প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২৭, ২০২৬, ৪:১২ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ৮, ২০২১, ১০:২৮ পি.এম
প্রথম স্ত্রীকে না জানিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে, প্রতিবাদ করায় হত্যা চেষ্টা, থানায় অভিযোগ

মিজানুর রহমানঃ লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ২ লাখ টাকা বর্ধিত যৌতুক না পেয়ে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই দ্বিতীয় বিয়ে করে ছামিদুল ইসলাম (২৫) নামে এক যুবক। এ ঘটনায় প্রথম স্ত্রী প্রতিবাদ করলে তাকে বেধড়ক মারধর, গুরুতর জখম ও হত্যা চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে ছামিদুলসহ তার পরিবারের বিরুদ্ধে। এছাড়াও ছামিদুল ইসলাম প্রথম বিয়ের পর একাধিক মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।
বুধবার (৭ এপ্রিল) দুপুরে সময় উপজেলার দক্ষিণ সিন্দুর্না এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহত প্রথম স্ত্রী জাফরিন সুলতানা (২৩) উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাধীন আছে। এ ঘটনায় জাফরিন সুলতানা বাদী হয়ে ছামিদুল ইসলাম ও তার নতুন স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসীসহ ৭ জনের নামে হাতীবান্ধা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।
আহত জাফরিন সুলতানা উপজেলার দক্ষিণ সিন্দুর্না এলাকার আহাম্মদ আলীর মেয়ে। আহাম্মদ আলী বুড়িমারীতে পাথর ভাঙ্গা শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালায়। ছামিদুল ইসলাম একই এলাকার নুরুজ্জামান (জামাল) এর ছেলে। থানায় করা অভিযোগ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ছয় বছর পুর্বে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে ধরা পড়ে প্রতিবেশী জাফরিন সুলতানাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয় ছামিদুল ইসলাম। বিয়ের সময় যৌতুক বাবদ ছামিদুল ইসলামকে নগদ এক লক্ষ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ ও তার লেখাপড়ার সব খরচের দায়িত্ব নেয় জাফরিন সুলতানার পরিবার। বিয়ের পর থেকে তারা স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বসবাস করে আসছিলো।
এদিকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর থেকে ছামিদুল ইসলাম একাধিক মেয়ের সাথে অবৈধভাবে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ফলে ২০১৭ সালে রংপুরে পায়রা চত্বর এলাকা থেকে তানজিনা আক্তার নামে একটি মেয়ে বিয়ের দাবিতে ছামিদুলের বাড়িতে উঠে। সে সময় স্থানীয় সিন্দুর্না ইউপি চেয়ারম্যান পরিষদে বসে বিষয়টি ফয়সালা করে মেয়েটি তার বাবা মায়ের কাছে পাঠায়। এরপর শুরু হয় জাফরিন সুলতানার উপর কথায় কথায় যৌতুকের জন্য নির্মম নির্যাতন।
বিসিএস এর কোচিং এ ভর্তি হবার জন্য জাফরিন সুলতানাকে তার বাবার বাড়ি থেকে দুই লক্ষ টাকা বর্ধিত যৌতুক আনতে চাপ দিতে থাকে ছামিদুল। গরীব ও অসহায় বাবা মায়ের কাছ থেকে সে টাকা আনতে পারবেনা বললে জাফরিনের উপর শুরু হয় মারধর ও নির্মম নির্যাতন। এতে জাফরিন সুলতানা গুরুতর আহত হলে ছামিদুল রংপুরে পালিয়ে যায়।
জাফরিনের বাবা মা তাকে গুরতর আহত অবস্থায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে স্থানীয় সিন্দুর্না ইউনিয়ন পরিষদে লিখিত বিচার দেয়। ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বিষয়টি বসে আপোস মিমাংসা করে দেয়ার জন্য কয়েকবার ছামিদুল ইসলাম ও তার পরিবারকে ডাকলেও কেউ চেয়ারম্যানকে পাত্তা দেয়নি। ফলে পরবর্তীতে জাফরিন সুলতানা বাদী হয়ে ছামিদুল ইসলাম ও তার পরিবাররের সদস্যদের নামে ২০২০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে মামলা করে। সে মামলায় ছামিদুলসহ তার পরিবারে ৫ সদস্য ১৪-১৫ দিন জেলে থাকে। মামলাটি এখনও আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
এরপর আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে প্রথম স্ত্রী জাফরিন সুলতানার বিনা অনুমতিতে চলতি মাসের ৪ তারিখে পার্শ্ববর্তী নিলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কাঠালী ইউনিয়নের উত্তর দেশীবাই গ্রামের আব্দুল জলিলের মেয়ে ও সহকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জান্নাতুল ফেরদৌসীকে (২৪) বিয়ে করেন ছামিদুল ইসলাম। এ ঘটনায় গতকাল বুধবার সকাল ৯ টার সময় জাফরিন সুলতানা তার স্বামী ছামিদুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে করার কারণ জানতে চায়।
এতে ছামিদুল ও তার নতুন স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা উত্তেজিত হয়ে জাফরিন সুলতানাকে বেধড়ক মারধর করে তাকে হত্যার চেষ্টা করে। এরপর গুরুতর জখম অবস্থায় জাফরিনকে বাঁশের খুটির সঙ্গে বেঁধে রেখে পুর্বের মামলা তুলে নেবার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। এসময় জাফরিন সুলতানার চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। জাফরিন সুলতানা বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন।
এ ঘটনায় রাতে জাফরিন সুলতানা বাদী হয়ে তার স্বামী ছামিদুল ইসলাম ও তার নতুন স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌসীসহ ৭ জনের নামে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। জাফরিন সুলতানা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘আমার সুখের জন্য বিয়ের পর থেকে বাবা মা অনেক কষ্ট করে ছামিদুলের লেখাপড়ার সব খরচ দিয়ে এসেছে। বুড়িমারীতে আমার বাবা কষ্ট করে পাথর ভেঙ্গে হলেও তাকে প্রতিমাসে ৬ হাজার করে টাকা দিয়েছে। আর সে রংপুরে থেকে একের পর এক মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক করে গেছে। এতকিছু নিরবে সহ্য করার পরও আমি স্বামীর মন পেলাম না। যৌতুকের জন্য প্রতিনিয়ত আমাকে মারধর করলেও আমি তাকে ছেড়ে কোথায় যাইনি। অথচ সে আমাকে না জানিয়ে কোথাকার একটা মেয়েকে বিয়ে করে এনেছে। এর প্রতিবাদ করায় আজ তারা সবাই মিলে আমাকে নির্মম নির্যাতন করেছে।’
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ছামিদুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে তার দেখা পাওয়া যায়নি। পরিবারের কাছে পাওয়া যায়নি ছামিদুলের ফোন নাম্বার। বিয়ের পরও একাধিক মেয়ের সাথে ছামিদুলের অবৈধ সম্পর্কে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে সিন্দুর্না ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, ‘রংপুরের ঐ মেয়েটিকে ইউনিয়ন পরিষদে ডেকে এনে অনেক বুঝিয়ে নিজ খরচে মাইক্রো যোগে তার বাবা মায়ের কাছে পাঠাই। এরপরও ছেলেটি ভালো হলো না।’ এ বিষয়ে হাতীবান্ধা থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) এরশাদুল আলম বলেন, ‘এ সংক্রান্ত একটি অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.