প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ২৩, ২০২৬, ৭:৩৩ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ৪, ২০২১, ৬:৩৫ পি.এম
সিরাজগঞ্জে মৃতদেহের ডিএনএর বিভ্রান্তিকর তথ্য আসায় মামলা নিয়ে জটিলতায় পুলিশ

হুমায়ুন কবির সুমন, সিরাজগঞ্জ থেকে : সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুনেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে মৃত দেহের ডি এন এ র নমুনা সংগ্রহ এবং তা সংরক্ষন নিয়ে গুরুতর অভিযাগ উঠেছে। দায়সারা এবং ভুল ভাবে মৃতদেহের ডি এন এ র নমুনা সংগ্রহ করায় অনেক ক্ষেত্রেই মৃতদেহের সঠিক পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি পুরুষের ডি এন এ পাঠানো হলেও রিপোর্টে আসছে মহিলা হিসেবে। ফরেনসিক ল্যাবরেটরী থেকে এমন তথ্য আসায় মামলা নিয়ে বিপাকে পরেছে পুলিশ। প্রশ্ন উঠেছে এই অবহেলার জন্য দায়ী ডাক্তার না ডোম ? কার ভুলে এমন হচ্ছে তা খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ।
গতবছর সিরাজগঞ্জ জেলার ৪টি থানা থেকে উদ্ধারকৃত অপঘাতে নিহত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের মৃত দেহের পরিচয় সনাক্তের জন্য হাসপাতাল মর্গ থেকে সংরক্ষিত ডি এন এর ফলাফল ভুল এসেছে। যে কারনে সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুনছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার ও ডোমের দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা সমালাচনা।
প্রথম অভিযোগটি ওঠে ২০২০ সালে যমুনা নদী থেকে উদ্ধার করা একটি লাশ কে নিয়ে। সিরাজগঞ্জ সদর থানা পুলিশ যমুনা নদীর সয়দাবাদ এলাকা থেকে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পাঞ্জাবী ও লুংঙ্গী পরা এক পুরুষ মানুষের অর্ধ গলিত মৃত দেহ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরন করে। মর্গ থেকে ডিএনএ সংরক্ষনের আবেদন করে পুলিশ। ডাক্তার ও ডোম মৃত দেহ থেকে ডিএনএর নমুনা সংরক্ষন করে ফরনসিক ডি এন এ ল্যাবরেটরী অব বাংলাদেশ পুলিশ সি আই ডি তে
প্রেরন করেন। দীর্ঘ ৫ মাস পর ডিএনএ ফলাফলে উল্লেখ করা হয় যে মৃতদেহটি একটি নারীর। অথচ মামলা সংশ্লিষ্ট সকল কাগজপত্র এবং প্রেরিত আলামতে অজ্ঞাত পুরুষ মানুষের মৃতদেহ হতে সংগহীত বলে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলে একাধিকবার ডি এন এ পরীক্ষায় উক্ত আলামত হতে নারীর ডি এন এ প্রোফাইলই পাওয়া যায়। একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে উল্লাপাড়া থানাতেও। ফুলজোর নদী হতে এক মৃত বয়স্ক পুরুষের মৃতদেহ
উদ্ধার করে ডি এন এ নমুনা সংরক্ষন করার পর হাসপাতাল থেকে পাঠানো কাগজপত্র ও সুরতহাল প্রতিবেদনে মৃত দেহটিকে পুরুষ বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ফরেনসিক ল্যাবরেটরীতে একাধিকবার পরীক্ষা করে সেটি এক নবজাতক কন্যা সন্তানের ডি এন এ বলে প্রাফাইলে পাওয়া যায়। একই ভাবে বেলকুচি ও রায়গঞ্জ থানাতও এমন ভুল তথ্য এসেছে। যে কারণে এই সব মৃত দেহের পরিচয় সনাক্ত আর মামলা পরিচালনা করতে অনেকটাই বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে।
বেলকুচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ও সি) গোলাম মোস্তফা জানান গত বছরের ১ জুলাই বেলকুচি থানার একটি অজ্ঞাতনামা কিশোরীর লাশের বাবা-মা দাবি করে থানায় এজাহার করেন লালচান শেখ ও তার স্ত্রী পারভিন খাতুন। বিষয়টি নিশ্চিত করতে পুলিশ এই দুজনের ডি এন এ এর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা পাঠায়। প্রথম দফায় ডি এন এ নমুনার পরীক্ষার ফলাফলে নমুনাটি একজন প্রাপ্ত বয়স্কের বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে আদালতের অনুমতি
