
শেখ হান্নান: ঘটনার সময় ১৯৪০-৪১ সাল। ভারতবর্ষ সহ পৃথিবীর অর্ধেক প্রায় বৃটিশ সাম্রাজ্য। ইংরেজ জাতির ভারতবর্ষ কে শোষনের পাশাপাশি কিছু জনহিতকর কাজ করতো। সে সময় সিভিলে সাপ্লাই বলে একটা মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ছিল। এখান থেকে বিশুদ্ধ পানির জন্য টিউবওয়েল, কুপি বাতির পরিবর্তে হ্যারিকেন, চাল, ডাল লবণ তেল, ম্যালেরিয়া মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য মশারীও দেয়া হতো।
এই সিভিল সাপ্লাইয়ের স্টোরে চাকরি করতেন চাটমোহরের থানার গুইনাগাছা গ্রামের ফজল মিয়া। প্রতি বছর ধান ফসল বানে ডুবে যায়, অনাধূনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে কৃষকের পোশায় না। ফলে সারা বছর মানুষের অভাব অনটন লেগেই থাকে। ভাত কাপড়ের অভাবে পূর্ব বাংলার মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। কাজ নেই খাবারও নেই। পাড়ায় পাড়ায় মানুষ কর্মহীন। রাস্তার পাশে ফজল মিয়ার ফুফাতো ভাই হরমুজ বসে ঝিমোয় আর হতাশা হয়ে তাকিয়ে ইনসাফকে বলে-
-"বাহ! ফজল মিয়ার কত সুখ? দেকচু ইনছাপ। কোনো রকমে মেট্রিক পাশ কৈরে কত ক্ষমতার চাকরি খান করে"। ইনসাফ একটা খরছি দিয়ে মাটিতে আকজোক করতে করতে বললো-
-" ফজলারে কী দেকপো। যে আকাল পড়িছে তাতে আমাগারেতো না খায়া মরতি হবি!" হরমুজ আরো একটু কাছে গিয়ে ইনসাফের কানে ফিসফিস করে বললো-
-" আমাগারে ঘরে কুপি জ্বালাইতে পারিনা হের ঘরে হ্যারিকেন জলে। আমরা খাই নদীর পানি হে খায় টিবলের পানি"। ইনসাফ সুযোগ বুঝে স্পষ্ট করেই বললো-
-" আরাক দিন তার ঘরে ফুচকি দিয়া দেহি ঘরের মধ্যে গোড়ের মতো কী জানি বাইন্ধা রাইকচে। আমি তারে জিগাইলে আমার উপুড় ঘেউ ঘেউ কৈরা ওইঠলো। কৈলাম রাগো ক্যা। জীবনে দেহি নাই তাই জিগাইলাম। তহুন এলল্যা ঠান্ডা হইয়া কৈলো হেইডা মশা মারার যন্ত্র"। হরমুজ বললো-
-" ফজলের মেয়া আমার বৌরে কৈছে ওইডা হৈল মশা মারার ফান্দ। অর মধ্যে হানদাইলে আর মশা কামড়াতে পারে না। মানুষের কত বুদ্ধি। দেকচু ইনচাপ ক্যামন কৈরে অমন জিনিস বানালো! তাজ্জব বেপার।"
ইনসাফ পশ্চিম দিকে মুখ ঘুরিয়ে দেখে ফজল আসছে। দুজন চুপ মেরে গেলো। ফজল কাছে আসতেই হরমুজ জিজ্ঞেস করলো-
-"ভাই তোমার ঘরে গোড়ের মতো কী জানি টানাইনা দেখলাম"? ফজল বগলা মার্কা সিগারেট আগুন সমেত অর্ধেক পায়ের নিচে পিষে রাগান্বিত হয়ে বললো-
-" যাই টানাইনা, তা তোমাগারে এতো অসুবিধা ক্যা? আমার বাড়ির টিবল দেইখা, ঘরে হ্যারিকেন জললি তোমাগারে চক্ষু টাটায় ক্যা? কী পাইছো কী? তোমরা
খাইবা পাগাড়ের পানি। কিউলেকস মশার
কামড়ে যখন ম্যালেরিয়া হইবো তখন
বুইঝবা ঠেলা। পাইট কামলা দেওয়া থুইয়া
আমার বাড়িত, আমার ঘরে কী আছে তাই
দেখার জন্যে ওনাগারে যাউ উতলায়া
পড়ে"।
পাড়া প্রতিবেশী সম্পর্কে আরো কত কিছু বলতে বলতে হাটখোলার দিকে চলে গেল। এর কিছুক্ষণ পরই তিনজন হাফপ্যানট পরা পুলিশ ইস্টিশন রাস্তা দিয়ে এসে হরমুজ আর ইনসাফ বসে কথা বলছিল সেই খানে দুজনকে পেয়ে বললো-
- "দাড়াও। দৌড় দেবেনা। দৌড় দিলে গুলি করবো"। হরমুজ আর ইনসাফ ভয়ে কাঁপতে ছিল। জীবনে পুলিশের সামনে পরেনি। আজ সেই পুলিশ যমের মতো সন্মুখে।
(অনু গল্প )