
আল-হেলাল,সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ভাতগাঁও ইউনিয়নের হায়দরপুর গ্রামের মৃত আমজদ আলী ও মৃত সৎফুল নেছা দম্পতির ৫ ছেলে ও ১ মেয়ের মধ্য দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা জমসেদ আলী। তিনি ৫ ই অক্টোবর ১৯৪৫ সালে হায়দরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোট বেলায় বাবাকে হারানো জমসেদ আলী ছিলেন অত্যন্ত সদালাপী ও দুঃসাহসিক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এক মহান বীর পুরুষ। যখন ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার অগ্নিঝরা ভাষণ দিলেন,সেই ভাষণে তিনি উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের জন্য ১৯৭১ সালের জুন মাসের শেষের দিকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে যান সিলেটে এবং সিলেট শহর থেকে পায়ে হেঁটে বেরিয়ে পড়েন ভারতের সীমান্ত অভিমুখে।
নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে জকিগঞ্জ থেকে কুশিয়ারা/ডাউকি নদী পার হয়ে তিনি ঢুকেন করিমগঞ্জে,সেখানে তাঁর আশ্রয় জোটে শরণার্থী শিবিরে। তিনি সেখানে প্রায় দেড় মাস প্রশিক্ষণ শেষে সিলেটের পশ্চিম সীমান্ত তামাবিল-আজমিরীগঞ্জ রেললাইনের উত্তরাংশ এবং লাখাই-শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইনের দক্ষিণাংশ নিয়ে গঠিত ৪ নং সেক্টরে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ৪ নং সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন প্রথমে মেজর সি আর (চিত্ত রঞ্জন) দত্ত এবং পরে ক্যাপ্টেন আবদুর রব। বেসামরিক উপদেষ্টা ছিলেন প্রয়াত সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী এমপি। প্রথমে এর সদর দপ্তর ছিল করিমগঞ্জে এরপর আসামের নাসিমপুর। ছয়টি সাব-সেক্টর নিয়ে গঠিত এই সেক্টরে প্রায় ৪ হাজার জন নিয়মিত বাহিনী এবং ৯ হাজার জন গেরিলা যুদ্ধা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। তিনি স্বাধীনতার পর মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল মোঃ আতাউল গনি ওসমানী ও ৪ নং
সেক্টর কমান্ডার মেজর চিত্ত রঞ্জন দত্তের স্বাক্ষরিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দেশরক্ষা বিভাগ কর্তৃক স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র পান। সনদপত্রের ক্রমিক নং ১২২৮৯৭, দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে এ সনদ নিয়ে তিনি কোথায় ও দৌড়ঝাঁপ করেননি। তিনি তাঁর গর্ভধারিণী মায়ের কাছে রেখেছিলেন শরীরে তাজা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মূল্যবান সনদটি। তাঁর চোখের সামনে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি নিয়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করেছেন,এতে তাঁর কোনো মোহ ছিলো না। শেষ বয়সে এসে উপলব্ধি করেন এই স্বীকৃতিটা রাষ্ট্রীয়ভাবে পাওয়া দরকার।
কিন্তু তিনি অনেক চেষ্টার পরও স্বীকৃতি পেতে ব্যর্থ হয়েছেন। তিনি ছিলেন খুব আত্মপ্রচার বিমূখ মানুষ। পাঁচ ভাই, এক বোন ও মায়ের সংসারে তিনি কৃষি কাজ করে বৃহৎ পরিবারের খরচের ভরণপোষণ করতেন। ছোট বেলায় পিতা হারানো দরিদ্র পরিবারে জন্ম হওয়ায় তিনি ছোট বেলা থেকে কৃষি কাজের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন,ফলে তাঁর লেখাপড়া তেমন একটা করা হয়ে উঠেনি। স্বাধীনতার পরের বছরেও তিনি পরিবারের আর্থিক অভাবের তাড়নায় সিলেট জেলার জৈন্তাপুর উপজেলার পাড়ারখেউ গ্রামে মৃত নুর মিয়ার বাড়িতে মাসিক বেতনে কাজ করতেন। তিনি অবিবাহিত জীবনের ইতি টেনে ১৯৭৩ সালের ৩০শে ডিসেম্বর জৈন্তাপুরের মৃত নুর মিয়ার বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
পরে তাঁর লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়া তাঁকে তাদের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পার হয়ে গেলো, পার হয়ে গেলো বীর মুক্তিযোদ্ধা জমসেদ আল্#ী৩৯;র মৃত্যুর ৪৭ টি বছর। কিন্তু আজ পর্যন্তও তিনি রাষ্ট্রের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনও স্বীকৃতি পাননি। প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশকে স্বাধীন করার জন্য, কোনও স্বীকৃতির জন্য নয়। তিনিও এর ব্যতিক্রম নন। তিনিও বঙ্গবন্ধুর আহ্ধসঢ়;বানে সাড়া দিয়ে জীবন-
সংসারের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন। কিন্তু একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি রাষ্ট্রীয়
স্বীকৃতি পাবেন না, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের ব্যবস্থাটুকু হবে না, এমনটি মেনে নেয়া যে কতো কষ্টের,তা একমাত্র ভুক্তভোগীরা ছাড়া আর কেউ বুঝা বড় দুষ্কর। পরিবারের সদস্যরা নানা প্রশ্নের সম্মূখীন হতে হচ্ছে- মৃত জমসেদ আলী আদৌ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না ! কারণ তাঁর সতীর্থ মুক্তিযোদ্ধারা বা তাদের পরিবারবর্গ সরকারি সব সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন, তাহলে জমসেদ আল্#ী৩৯;র পরিবার কেন পাচ্ছেন না ?
