
মোঃনাজমুল ইসলাম সবুজ শরণখোলা প্রতিনিধিঃ বাগেরহাটের শরণখোলায় ভাইদের সাথে জমিজমা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জের দীর্ঘদিনের। কিন্তু উপজেলার নলবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা মৃত আব্দুল আজিজ সর্দারের বড় ছেলে মুক্তিযোদ্ধা মোঃ গোলাম সরোয়ার বাবুলের মৃত্যুর পরে তার সম্পত্তি দখল সহ স্ত্রী সন্তানদের এলাকা ছাড়া করতে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছেন মৃত মুক্তিযোদ্ধার ভাই-বোন ও প্রতিবেশীরা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার ১নং ধানসাগর ইউনিয়নের নলবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশ বর্ডার-গার্ড (বিজিবির) ৩২ ব্যাটালিয়ানের (অবসরপ্রাপ্ত) ল্যান্সনায়েক মোঃ গোলাম সরোয়ার বাবুল সর্দার ২০০৭ সালে চাকুরী হতে অবসরে আসেন। ২০১৪ সালে পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ ভাটোয়ারা নিয়ে ভাইদের সাথে বিরোধের সৃষ্টি হয়। ৩নং নলবুনিয়া মৌজার ৩৬৪ নং খতিয়ান থেকে তার ভোগ দখলীয় সম্পত্তির মধ্য হইতে ৮শতক জমি এলাকার সাধারন মানুষের স্বাস্থ্য সেবার জন্য দান করায় ২০১৪ সালে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়।
পরবর্তীতে নলবুনিয়া আব্দুল আজিজ সর্দার বাড়ীর ওই কমিউনিটি ক্লিনিকে ২০১৫ সালে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার পদে মৃত মুক্তিযোদ্ধার বড় মেয়ে সাদিয়া সুলতানা সাথীর চাকুরী হলে পুনরায় ভাইদের সাথে সম্পর্কের অবনতির সৃষ্টি হয় ওই মুক্তিযোদ্ধার। এর পর থেকেই মুক্তিযোদ্ধা বাবুলের কন্যা সাদিয়াকে ক্লিনিক থেকে তাড়াতে নানা প্রকার ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে করতে শুরু করেন বাবুলের আপন ছোট ভাই মোঃ ছগির সর্দার, মোঃ কবির সর্দার, মোঃ কামরুল ইসলাম বাদল সর্দার, মোঃ সবুর সর্দার, বোন মোসাঃ শিল্পী বেগম ও চাচাতো ভাই আব্দুস ছাত্তার সর্দার সহ স্থানীয় একটি কুচক্রী মহল এবং চক্রের মুলহোতা আব্দুস ছাত্তার সর্দারের ইন্ধনে গত ৫বছরে সাদিয়ার বিরুদ্ধে বহু কাল্পনিক অভিযোগ স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন মহলে দায়ের করে হয়রানি করার পাশাপাশি ক্লিনিকে হামলাও চালিয়েছেন ছগির সর্দার।
এমনকি জোর পুর্বক ক্লিনিকে দান করা সম্পত্তির অভ্যন্তরে থাকা একটি মুল্যবান কড়াই গাছ কর্তন করে তা আত্মসাৎ করেন ছগির সর্দার। স্ত্রী সহ ৪ জন সন্তান রেখে মুক্তিযোদ্ধা বাবুল ২০১৮ সালের ১লা নভেম্বর মারা যাবার কিছুদিন পর থেকেই বাবুলের প্রতিবেশি আব্দুস ছাত্তার সর্দারের ইন্ধনে তার ছেলে-মেয়েদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেন বাবুলের ভাইয়েরা। এক পর্যায়ে নির্যাতন সহ সম্পত্তি বিরোধ নিস্পত্তির জন্য চলতি বছরের ফেব্রূয়ারী মাসে শরনখোলা থানা পুলিশের কাছে মুক্তিযোদ্ধা বাবুলের স্ত্রী মমতাজ বেগম একটি অভিযোগ করেও কোন সুফল পাননি বরং উল্টো প্রতিপক্ষরা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে চলতি বছরের মার্চ মাসে ক্লিনিক সংলগ্ন এলাকায় ওই পরিবারের ভোগ দখলীয় সম্পত্তির মাটি খননে বাঁধা দেয় এবং মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী মমতাজ বেগমসহ শ্রমিকদেরকে মারধর করে তাড়িয়ে দেয় ছগির ও সবুর সর্দার।
বর্তমানে পরিবারটিকে নুতন করে ফাঁসাতে চক্রের মুল নায়ক আব্দুস ছাত্তার সর্দারের কু-পরামর্শে ছগির সর্দার ও সবুর সর্দার এবং শিল্পী বেগম বাদী হয়ে স্থানীয় কয়েক জন বাসিন্দার স্বাক্ষর সহ সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানের একটি প্রত্যয়নে দোষী সাজিয়ে জেলা সিভিল সার্জনের কাছে সাদিয়ার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন।
