
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলীয় রাজনীতি সবসময় জনগণের মতপ্রকাশের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে গণতান্ত্রিক চর্চার বিস্তৃত পরিসর সংকুচিত হতে শুরু করেছে। আইনটি বাস্তবে যতটা না গণতন্ত্রকে সুসংহত করেছে, তার চেয়ে বেশি করেছে সীমাবদ্ধ।
প্রথমত, এই আইনের শর্তাবলী এতটাই জটিল ও কঠিন যে শ্রমজীবী মানুষ, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কিংবা সাধারণ মানুষ নিজেরা কোনো দল গঠন করে সেটি নিবন্ধন করতে পারেন না। ফলে সমাজের বৃহত্তর অংশ—যারা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে, যাদের রক্ত-ঘামেই রাষ্ট্রের চাকা ঘুরে—তাদের রাজনৈতিক সংগঠনের অধিকার কার্যত খর্ব হয়েছে। দ্বিতীয়ত, নিবন্ধনের কঠোর শর্তগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতাকে একচেটিয়া করে তুলেছে। ধনী বুর্জোয়া শ্রেণীর রাজনৈতিক দলগুলো অনায়াসে নিবন্ধন করে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করতে পারে।
অন্যদিকে শ্রমজীবী শ্রেণীর নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলো শুরুতেই অচল হয়ে পড়ে। এর ফলে গণতন্ত্রের বহুমাত্রিকতা বিনষ্ট হয়, রাজনীতি পরিণত হয় ধনীকেন্দ্রিক একচেটিয়া খেলায়। তৃতীয়ত, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো জনগণের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও সংগঠনের অধিকার। কিন্তু রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন সেই অধিকারকেই সীমিত করছে। আইনটি কার্যত রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সুবিধার জন্য তৈরি হয়েছে, জনগণের নয়। অতএব বলা যায়, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন গণতান্ত্রিক বিকাশের অন্তরায়।
জনগণের মুক্ত রাজনৈতিক চর্চা, শ্রমজীবী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সংগঠনের অধিকার এবং বহুমাত্রিক গণতন্ত্রের বিকাশ নিশ্চিত করতে এই আইন বাতিল করা জরুরি। আইনটি যতদিন বহাল থাকবে, ততদিন প্রকৃত গণতন্ত্র কেবল স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থাকবে, বাস্তবে নয়।
লেখক: শাহজাহান সিরাজ সবুজ, কলামিস্ট ও সাংবাদিক।