শতকষ্টে দিনাতিপাত কাটানো মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা জমসেদ আল্#ী৩৯;র মা সৎফুল নেছা উপরোক্ত কথাগুলো শুনে প্রায়শই অঝোর ধারায় কাঁদতেন এবং অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত ছেলের মুক্তিযুদ্ধার সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র খুব যতœ করে রাখতেন। ছেলে হারানো শোকাভিভূত বৃদ্ধ মা পুত্রের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতির জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ধর্না দিয়েও কোনো সুফল পাননি। ছেলের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাবার জন্য বৃদ্ধ মায়ের কান্না দেখে,ভাতগাঁও ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ গিয়াস মিয়া মৃত মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা সরকারি কোষাগার থেকে পাইয়ে দেয়ার কথা বলে বৃদ্ধ মায়ের কাছে রক্ষিত ছেলের স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদ ও অন্যান্য কাগজ পত্র চেয়ে নেন।
চেয়ারম্যানকে সনদ ও অন্যান্য কাগজ পত্র দেয়ার পর মাসের পর মাস বছরের পর বছর পেরিয়ে যায় কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। অবশেষে বৃদ্ধ মা ছেলের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি না পাওয়ার ভীষণ আক্ষেপ নিয়ে, জরাজীর্ণ বিভিন্ন বার্ধক্য জনিত রোগে ভোগে ২০১৮ সালের ৭ ই ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত মুক্তিযোদ্ধার ছোট ভাই মোঃ মঞ্জুর আলী অভিযোগ করে বলেন,সাবেক চেয়ারম্যান মোঃ গিয়াস মিয়া মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি ও অন্যান্য সরকারি সুযোগ সুবিধা পাইয়ে দেয়ার কথা বলে আমার মায়ের কাছ থেকে প্রায় ১০ বছর পূর্বে আমার ভাইয়ের মুক্তিযোদ্ধার সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র নিয়েছিলেন।
অথচ স্বীকৃতি তো দূরের কথা এখনও পর্যন্ত আমি ভাইয়ের সনদ ও অন্যান্য কাগজপত্র পাইনি। তার ভাইয়ের মুক্তিযোদ্ধার সনদ ও কাগজপত্র ফেরত দেয়ার কথা বললে মোঃ গিয়াস উদ্দিন বলেন,মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমি জমসেদ মিয়ার কাগজপত্র মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আনোয়ার রহমান তোতা মিয়ার কাছে দিয়েছি। সনদ ও কাগজপত্র ফেরত দেয়ার কথা বললে আনোয়ার রহমান তোতা মিয়া বলেন,মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আমি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি।
এ ব্যাপারে ছাতক উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আনোয়ার রহমান তোতা মিয়া তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্কীকার করে বলেন,তার নাম ভারতীয় তালিকায় না থাকার কারনে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভূক্ত করা যাচ্ছেনা,তবে তিনি একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মৃত মুক্তিযোদ্ধার ছোট ভাই মোঃ মঞ্জুর আলী আরোও বলেন,এখন সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো আমার ভাই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্থানী সৈন্যদের ছোড়া বুলেট পায়ে বিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছিলেন। সেই বুলেটের আঘাত আমার ভাইকে জীবদ্দশায় প্রতিনিয়ত অনেক পীড়া দিত।
কোনো কিছু পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব করে নয়, দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন সম্মুখ সমরে। ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীনতার লাল সূর্য, একটি পতাকা, একটি মানচিত্র। আমার ভাই একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কিন্তু স্বাধীনতার ৪৯ বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিবার্তায় আজও তাঁর নাম উঠেনি। অথচ তাঁর সঙ্গী- সহযোদ্ধা সকলের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আপনার এবং আপনার সরকারের উদ্যোগ ভূয়সী প্রশংসনীয়। কিন্তু আলোর নিচে অন্ধকারের মতো বেঁচে থেকে আমার ভাই চলে গেছেন পরাপারে। জীবিত থাকতে শুনে যাননি, তিনি একজন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়ার আগেই আমার ভাইয়ের নাম মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় গেজেটভুক্ত করার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় মর্যাদাসহ তাঁর কবরকে সংরক্ষণের জোর দাবি জানাই।