হোম » প্রধান সংবাদ » শহীদ সৈয়দ নজরুলের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের বাড়িটি

শহীদ সৈয়দ নজরুলের স্মৃতি বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গ্রামের বাড়িটি

শাহজাহান সাজু, কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জের সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়ন চারদিকে সবুজের ছায়াঘেরা, পাখি ডাকা এক নিভৃত গ্রামের নাম বীরদামপাড়া।
সামনে বিশাল ফসলের মাঠ।এ অজোপাড়া গাঁয়েই জন্মেছিলেন একজন বীর বাঙালি রাজনীতিবিদ।গ্রামের জল-কাদা মেখে যে ছেলেটির শৈশব কেটেছে নিভৃত এ গাঁয়ে, একদিন তিনিই হয়ে উঠেছিলেন দেশের ক্রান্তিকালের কাণ্ডারি।
তিনি বাংলার বুলবুল হিসেবে পরিচিত শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম।গ্রামের মেঠোপথের ধারে অসংখ্য গাছগাছালির মাঝে চোখে পড়বে একটি বাড়ির ছোট্ট টিনশেড ঘর।বীরদামপাড়া গ্রামের এ ঘরটির সঙ্গেই মিশে আছে একজন বীরের স্মৃতি।এটিই দেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের বাড়ি।মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন আপদমস্তক একজন সৎ ও নির্লোভ রাজনীতিক।
১৯২৫ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি তারিখে বীরদামপাড়া গ্রামে এ বাড়িতেই জন্মেছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।শৈশবে যশোদল মিডল ইংলিশ স্কুলে পড়াশোনা শুরু।এরপর ভর্তি হন ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে।ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতি মিশে যায় তার রক্তে।জাতীয় নেতা হলেও এলাকার প্রতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছিল গভীর মমতা।সুযোগ পেলেই ছুটে আসতেন গ্রামের বাড়িতে।
আর বাড়িতে এলেই তিনি থাকতেন ছোট্ট এ টিনশেড ঘরে।১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর অন্য তিন জাতীয় নেতার সঙ্গে কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় সৈয়দ নজরুল ইসলামকে।এরপর থেকেই থেমে যায় সেই ছোট্ট কুটিরে একজন বীরের পদচারণা।নিভে যায় সেই ঘরের আলোও।তালা পড়ে ওই ঘরের টিনের দরোজায়।এরপর কেবল ইতিহাস।সৈয়দ নজরুল ইসলামের বড় ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাবার পথেই হাঁটতে থাকেন।বাবার আদর্শেই তিনি দেশের দুঃসময়ে পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।বীরদামপাড়া গ্রামে সৈয়দ নজরুল ইসলামের বাড়িতে নতুন ঘর ওঠে।কিন্তু বাঁচিয়ে রাখা হয় বীরের স্মৃতিবিজড়িত ছোট্ট টিনসেড ঘরটি।
সৈয়দ নজরুল ইসলামের কন্যা ও সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের ছোট বোন কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি শত ব্যস্ততার মাঝেও সময়-সুযোগ পেলেই ছুটে যান বাবার স্মৃতি বিজড়িত যশোদলের বাড়িটিতে।সংসদ সদস্য পৈতৃক বাড়িতে গিয়ে গ্রামের ও এলাকাবাসীর সাথে কুশল বিনিময়সহ সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেন।স্বাধীনতার পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেয়ার পর যশোদলে গড়ে তোলেন সুগার মিল, টেক্সটাইল মিলসসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা।কিন্তু তার মৃত্যুর পর নিভে যায় সব সম্ভাবনার আলো।
তাই তো এলাকাবাসীর হৃদয়ে স্থান করে নেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।ইতিহাসের নির্মম এ হত্যার সঙ্গে জড়িতদের পূর্ণাঙ্গ বিচার দেখে যেতে চেয়েছিলেন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছোট ভাই সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম।কিন্তু সেই অপূর্ণতা নিয়েই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্মৃতি বিজড়িত বাড়ির আশপাশের বাসিন্দারা জানান, আমাদের মহান নেতা কে হত্যার পর তার পরিবারে নির্মম নির্যাতন নেমে আসে।
পুরো পরিবারকে হত্যার চেষ্টা করে স্থানীয় রাজাকাররা। পরিবার-পরিজন নিয়ে দীর্ঘদিন পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে তাদেরকে।এলাকাবাসীর দাবি জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় বাস্তবায়ন। কিশোরগঞ্জবাসী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলামকে।জেলহত্যা দিবসে নীরবে চোখের জল ফেলেন তার স্বজনেরা।শহীদ স্বজন ও এলাকাবাসীর কাছে টিনসেড ঘরটি সব সময় স্মৃতি জাগানিয়া একটি স্থাপনা।
শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের নামে কিশোরগঞ্জে একটি মেডিকেল কলেজ, একটি স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে।বীরদামপাড়া গ্রামে সৈয়দ নজরুল ইসলামের মহান স্মৃতি কে বাঁচিয়ে রাখতে বিভিন্ন স্মৃতি স্মারক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবে সরকার, এমন আশাবাদ এলাকাবাসীর।
error: Content is protected !!