
শেখ হান্নানঃ ইনসাফ আর হরমুজকে পুলিশে ধরেছে, মুহূর্তের মধ্যে প্রচার হয়ে গেল। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলমান। আকাশে ঘনঘন যুদ্ধ বিমান উড়ছে। পুলিশের ভয়ে গ্রাম পুরুষ শুণ্য। সবাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তিন পুলিশ আর ইনসাফ হরমুজ, ফজল মিয়ার বাড়িতে ফজল মিয়ার খোঁজ নিয়ে জানলো যে, সে সকালে বাড়ি থেকে কোথায় গেছে তার স্ত্রী খতিবন নেছা তা জানেন না।
ফজল মিয়া কোনদিকে গেছে তা জানলেও পুলিশকে হ্যা না কোনো কিছু না বলে চুপ রইল ইনসাফ হরমুজ। সবাই ভাবলো ফজল নিশ্চয়ই কোনো চুরিচামারী নয়তো কোনো খুনখারাপি করেছে। তা না হলে কোন কারণে পুলিশ? তবে শেষান্তে জানা গেল যে, অফিসে সরকারি সম্পদ তসরুপের দায়ে ফজল মিয়াকে তিন মাস পূর্বে চাকরি সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। তার চুড়ান্ত শুনানির জন্য কোলকাতায় হেড অফিসে যেতে নিদর্শনার নোটিশ পুলিশ নিয়ে এসেছে। নোটিশজারী শেষে পুলিশ চলে যাবে এমন সময় বাড়ির ঝোপের রেরার আড়ালে দাঁড়িয়ে খতিবন সাহস নিয়ে মৃদু কণ্ঠে বললো- -"এল-ল্লা খাড়া হন"। বসার জন্য বাড়িতে দুটি টুল ছিল, হরমুজ এনে বসতে দিল।
একজন দাড়িয়ে রইল। খতিবন নোটিশ প্রাপ্তিতে মর্মাহত হলেও বুদ্ধিমতি ছিল। তার স্বামীর কাছ থেকে জেনেছে পুলিশ ঘুষ খায়। তার কাছে মুরগির ডিম এবং গরুর দুধ বিক্রির কিছু পয়সা জমানো ছিল। হাতরিয়ে হুতরিয়ে কোনো রকমে সোয়া তিন টাকা হল। সেখান থেকে হরমুজের মাধ্যমে তিন পুলিশকে তিন টাকা দিয়ে বিদায় করল। ঘুষ গ্রহণের পর দেখা গেল যে, যে পুলিশ অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছিল তাদের মেজাজ এখন বরফের মতো গলে পানিতে পরিণত হল। তারা এখন খুব শান্ত। খুব ভদ্র, খুব ঠাণ্ডা মেজাজের। যাবার সময় সৌজন্যতার খাতিরে খতিবনকে "ভালো থাকবেন" বলে হাসি মুখে বিদায় নিল। পুলিশের এই ব্যবহার খতিবনের কোনো ছেলে অথবা মেয়ের শ্বশুর বিয়াই সাহেবের বিদায়ের মতো মনে হল।
ফজল মিয়া ভালো করে জানে এবার তার চাকরি আর থাকবে না। চাকরি না থাকলে অসুবিধা নাই। অসুবিধা এবং ভাবিত বিষয় হল এবারে যে তসরুপের ঘটনা, তাতে নির্ঘাত পাঁচ থেকে সাত বছরের জেল হবে তার! ফজল বাড়িতে এসে সব বৃত্তান্ত অবহিত হয়ে নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিল। লোভের বশবর্তী হয়ে অফিসের ঘটনা পাড়াপ্রতিবেশি, গ্রামের মানুষ, আত্মীয় স্বজনগণ জেনে গেল। এ লজ্জা কী দিয়ে ঢাকবে? পাবনা সিভিল সাপ্লাই অফিস তার বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ তসরুপ অভিযোগের চুড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন, সিভিল সাপ্লাইয়ের হেড অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছে। ইংরেজ অফিসারদের কাছে কোনো তদবির, ঘুষ চলবেনা। ২২ ফেব্রুয়ারি আত্মপক্ষ সমর্থনে হেড অফিসে হাজির হতে হবে।
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ তার অফিস থেকে ইতোপূর্বে তার বিরুদ্ধে বার্মার আতপ চাল, তেল লবন, চিনি ডাল তসরুপসহ উৎকোচ গ্রহণের দায়ে বেশ কয়েকবার স্থানীয় ভাবে শাস্তি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এবারের দূর্নীতি ভিন্নতর। বৃটিশ সরকার পূর্ব বঙ্গের মানুষকে ম্যালরিয়া জর থেকে রক্ষার জন্য প্রতিটি থানায় তিন শ করে মশারি দিয়েছিল। সেই মশারি জনগণকে না দিয়ে দুই টাকা করে ছয়শত টাকায় বাইরে বিক্রি করেছিল। আর এই টাকা দিয়ে পাবনা শহরে দিলালপুরে দশকাঠার বাড়ি করার জায়গা কিনেছে সে।
কতবড় বুকের পাটা। কতবড় সাহস এই ফজল মিয়ার। এখন তার ঘুম নাই। না খেয়ে খেয়ে কয়েক দিনে পাগলের মতো হয়ে গেছে। শরীর শুকিয়ে কাঠ হল। যে কেউ দেখলে তাকে ফজল মিয়া বলে চেনা কষ্টকর।