নিয়ে পুলিশ নিহত কিশোরীর মাথার খুলি পাজরের হাড় দাঁত ও চুল কবর থেকে সংগ্রহ করে পুনরায় পাঠায়। একই সাথে পুনরায় লালচান শেখ ও তার স্ত্রী পারভিন খাতুন এর ডি এন এ র নমুনা সংগ্রহ করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এই দম্পতির নমুনা সঠিকভাবে সংগ্রহ না করার কারণে ফরেনসিক বিভাগ তা গ্রহণ করেননি। একই সাথে ফরেনসিক কর্তৃপক্ষ পুনরায় মৃত ব্যক্তির ২ আত্মীয়ের নমুনা নতুন করে সংগ্রহ কিংবা তাদের সরাসরি ঢাকা পাঠানোর পরামর্শ দেন। যে কারণে মামলার তদন্ত বিঘ্নিত হচ্ছে বলে তিনি জানান ।
উল্লাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দীপক কুমার দাস জানান গত বছরের ১১ জুলাই উল্লাপাড়া থানার সরা বিল এলাকা থেকে বছরের একটি অর্ধ গলিত পুরুষের লাশ উদ্ধার করে তার ডি এন এ হাসপাতালে সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে গত ২১ শে জুলাই সলঙ্গা থানার চরগোজা গ্রামের গৃহবধূ সেলিনা খাতুন লাশটি তার স্বামীর বলে দাবি করেন। বিষয়টি নিশ্চিত হতে পুলিশ তার সাত বছরের জমজ দুই ছেলে রিফাত ও সিফাত এর নমুনা সংগ্রহ করে ডি
এন এ ল্যাবরেটরী অফ বাংলাদেশ পুলিশ দপ্তরে পাঠানো হয়। ফরেনসিক বিভাগ নমুনাটি পরীক্ষা করে গত বছরের ৫ অক্টোবর মৃতব্যক্তির ডি এন এ র নমুনাটি একজন মহিলার বলে শনাক্ত করে। বিষয়টি নিয়ে তিনি সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালেযোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয় মৃতব্যক্তির সংগৃহীত নমুনা নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে পুলিশকে পুনরায় বাধ্য হয়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিটির লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়।
সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের কর্তব্যরত সুইপার রানা হরিজন জানালেন আমিতো সুইপার, ডোম না। হাসপাতালে ডোম না থাকায় সুইপার হয়েও আমাকে ডোমের কাজ করতে হয়। ডাক্তাররা কখনই মৃত দেহ স্পর্শ করেন না। আমাকেই সব করতে হয়। যে কারণে ভুল হলে হতেও পারে।
ডাক্তাররা কেন এই আলামত সংরক্ষনে দ্বায়িত্ব পালন করছেন না এমন প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার আর এম ও ডাক্তার ফরিদুল ইসলাম কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার সাইফুল ইসলাম জানান এই ধরনের ভুল হওয়ার কথা না তবে কেন এমন হল তা হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ( আর এম ও) এর সাথে কথা বলে তা খতিয়ে দেখা হবে। যদি এমন ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম জানান মামলা নিষ্পত্তির জন্য মৃতদেহের পরিচয় জানা অত্যন্ত জরুরী। যে কারণে পুলিশ ডিএনএ রিপোর্টের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু পরপর চারটি রিপোর্টে বিভ্রান্তিকর তথ্য আসায় পুলিশকে মামলা নিয়ে বিপাকে পড়তে হয়েছে। তদন্ত কাজ এবং মামলা নিষ্পত্তিতে ও বিঘ্ন ঘটেছে। তিনি এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগকে কঠোর নজরদারির মধ্যে দায়িত্ব পালন করার আহ্বান জানান।
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.