হোম » জাতীয় » অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পোশাক খাতে বিক্ষোভ দমাতে যে ব্যবস্থা নিয়েছে

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পোশাক খাতে বিক্ষোভ দমাতে যে ব্যবস্থা নিয়েছে

দেশের পণ্য রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে গত দুই মাসে কয়েক দফা উৎপাদন ও রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয় খাতটিতে। সেই ধাক্কা কাটিয়ে না উঠতেই শুরু হয় অস্থিরতা। এতে তৈরি পোশাকের বিদেশি ক্রেতারা উদ্বিগ্ন। তারা আগামী মৌসুমের ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্রয়াদেশ অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা। বিভিন্ন দাবি আদায়ে গাজীপুর ও সাভারের আশুলিয়ায় টানা দুই সপ্তাহের শ্রমিক বিক্ষোভে তৈরি পোশাকশিল্প বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুরুতে শ্রমিকদের দাবিকে পাত্তা না দিয়ে উসকানিদাতা, বহিরাগত হামলাকারী ও ঝুট ব্যবসায়ীদের দায়ী করেন মালিকপক্ষের নেতারা। তারপরও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শ্রমিকদের দাবি আংশিকভাবে মেনে নেওয়া হয়। তত দিনে শ্রমিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

তৈরি পোশাক খাতের চলমান অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আশুলিয়া। এখানে দেশের বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের কারখানার অবস্থান। একই সঙ্গে বিজিএমইএর কয়েকজন সাবেক সভাপতি ও বিদায়ী সরকারের ঘনিষ্ঠ প্রভাবশালী মালিকদের কারখানাও আছে এখানে। এই মালিকেরাই মজুরিসহ অন্যান্য আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কলকাঠি নাড়েন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত মাসে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ খাতের শ্রমিকেরা বিভিন্ন দাবি আদায়ে বিক্ষোভে নামেন। এ খাতের উদ্যোক্তারা নিজ নিজ কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে কিছু দাবি মেনে নেন। ফলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে ওষুধ খাতের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকে। আর পোশাকশিল্পে উল্টো চিত্র। পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং খারাপ হচ্ছে।

গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুরে ৯৪টি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে মালিকপক্ষ। এর বাইরে দেড় শ কারখানায় ওই দিন উৎপাদন ব্যাহত হয়। পোশাকশিল্পে দুই সপ্তাহ ধরে চলমান এ অস্থিরতা নিরসন না হওয়ার জন্য মালিকপক্ষের পুরোনো কৌশলকেই দায়ী করছেন শ্রমিকনেতারা।

তাঁরা বলছেন, গত দেড় দশকে স্থানীয় মাস্তান দিয়ে ভয়ভীতি ও মারধর এবং মামলা–গ্রেপ্তার করে শ্রমিক বিক্ষোভ বা আন্দোলন দমন করেছে মালিকপক্ষ। এমনকি দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সামনে নিয়ে আসা হয়। এবারও শ্রমিকদের দাবি পাশ কাটিয়ে পুরোনো কৌশলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে মালিকপক্ষ। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।

তবে পোশাকশিল্প মালিকেরা মনে করেন, বর্তমান অস্থিরতার পেছনে বড় কারণ ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় রাজনীতিকদের দ্বন্দ্ব। তাঁরাই শ্রমিকদের উসকে দিচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগের মতো ভূমিকা রাখতে না পারায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ বিজিএমইএর বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন নেতা আত্মগোপনে থাকায় নেতৃত্বেও কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে।

বিক্ষোভ দমানোর ব্যবস্থা

বহিরাগতদের হামলা ও চাকরিপ্রত্যাশীদের বিক্ষোভ থামলেও সাধারণ শ্রমিকেরা কর্মবিরতি চালিয়ে যান। শ্রমিকদের শান্ত করতে ৯ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আশুলিয়ার কারখানা মালিক ও শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিজিএমইএর নেতারা। প্রায় ছয় ঘণ্টার বৈঠকে আশুলিয়ার শ্রমিকদের হাজিরা বোনাস ২২৫ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া টিফিন বিল বাড়ানো; নারী ও পুরুষ নয়, দক্ষতার ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগ এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বাতিল করার দাবি মেনে নেওয়া হয়। এরপরও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ করতে শুরু করেন মালিকেরা।

কয়েক দিন পর আশুলিয়ার ডংলিয়ন ফ্যাশন নামের একটি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করলে অস্থিরতা তৈরি হয়। ২৭ ও ২৯ আগস্ট যথাক্রমে স্কাই লাইন ও পার্ল গার্মেন্টসের শ্রমিকেরা বিভিন্ন দাবি আদায়ে রাস্তায় নামেন। ৩১ আগস্ট নাসা গ্রুপের প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক ১৫ দফা দাবিতে রাস্তা অবরোধ করেন। পরদিন নাসার শ্রমিকেরা আশপাশের কিছু কারখানায় ঢিল ছোড়েন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে এ এলাকার ৪০টি গ্রুপের কারখানা শ্রমিকদের ছুটি দিয়ে দেয়। তারপরই মূলত বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়ে কর্মবিরতি শুরু করেন। তখন বহিরাগত লোকজন কারখানা ফটকে হামলা চালিয়ে শ্রমিকদের বের করে আনতে শুরু করেন। সঙ্গে চাকরিপ্রত্যাশী লোকজনের আন্দোলনও চলতে থাকে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিজিএমইএর নেতারা শুরুতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। তাতে কাজ না হলে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবির যৌথ অভিযান পরিচালনা করাতে সরকারকে রাজি করান তাঁরা। শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতায় জড়িত থাকা ও ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে যৌথ বাহিনী সাভার ও আশুলিয়া থেকে ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। জানতে চাইলে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি রুবানা হক প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি পর্যায়ে মালিক ও শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে সাধারণ শ্রমিকদের দাবিদাওয়া পর্যালোচনা করার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। শ্রমিকদের আশ্বস্ত করে তাঁদের কাজে ফেরার আহ্বান জানানো ছাড়া বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

-আওয়াজ ডেস্ক-

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!