্রকে প্রতিদিন অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে।
৫২’র ভাষা শহীদের রক্তে আমরা পেয়েছি মাতৃভাষার অধিকার, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে শহীদের আত্মত্যাগে জেগে উঠেছিল বাঙালির মুক্তির স্পৃহা, ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের বীরদের রক্তে জন্ম নিয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। ৯০-এর গণআন্দোলনে তরুণদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে পতন ঘটেছে স্বৈরশাসনের। আর সাম্প্রতিক ২০২৪ সালে নতুন প্রজন্মের রক্তে আবারও আমরা দেখেছি মুক্তি ও পরিবর্তনের দাবি। ৫২, ৬৯, ৭১, ৯০ কিংবা ২৪—সব ক’টি সময়ের বীরদের আমরা ভুলি নাই, ভুলি না। তারা আমাদের শিখিয়েছে—যখন সত্য, ন্যায় আর স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষই হয়ে ওঠে অসাধারণ বীর।
কিন্তু দুঃখজনক হলো—ক্ষমতার লোভে অতীতের বহু অর্জনই ব্যর্থ হয়েছে, ইতিহাসের সেই ত্যাগকে ছাপিয়ে গেছে স্বার্থপর রাজনীতি। আজও সেই চিত্র ভিন্ন নয়; ২০২৪-এর রক্তঝরা অর্জনও ক্ষমতার লোভে ধূলিসাৎ হওয়ার পথে। এভাবেই বীরদের আত্মত্যাগকে আমরা শুধু স্মরণ করি, কিন্তু তাদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে ব্যর্থ হই।
প্রশ্ন হলো—আমরা কোথায় যাচ্ছি? এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশে রাজনীতি আর কখনোই যুক্তি, সত্য ও নীতির উপর দাঁড়াতে পারবে না। কেবল দলীয় দোষারোপ, গালাগালি আর মবের হিংস্র উল্লাসে রাজনীতি ভেসে যাবে। অথচ রাজনীতি হওয়ার কথা মানুষের মুক্তির হাতিয়ার, সমাজের ন্যায়বিচারের পথপ্রদর্শক।
আমাদের মনে রাখতে হবে—সত্যকে দমন করলে সত্য মরে না, বরং রাষ্ট্র মরে যায়। যারা মব সংস্কৃতি দিয়ে সত্য চাপা দিতে চায়, তারা হয়তো সাময়িকভাবে জয়ী হয়, কিন্তু ইতিহাসে তারা কেবল লজ্জিত হয়। কারণ ইতিহাস কখনোই ভিন্নমত দমনের সংস্কৃতিকে ক্ষমা করে না।
এখনই সময়—আমাদের নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। যেখানে ভিন্নমত মানে শত্রু নয়, সমালোচনা মানে ষড়যন্ত্র নয়, আর যুক্তির লড়াই মানে মব নয়। যদি এই শিক্ষা না আসে, তাহলে শেখ হাসিনার পতন কেবল ব্যক্তির পতন হয়েই থাকবে—ব্যবস্থার পতন হবে না। আর বাংলাদেশের মানুষ কেবল শাসকের মুখ বদল দেখবে, মুক্তির মুখ নয়।
লেখক: শাহজাহান সিরাজ সবুজ
কলামিস্ট ও সাংবাদিক