মৃত মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সরোয়ার বাবুল সর্দারের বড় মেয়ে সাদিয়া সুলতানা সাথী জানান, আমার পিতা মৃত্যুর পর থেকেই রাতে ঠিকমত ঘুমাতে পারিনা, কেবা কারা দরজায় লাথি মারে, জানালা সহ মুল গেট টানা-টানি করে, ঘরের চালায় ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে, সবসময়ই আতংকে থাকি। বাবা মারা যাওয়ার পর এখন এভাবেই প্রতিটি দিন কাটছে আমাদের। জমিজমা লুটে খাওয়ার জন্য আপন চাচারাই এখন আমাদের শত্রূ হয়ে দাড়িয়েছে। রাত পোহালে আমরা কোথায় যাই, কি করি,আমাদের পিছনে সর্বদা ছায়ার মতো লেগে থাকেন তারা। কারনে অকারনে গায়ে পড়ে সংঘাত সৃষ্টি করেন। এখন আমাকে আমার কর্মস্থল থেকে সরানোর জন্য বিভিন্ন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছে এবং বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যাবার জন্য বিভিন্ন হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।
তবে, সিভিল সার্জনের কাছে দায়েরকৃত ওই অভিযোগে স্বাক্ষর করা কয়েকজন বাসিন্দা নাম গোপন রাখার শর্তে বলেন, ছত্তার সর্দার ও ছগির সর্দার আমাদের সরকারি প্রনোদনা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে তারা কি করেছে তা আমরা জানিনা। এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস ছালাম হাওলাদার, সংরক্ষিত আসনের মহিলা ইউপি সদস্য মিসেস দুলিয়া লোকমান, সুলতান সর্দার, নবী হোসেন সর্দার, আব্দুল লতিফ হাওলাদার ও আঃ জব্বার ফরাজী সহ অনেকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা বাবুল সর্দারের সাথে দীর্ঘদিন ধরে তার ভাইদের জমিজমা নিয়ে বিরোধ ছিল কিন্তু তিনি মারা যাওয়ার পর তার জানাজায় দাড়িয়ে আব্দুস ছাত্তার সর্দার সহ অন্যরা মরদেহের খাটিয়া ধরে গ্রামবাসীদের সামনে ঘোষনা দিয়ে ছিলেন মৃত বাবুলের পরিবারের উপর তারা আর অত্যাচার করবে না। কিন্তু কয়েকদিন পরেই পরিবারের উপর আবার নির্যাতন শুরু করেন।
তবে, ওই পরিবারটিকে নানা ভাবে হয়রানি করার নেপথ্যে আছেন বাবুলের প্রতিবেশি ও চাচাতো ভাই ছাত্তার সর্দার। সাধারন মানুষকে হয়রানি করাই তার এখন পেশা হয়ে উঠেছে। এ ব্যাপারে ধানসাগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোঃ মাঈনুল ইসলাম টিপু বলেন, সম্পত্তি নিয়ে উভয়ের মধ্যে সমস্যা আছে। আমি কয়েকবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি।
শরণখোলা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার এম.এ খালেক খাঁন বলেন, সহযোদ্ধা বাবুল মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি বিরোধের বিষয়টি একবার নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বর্তমান বিষয়ে আমার জানা নাই। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ ফরিদা ইয়াসমিন জানান, অভিযোগের বিষয়টি আমিও খোঁজ খবর নিয়েছি। ওই ক্লিনিকে কোন ধরনের অনিয়ম পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বাদী সাদিয়ার চাচা ছগির ও সবুর সর্দারদের সাথে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থাকায় বার বার তারা সাদিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিচ্ছেন।
তবে, আব্দুস ছাত্তার সর্দার বলেন, ওই পরিবারের সাথে আমার কোন দন্ধ নেই। আমার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করে থাকলে তা সম্পুর্ন ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, ছগির সর্দারসহ অন্যরা বলেন, আমরা তাদের কোন হয়রানি করছি না। জমি নিয়ে সমস্যার ইতিমধ্যে সমাধান হয়েছে ।তবে স্থানীয়রা ক্লিনিকে সেবা বঞ্চিত হওয়ায় আমরা একটি অভিযোগ দিয়েছি । যাতে তাকে এখান থেকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়।