যারা চতুর, ধুরন্দর, উপস্থিত বুদ্ধিতে পটু তারাই ঘুষ খেতে পারে। নয়তো ঘুষ খেয়ে ঘুষ হজম করা খুব কঠিন কাজ। ফজল মহাবিপদে পরে গেল। অল্প সময়ে না যাবে কেনা জায়গা জমি বিক্রি করা, না পাওয়া যাবে কর্জ কটে টাকা। চারটি মেয়ে একটি ছেলে। সবাই স্কুল কলেজে লেখা পড়া করে। বাবার এমন কুকীর্তি বদনাম গ্রামের মানুষের মুখে মুখে। তাই লজ্জায় তারা বাইরে খেলতে যায়না। স্ত্রী খতিবন স্বামীর এমন কর্মে আহার পানি বন্ধ। পরিবারের মান সন্মান ধূলোয় মিশে গেল। তার মনজুড়ে দুঃচিন্তার ভয়ার্ত মেঘের আস্ফালন, স্বামীর যদি জেল হয় তা হলে তাদের কী হবে? ফজল মিয়া যতই চালাক যতই চতুর হোক, সে বুঝতে পেরেছে সাতদিন চোরের একদিন গৃহস্থের।
তার পরেও ফজল মিয়া ফন্দি আটতে থাকে, সিদ্ধান্ত নেয় সে যাবে এবং কেনো মশারি তসরুপে অভিযুক্ত, তার পক্ষে নিজেই যুক্তি উপস্থাপন করবে। দয়া পেলে ভালো, নয়তো লাল দালানের বাসিন্দা। এই মতে সে স্ত্রী পুত্র কন্যাদের নিয়ে যাত্রা করলো কোলকাতার উদ্দেশে। ফজল মিয়ার পাঁচটি আত্মা তাকে বারবার বলছে- না এবার তার নিস্তার নেই। জেল হবে অনিবার্য। তাই স্ত্রী পুত্র কন্যাদের দেখে যদি ইংরেজ অফিসারের যদি মন একটু টলে! তার এই উদ্দেশ্যের কথা ফজল মিয়া স্ত্রীকে বললো না। ট্রেনে উঠে শুধু তার স্ত্রীকে বললো-
-"দেখ লোভে পরে যে ভুল আমি করছি, তার প্রায়চিত্ত আমাকে করতে হবে। তোমাদেরও করতে হবে। আমি জানি আমার মন বইলতাছে আমার জেল হবেই। জেল থেইকা কবে কখন বের হই, তাতো জানি না, আল্লাহ্ জানে। তাই জেলে ঢোকার আগে তোমাগারে শ্যাষবারের মতো দেখমু, আমার কলিজার টুকরা ছেলে মেয়েদের দেখমু, এই জন্য তোমাগারে সবাইরে সাথে কৈরে আইন লাম।" ফজল মিয়া এই কথাগুলো বলছিল আর তার চোখ দিয়ে ঝরছিল অশ্রুধারা। স্ত্রী কাঁদছে, কাঁদছে যে সন্তানদের সুখের জন্য অন্যায় কর্মে প্রলুব্ধ হয়েছিল, সেই নিঃষ্পাপ সন্তান।
ট্রেন ছুটে চলছে দুরন্ত গতিতে। এই ট্রেনে এই পথে কতবার চলাচল করেছে ফজল। কত মধুর স্মৃতি, কত নৈসর্গিক সৌন্দর্য, কত প্রেম ভালোবাসার কথা, কত আবেগ উচ্ছাসের কথা মনে হতো। আজ ফজলের প্রিয়জনেরা খুব কাছে। অথচ অন্যরকম বিষাধে পরিব্যাপ্ত সে। হুহু করে ট্রেন চলছে। আজ বেদনার বুকফাটা একটি সুর বারবার ঠাস!ঠাস করে তার কর্ণকূহুরে আঘাত করছে। ট্রেনের ঝক ঝক! ঝক ঝক শব্দের পরিবর্তে শোনা যাচ্ছে- "তোর জেল হবে, তোর জেল হবে"! ট্রেনের শব্দ মিলে যায় মনের শব্দে। "ঝক ঝক ঝকঝক! তোর জেল হবে, তোর জেল হবে।"
যথাযথ ফজল মিয়া তদন্ত বোর্ডে হাজির হলো। ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে তদন্ত অফিসারের প্রশ্নের উত্তর দিলো হতাশাগ্রস্থ; ভয়ার্ত ফজল মিয়া। বললো- -"স্যার আমার পাঁচ জন ছেলেমেয়ে। যে বেতন পাই তা দিয়ে সংসার চালানো মুস্কিল স্যার। ছেলে মেয়েদের লেখা পড়ার খরচ চালাইতে পারি না। অভাবে পইরা তিন শ মশারি আমি বিক্রি করছি স্যার। আমার ভুল হইছে। আমি অন্যায় করছি। আমারে ক্ষমা কইরা দেন। বাইরে আমার স্ত্রী সন্তানের দাঁড়াইয়া আছে। আমি অন্যা করছি। তাই শ্যাষ দেখার জন্য ওদের সাথে আনছি"।
ফজলের সত্য কথা বলায় অভিভূত ইংরেজ অফিসার। তেমনি একজন সরকারি কর্মচারির আর্থিক দৈন্যতায় কষ্ট পেয়েছে তদন্ত বোর্ড। ফজল মিয়া সত্য কথা বলাতে সন্তষ্ট এবং খুশি তারা । সরকারি কর্মচারীর কষ্ট লাঘবে দয়াপরবশ হয়ে, তার বেতন দশ টাকা বাড়িয়ে চল্লিশ টাকা করে দিলো। সেই সাথে তাকে পদনন্নোতি দিয়ে সিরাজগঞ্জ মহকুমা সদরে বদলি করার আদেশ হলো। ফজল মিয়া বাইরে এসে স্ত্রী সন্তানদের জড়িয়ে ধরে নির্বাক হয়ে শুধুই কাঁদতে লাগল।
(অনু গল্প)
শেখ হান্নান
নাট্যকার ও লেখক।