
হুমায়ূন কবির সুইট
জাপান বাংলা পিস ফাউন্ডেশন বিগত ২২ বছর যাবত বাংলাদেশে এই দিবসটি বিশাল এক আয়োজনের মাধ্যমে হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, জাপান দূতাবাস সহ বিভিন্ন জাপানিজ ও বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানের আন্তরিক সহযোগিতায় পালন করে আসছে। সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান ও ব্যাক্তিবর্গকে আমি আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গঠন, যুদ্ধের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি ও একটি শান্তিপূর্ণ ও সুন্দর বিশ্ব গঠনের জন্য যুদ্ধবিরোধী প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে “জাপান বাংলা পিস ফাউন্ডেশন” ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।“আর নয় হিরোশিমা। আর নয় নাগাসাকি, এই শ্লোগান নিয়ে জাপান বাংলা পিস ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্য ৬ই আগস্টকে জাতিসংঘ কর্তৃক আন্তর্জাতিক শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হোক।
আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা সভা এবং সেমিনার এবং নাটকের মাধ্যমে যুদ্ধ ও পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহ প্রভাব তুলে ধরা এবং প্রচার করা, যাতে বর্তমান বিশ্বের সংঘাতময় যুদ্ধ এবং পারমাণবিক বিস্তারের বিরুদ্ধে জনগণের সচেতনতা গড়ে তোলা যায় এবং তাদের মধ্যে একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব গঠনের জন্য পারমানবিক অস্ত্র বিরোধী ও যুদ্ধবিরোধী দৃঢ় মানসিকতা গড়ে তোলা।
আমার দেখা হিরোশিমা
মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রথম পারমাণবিক বোমাটি ব্যবহৃত হয় জাপানের হিরোশিমায় এবং দ্বিতীয়টি ব্যবহৃত হয় নাগাসাকিতে।১৯৪৫ সালের ৬ ই আগস্ট সকাল আটটা পনেরো মিনিটে হিরোশিমা শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে মাত্র পাচশো আশি মিটার উপরে ইতিহাসের প্রথম আণবিক বোমাটির বিস্ফোরন ঘটানো হয়।এদিন মানব সভ্যিতার ইতিহাসে ঘটে এক অকল্পনীয় নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ।অতি ক্ষুদ্র সময়ের ব্যবধানে পালটে যায় হিরোশিমা।মুহুর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয় শহরটি।ধুলোয় মিশেযায় জীবজন্তু,ঘরবাড়ি,রাস্তা ঘাট, গাছপালা। হাজার হাজার প্রাণ হারায় এদিন হিরোশিমা।
পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দুশো আশি মিটার ব্যাসের চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল আগুনের বলের (Fire Ball) সৃষ্টি হয়, এর তাপমাত্রা অতি সুক্ষ সময়ের ব্যবধানে এক মিলিয়ন সেন্ট্রিগ্রেডের উপরে উঠে যায়। চোখ ধাঁধানো আলোক রশ্মির মতো এর তাপমাত্রাও চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।আগুনের বলের নিকটবর্তী স্থানের তাপমাত্রা তিন হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থেকে চার হাজার ডিগ্রি সেন্ট্রিগ্রেডে উঠে যায়(লোহার গলনাঙ্ক ১৫৩৬ ডিগ্রি সে.)আগুনের বৃত্তের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যেকার মানুষের দেহ পুড়ে ঝলসে যায়।শরীরের মাংস হাড় থেকে আলাদা হয়ে গলে পড়তে থাকে। বিস্ফোরনের বিকট শব্দে বাতাসের মধ্যে অতি উচ্চ চাপ সৃষ্টি হওয়ার ফলে এর কেন্দ্রের চাপ বেড়ে গিয়ে প্রতি বর্গমিটার বাতাসের চাপ সর্বোচ্চ ৩৫ টন হয়ে যায়।বাতাসের শক্তির পরিমান ছিলো প্রায় চারশো চল্লিশ মিটার/সেকেন্ড (440m/sec.)। প্রচন্ড শক্তির কারনে বাতাসে যে আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছিল তাতে মানুষ ও অন্যান্য বস্তু সমুহ প্রচন্ড বেগে বাতাসে ছিটকে পড়েছিলো।দুই কিলোমিটার মধ্যবর্তী এলাকার সমস্ত ঘরবাড়ি গাছপালা ছিন্নভিন্ন হয়ে মাটিতে মিশে যায়। দুশো আশি মিটার ব্যাসের আগুনের বলের (Fire Ball)নিকটবর্তী এক কিলোমিটার এলাকার সমস্ত মানুষ আগুনে দগ্ধ হয়ে সঙ্গে সঙ্গেই মারা যায়। কোন কারণে আহত অবস্থায় যারা রক্ষা পায় পর মুহুর্তে তারাও প্রচন্ড বিকিরণের ফলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।হিরোশিমা শহরের নিকটবর্তী যারা তাৎক্ষনিক ভাবে বিকিরণের আওতায় পড়েনি পরবর্তিতে যারা উদ্ধার কাজে অথবা স্বজনের খোজে বিস্ফোরণ কেন্দ্রের কাছাকাছি গিয়েছিলো তারাও দীর্ঘস্থায়ী বিকিরণের আওতায় পড়েছিলো।

