
শেখ হান্নান: লিখতে ছিলাম আমজাদ চাচার সুরেলা মধুর কন্ঠ নিয়ে। পূর্বেই বলেছি তিনি অলিপুর কেন্দ্রিয় জামে মসজিদের ইমাম ছিলেন। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে তাঁর যেটুকু জ্ঞান ছিল, সেই আলোকে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থাকে স্থিতাবস্থা রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করতেন।
১৯৭০ সালে পাকিস্তান মুসলিমলীগ নির্বাচনে হেরেগিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর না করে, নানা টালবাহানার পথে চলতে থাকে! তখন প্রতিদিনের খবরের জন্য আমরা এবং দেশে কী ঘটছে সেই সংবাদ জানার জন্য আমজাদ চাচা উন্মুখ হয়ে থাকতেন। অজপাড়াগাঁয়ে সংবাদ পত্র পাওয়া যেতো না। সংবাদ পত্র পড়ারও তেমন লোক ছিল না। খুব মনে পড়ে তাঁর বড় ছেলে ঠান্ডুর একটা এনইসি কোম্পানির এক ব্যান্ডের ট্রানজিস্ট্রার ছিল। সেই ট্রানজিস্ট্রারে খবর শুনতেন চাচা এবং সময় সুযোগে সেই খবর একটু বেশি করে আমাদের কাছে বলতেন।
তার মধ্যে ইসলামী দার্শনিকের যেমন ব্যক্তিত্ব ছিল, তেমনি পান্ডিত্বপূর্ণ অভিজ্ঞান ছিল অসীম। আবার দেখেছি তিনি হাসিখুশি থাকতেও পছন্দ করতেন। রেডিওতে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার না করায় তিনি মনে অনেক কষ্ট পেয়ে ছিলেন এবং সেই থেকে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন আর যাই হোক পাকিস্তানিরা আমাদের বন্ধু হতে পারেনা। তাদের শোসন নীতি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে গোলামে পরিনত করেছে। তাই তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা ছাড়া বাঙালির জাতির গত্যান্তর নেই। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় ট্রানজিস্ট্রারটি ছিল তার অন্তরঙ্গ সঙ্গী। মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ জয়ের খবরে তিনি সংগোপন পুলকিত হতেন। মুক্তি যুদ্ধের সময় মুক্তি যোদ্ধাদের খাবার দিয়ে, তাদের চলাচলের খবরও গোপন রাখতেন।
১৬ ডিসেম্বর যেদিন স্বাধীনতা অর্জিত হয় সেদিন আছরের নামাজের পরপর অসংখ্য হেলিকপ্টার, উড়োজাহাজ পূর্বদিক থেকে পশ্চিমে ভারতের দিকে চলে যায়। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। এই দৃশ্য দেখার জন্য আমরা সবাই নদীর ধারে গেছি। যেয়ে দেখি আমজাদ চাচা মনমরা হয়ে হেলিকপ্টারগুলো যাওয়া দেখছেন। আর আমাদের বললেন বেশি খুশি হইয়ো না। যে মানুষটির (বঙ্গবন্ধু ) জন্য স্বাধীনতা পাইলাম, সেই মানুষটির কথা চিন্তা কর। আমার চাচার এমন কথায় সত্যিই সেদিন চিন্তিত হয়েছিলাম।
অবশেষে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ফিরে এলে আমরা সবাই খুশি হয়েছিলাম। আমি গভীর ভাবে লক্ষ্য করেছি সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলেন আমাদের আমজাদ চাচা।
উল্লেখ করেছি মাধুর্যমন্ডিত সূধা কন্ঠের কথা। চাচার বেশি পছন্দের গান ছিল হামদ ও নাত। তার প্রিয় শিল্পী আব্দুল আলীমের কথা বলেছি। এছাড়াও আব্বাস উদ্দিন, সোহরাব হোসেন, বেদার উদ্দিন আহমেদ, লায়লা আঞ্জুমান বানু, ইসমত আরা, মাহবুবা বেগম, আঞ্জুমান আরা বেগম, এবং ফরিদা ইয়াসমিনের ইসলামী নজরুল গীতি শুনতেন। এরা ছিলেন চাচার প্রিয় শিল্পী।
শবে বরাদের রাতে আমাদের গ্রামে সমাজের প্রায় প্রতি বাড়িতেই মিলাদ শরীফ পড়ানো হতো। ওই সময় মাওলানা খন্দকার মাহমুদ আলী তার ছেলে মাওলানা খন্দকার আব্দুল লতিফও মিলাদ পড়াতেন। কিন্তু এটা খুবই সত্য যে আমজাদ চাচার মিলাদ পড়ানোর কৌশল বা ঢং ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। যেমন ছিল আরবি বাংলা শব্দের শুদ্ধ উচ্চারণ, তেমনি ছিল মধুমাখা যাদুকরা সুর। তার মহিত করা সুর আমাদের সকলের হ্নদয় ছুঁয়ে যেতো। তার মিলাদ উপস্থাপনা ছিল অত্যন্ত হ্নদয়গ্রাহী আকর্ষণীয়। যার জন্য আমরা ছুটে যেতাম আমজাদ চাচার মিলাদে। আমজাদ চাচার বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি কাজী নজরুলের ইসলামী গানগুলো গজলের মতো করে, চমৎকার হ্নদয়কারা সুরে গাইতেন। তাকে আরো দেখেছি, তিনি মাওলানা মাকসুদুর রহমানের লেখা অনেক গজল গাইতেন। জানিনা মাওলানা মাকসুদুর রহমানের গজলের খাতাটি তাঁর সন্তানেরা সংরক্ষণ করেছেন কি না?
আমাদের প্রিয় আমজাদ চাচার দুইপুত্র তিন কন্যা। তারা হলেন-মোঃ মুজান্মেল হক ঠান্ডু, রফিকুল ইসলাম বরিন, আমেনা বেগম, জহুরা বেগম এবং জোবেদা বেগম।
আমজাদ চাচা শুধু ইমাম ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ পিতা, সুপ্রতিবেশী সবার প্রিয় মানুষ। তিনি ছিলেন নম্র ভদ্র দেশপ্রেমিক ভালো মানুষ। আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
==
শেখ হান্নান।
নাট্যকার লেখক