
কাকডাকা ভোর। চারদিক নিস্তব্ধ, জনমানবশূন্য। ভোরের স্নিগ্ধ আলো তখনও পুরোপুরি পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখেনি। অনেক কষ্টে একটি রিকশা জোগাড় করে কোনো রকমে স্টেশনের উদ্দেশে রওনা হলো কবিতা। দীর্ঘদিন পর শিকড়ের টানে, আপন মাটির টানে, সে ফিরছে নিজ গ্রামে। স্টেশনের পথ যেন আজ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দীর্ঘ—প্রতিটি মুহূর্ত যেন তার মনের ভারকে আরও ভারী করে তুলছে।
স্টেশনে পৌঁছে দেখল ট্রেন অপেক্ষা করছে। দেরি না করে উঠে পড়ল সে। নিজের সিটে গিয়ে দেখে, জানালার পাশে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক বসে আছেন। কবিতা নিঃশব্দে নিজের জায়গায় বসে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন যাত্রা শুরু করল।
আজ তার মনটা বিষণ্ন।
এই বিষণ্নতার পেছনে রয়েছে এক সমুদ্রজোড়া অপূর্ণতা। তার কত ইচ্ছে ছিল—স্টেশনে নেমেই দেখবে কবি একগুচ্ছ তাজা ফুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে সেই চিরচেনা মায়া, ঠোঁটে একচিলতে হাসি। তারপর দুজনে পাশাপাশি হাঁটবে খোলা আকাশের নিচে, সেই চেনা পথ ধরে, যে পথে তারা কতকাল হাঁটেনি! কিন্তু সেই সব স্বপ্ন, সব আশা, সব আকাঙ্ক্ষা একটি চিঠির কয়েকটি শব্দেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
কবি লিখেছিল—সে ভীষণ ব্যস্ত।
এই কয়েকটি শব্দই যেন কবিতার সমস্ত রঙ কেড়ে নিয়েছে। প্রকৃতিপ্রেমী মেয়েটি আজ জানালার বাইরে ছুটে চলা প্রকৃতির সৌন্দর্যও অনুভব করতে ভুলে গেছে।
রাজশাহী ছেড়ে ট্রেন হুইসেল দিতে দিতে ছুটে চলছে মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। স্নিগ্ধ বাতাসে দুলছে ফসলের সবুজ ঢেউ। মাঝেমধ্যে হকারদের ডাক—
“বাদাম, বাদাম!”
“বুট, ছোলা, ঝালমুড়ি!”
—কানে এলেও কবিতার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
সে তলিয়ে গেছে স্মৃতির অতল গহ্বরে।
কীভাবে কবির সঙ্গে তার প্রথম পরিচয়?
কীভাবে অচেনা থেকে এত আপন হয়ে ওঠা?
কীভাবে একসময় কবিই হয়ে উঠল তার সমস্ত ভালো লাগার কেন্দ্রবিন্দু?
দেখতে দেখতে কেমন করে দুটি বছর পেরিয়ে গেল!
ভাবতে ভাবতে সে যেন সময়ের গহ্বরে হারিয়ে গেল।
হঠাৎ এক নরম কণ্ঠের ঘোষণায় তার ঘোর কাটল—
“অল্পক্ষণের মধ্যেই বড়াল ব্রীজ স্টেশন পৌঁছাবে ট্রেন।”
মুহূর্তেই তার মনটা আরও ভারী হয়ে উঠল। যেন নামতে ইচ্ছা করছে না। ইচ্ছে করছে সময়টা এখানেই থেমে যাক। মনে মনে সে এখনও আশা করছে—কবি এসে তাকে ট্রেন থেকে নামাবে। কিন্তু সে আশা তো পূরণ হওয়ার নয়… অন্তত সে তাই ভেবেছিল।
স্টেশনে পৌঁছে সবাই তাড়াহুড়ো করে নেমে গেলেও কবিতা ধীর পায়ে নামল। হাতে ছোট্ট কাপড়চোপড়ের ব্যাগ, কাঁধে ঝোলানো একটি ছোট পার্স। স্টেশন পুরো ফাঁকা নয়, তবে কোলাহলও নেই।
বিষণ্ন মন নিয়ে কয়েক কদম এগোতেই হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে এল এক পরিচিত ডাক—
“কবিতা!”
সে থমকে দাঁড়াল। মনে হলো, হয়তো অন্য কাউকে ডাকা হচ্ছে।
আরও দু’পা এগোতেই আবার—
“কবিতা… কবিতা!”
এবার তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। ব্যাকুল হৃদয়ে ফিরে তাকিয়ে যা দেখল, তা যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
সামনেই দাঁড়িয়ে কবি।
চোখেমুখে সেই চেনা হাসি।
কবিতা যেন মুহূর্তেই সমস্ত দুঃখ ভুলে গেল। হাতের ব্যাগ ফেলে প্রায় দৌড়ে এসে দাঁড়াল তার সামনে।
কবিতা: তুমি!
কবি: হ্যাঁ, আমি। সারপ্রাইজ!
এই একটি শব্দেই যেন কবিতার সমস্ত অভিমান, সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত কষ্ট মুহূর্তে গলে গেল।
কবি নিজ হাতে তার ফেলে রাখা ব্যাগ তুলে নিল। তারপর দুজনে পাশাপাশি প্ল্যাটফর্মের চেয়ারে বসে পড়ল।
আজ কবিতা সমস্ত লজ্জা ভুলে কবির দুই হাত নিজের হাতে তুলে নিল। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার চোখের দিকে। সেই চোখে আজ আনন্দ, বিস্ময়, স্বস্তি আর ভালোবাসার এমন এক দীপ্তি, যা কবি আগে কখনো দেখেনি।
মনে হচ্ছিল, মেয়েটি আজ যেন তার সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত অপেক্ষার পূর্ণতা খুঁজে পেয়েছে।
কবি: এভাবে কী দেখছ?
কবিতা: তোমাকে।
কবি: লোকে কী ভাববে?
কবিতা: জানি না… আজ কিছুই ভাবতে ইচ্ছে করছে না।
কবির ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
কবি: চলো, বাসায় যাবে না?
কবিতা: যাব… কিন্তু এখনই যেতে ইচ্ছে করছে না।
এই মুহূর্তটাকে যেন সে আরও কিছুটা সময় নিজের করে রাখতে চায়।
অবশেষে কবি মৃদু স্বরে বলল—
“চলো, গাড়ি ধরতে হবে।”
গাড়িতে উঠে দুজন মুখোমুখি বসল। বাইরে মেঠোপথ, দূরে সবুজ মাঠ, আকাশে মেঘের ভেলা।
হঠাৎ আবার কবিতা কবির হাত ধরে ফেলল।
কবি স্বভাবতই একটু লাজুক। ইশারায় হাত ছাড়াতে চাইল, কিন্তু ব্যর্থ হলো।
কবিতা চোখের ভাষায় জানিয়ে দিল—
আজ হাত ছাড়বে না।
তারপর শুরু হলো চোখে চোখে কথোপকথন।
সেই কথার ভাষা শব্দহীন, অথচ কত গভীর!
সে ভাষা শুধু তারাই বুঝল।
পৃথিবীর আর কেউ নয়।
লেখক:
মোঃ হাবিবুর রহমান
শিক্ষার্থী, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়।