আণবিক বোমা বিস্ফোরনের পাঁচ ছয় মাসের মধ্যে পারমাণবিক বিকিরণের মাত্রা অনেকটা প্রশমিত হয়েছিলো কিন্তু পাঁচ ছয় বছর পরও এর কার্যকারিতা বিদ্যমান থাকার ফলে ভয়াবহ দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।লিউকোমিয়া, কেলয়িড, থাইরেড ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার লাং ক্যান্সার সহ অন্যান্য ক্যান্সার জনিত সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দেয়।এমনকি সত্তর বছরের উর্ধে পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্তও পারমাণবিক বিকিরণের প্রতিক্রিয়া মানব দেহে রয়ে গেছে। প্রায় তিন লাখ লোক আজও পারমাণবিক বোমার অভিশপ্ত প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত।আজও অনেক মানব শিশু প্রতিবন্ধি হয়ে জন্ম গ্রহন করছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে হিরোশিমার মিল ফ্যাক্টরি ক্রমশ জাতীয় সরকার অধিগ্রহণ করে নিয়েছিলো। প্রায় সব ফ্যাক্টরীই মিলিটারিদের তত্বাবধানে পরিচালিত হতো।এতে করে জন জীবন কঠিন হয়ে পড়েছিলো। বাধ্যতামুলক ভাবে জাতীয়সার্থে জনগনকে কাজ করতে হতো। ১৯৪৫ সালের ৬ ই আগস্ট হিরোশিমার আশেপাশের শহর এবং গ্রাম থেকে অনেক লোকজন জমায়েত হয়েছিলো শহরের পুরোনো দালান ভেঙ্গে তার ভগ্নাবশেষ নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তরিত করার জন্য। চল্লিশ হাজার মিলিটারির সঙ্গে এরা সবাই ডেমোলিশন(Demolition work)কাজে সাহায্য করছিলো। আগস্ট মাসে জাপানের স্কুল গুলোতে স্বাভাবিক ভাবে গ্রীষ্মকালীন ছুটি থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অর্ন্তবর্তী কালীন সময়ে জাতীয় স্কুল গুলোর স্বাভাবিক ছুটি স্থগিত ছিলো। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুলের ছাত্রছাত্রীদেরও শিডিউল অনুযায়ী ফ্যাক্টরীতে এবং সংস্কার কাজে মিলিটারিদের আওতায় কাজ করতে হতো,কারন জাতীয় স্কুলগুলোও ঐ সময় মিলিটারিদের মাধ্যমে পরিচালিত এবং ব্যবহৃত হতো।ঐ দিন (৬ই আগস্ট)আট হাজার চারশ ছাত্রছাত্রী শহরে জমায়েত হওয়া বহিরাগত ও মিলিটারিদের সঙ্গে ডেমোলিশন (Demolition work) কাজে সাহায্য করছিলো।

৬ই আগস্ট হিরোশিমায় কত সংখ্যক মানুষ মারা গিয়েছিলো তার হিসাব করা সত্যিই কঠিন ব্যাপার,কারণ হিরোশিমা শহরের জনসংখ্যার সমস্ত রেকর্ডপত্র ঐদিন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলো।স্থুলভাবে গ্রহনযোগ্য একটি হিসাবে দেখাযায় হিরোশিমার মোট জনসংখ্যা ছিলো প্রায় দুই লাখ আশি হাজার থেকে নব্বই হাজারের মতো এবং মিলিটারির সংখ্যা ছিলো চল্লিশ হাজার।এ ছাড়াও চায়না,কোরিয়া এবং এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের বেশ কিছু সংখ্যক লোকের অবস্থান ছিলো হিরোশিমা শহরে।সব মিলিয়ে দেখাযায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ লোকের অবস্থান ছিলো ঐ দিন হিরোশিমা শহরে।
১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ নিহতের সংখ্যা দাড়িয়েছিলো আনুমানিক একলাখ চল্লিশ হাজার। ১৯৭৬ সালে হিরোশিমা থেকে জাতিসঙ্ঘকে দেয়া হিসাব থেকে এ তথ্য জানা যায়।পারমানবিক বোমার প্রতিক্রিয়া ছিলো দীর্ঘস্থায়ী, এ কারণে বিশাল একটা সময়ের ব্যবধানে মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, জাপান বাংলাদেশ পিচ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