হোম » প্রধান সংবাদ » জার্মানিতে একজন বাঙ্গালী ট্যাক্সিচালকের রোজনামচা

জার্মানিতে একজন বাঙ্গালী ট্যাক্সিচালকের রোজনামচা

সৈয়দ আহসানঃ এই জার্মানিতে একজন ট্যাক্সিচালককে প্রতিদিন কত ঘটনার সাক্ষী হয়ে কত শত পরিস্থিতি সামাল দিয়ে নিজের অস্তিত্ত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করে বাঁচতে হয় তারই কিছু ঘটনা জানাতে চাই। নিত্য দিনের মতো আজ সন্ধায় ফ্রাঙ্কফুর্টের প্রধান রেলস্টেশনের ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছি। পৃথিবীর নানাদেশ তথা জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিমান আর ট্রেনে চেপে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ট্যাক্সিতে উঠেপরে তাই এখানে প্রচন্ড ভীড় থাকে। এক ঘন্টার মধ্যেই শর্ট ড্রাইভের দুবার ২ জন যাত্রী পেয়ে গেলাম। তাই আবার ফিরে এসেছি এখানে ৪০ মিনিট পর সিরিয়ালে
আমার ডাক পড়লো. এবার একটা বিশাল হ্যান্ডব্যাগ নিয়ে একটা বিশ বছরের তরুণী আমার ট্যাক্সিতে চেপে বসলো। অনেক দূর থেকে এসেছেন তিনি I একটা প্রীতিভোজের অনুষ্ঠানে শো-ড্যান্সার হিসেবে নাচতে হবে তাঁকে। তার গন্তব্যে পৌঁছে গেছি প্রায়। আর ৪০০ গজ পেরোলেই পৌঁছে যাবো। সামনে তাকিয়ে দেখি ভারী মেশিনগান সজ্জিত প্রায় দুশোর অধিক কালো পোষাক ধারী টেরোর কমান্ডো ইউনিটের পুলিশ সমস্ত এলাকা ঘিরে রেখেছে। আমার ট্যাক্সি দেখেই চারজন পুলিশ পথ আগলে দাঁড়ালো। এক ঝটকায় আমার দরজাটা খুলে মেশিনগানের নল টা ঠিক কানের কাছে ঠেকালো। আরেকজন আমার বৈধ কাগজপত্র চেক করছিল।

এদিকে আমার পাশে বসা মেয়েটিকে টেরোরিস্ট ভেবে এক মহা তুলকালাম সৃষ্টি করলো আরো চারজন পুলিশ। আমিতো বুদ্ধের মূর্তির মতো বিশটা মিনিট ঠায় বসে রয়েছি। আর মেয়েটাকে গাড়ী থেকে বারকরে আপাদ মস্তক অনুসন্ধানের পর তাঁর ভারী ব্যাগ টা পুঙ্খানু পুঙ্খ পরীক্ষা শুরু হলো। খুঁজে পাওয়া গেল একজোড়া নাচের জুতো , কিছু কসমেটিক , অন্তর্বাস আর কাঁচুলি।

পরিচয়পত্র আর গত পাঁচ বছর কোথায় কোথায় অবস্থান করেছে সেগুলির বিস্তারিত বিবরণী গুলো চেক করে বিভিন্ন দফতরে ফোন করে নিশ্চিন্ত হয়ে তার পর অনুষ্ঠানে যাবার অনুমতি পাওয়া গেল। সেখান থেকে আগের জায়গায় ফিরে এসে দেখি ফ্রাঙ্কফুর্টের সমস্ত ট্যাক্সি যেনো ওখানেই ভীড় করেছে। তাই তেমন সুবিধে হবেনা ভেবে কাছেই একটা বড় হোটেলের সামনে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। প্রায় দেড় ঘন্টা পর সিরিয়ালের এক নম্বরে চলে এলাম। যাত্রীর আশায় অধীর ভাবে এদিক সেদিক তাকিয়ে আছি।

অন্যসব ট্যাক্সি যাত্রী নিয়ে চলে গেছে। এবার যাত্রী না নিয়েই ওখান থেকে রনে ভঙ্গ দিয়ে এবার শেষ চেষ্টা হিসেবে শহরের মাঝখানে এক জনপ্রিয় ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে চলেগেলাম। আমার সামনে আরো ১৯টা ট্যাক্সি লাইনে আছে। মনে হলো যাত্রী পেতে মাঝরাত পেরিয়ে যাবে। হায়রে কস্ট !

একি ওই যে দূর থেকে পাঁচটি বাঁদর ছোড়া আমার ট্যাক্সির কাছেই দৌড়ে ছুটে আসছে। বললো আমাদের তাড়াতাড়ি যেতে হবে তাই তোমার ট্যাক্সিতেই যাবো। পিছনের আরো একটা সিট্ খুলে দাও।

বললাম আমিই তোমাদের নিয়ে যাবো তবে একটু চাপাচাপি করে চার জন ই পিছনে বসে যায়। আমার ট্যাক্সি গন্তব্যে ছুটলো। উনিশ বিশের এই বাঁদর ছেলেরা আমার সঙ্গে ভীষণ দুষ্টামি শুরু করে দিলো। বলছে বেশি পয়সা কামানোর আমাদের ঘোরা পথে নিচ্ছ কেন ? আমার দেশ ,নিয়ে ঠাট্টা আরো কত কি এবার পৌঁছে গেলাম ওদের হোটেলে।

ভাড়া ১৩ইউরো। এখন ওই পাঁচটি ছেলেই প্রত্যেকে ১০ ইউরোর বের করে আমাকে দিয়ে দিল। কেউ বা পকেটে ভরে দিল।

তার পর খুচরো পয়সার বন্যা। যার পকেটে যা ছিল তাই আমাকে দিতে লাগলো এতে বিরক্ত হয়ে বললাম যা তোরা ভাগবি এখন থেকে। আমার আর পয়সার
দরকার নাই।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!