হোম » প্রধান সংবাদ » করোনাকালীন সাহিত্য চর্চ্চা

করোনাকালীন সাহিত্য চর্চ্চা

জুলফিকার বকুলঃ  হৃদয় ও মনের অনুভূতির ভাষাগত রুপই হলো সাহিত্য। যেখানে আবেগ ও চেতনাকে সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক শব্দ বিন্যাসের মাধ্যমে ব্যক্ত করা হয়। মানব সমাজের সাথে সাহিত্যের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মানুষের মধ্যে নৈতিক চেতনা জাগ্রত করণ এবং তা লালন ও উৎকর্ষ সাধন সাহিত্যেরই কীর্তি। মানব চিত্তের সচেতন,অবচেতন ও অচেতন অবস্থার মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে দুর্বলতা সমূহকে সুস্পষ্ট করাও সাহিত্যের কাজ।
কিন্তু দিন দিন মানুষ সাহিত্য চর্চ্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।ফলে জুলুম,পীড়ন, শোষণ, দুর্নীতি, লুটপাট ইত্যাদি সমাজে বেড়েই চলছে।এই সামাজিক ব্যধি থেকে পরিত্রাণ পেতে সাহিত্য চর্চ্চার বিকল্প নেই।

কেউ কেউ মনে করে সাহিত্য শুধু মনের আনন্দের জন্য।কিন্তু এটি শুধু আনন্দই দেয় না, মনস্তাত্ত্বিক তথা আত্মিক উন্নতি ঘটায়। মানব মনের পরিপূর্ণতায় সাহিত্য জোড়ালো প্রেরণা ও চরিত্র গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ” অন্তরের জিনিস কে বাহিরের, ভাবের জিনিস কে ভাষার, নিজের জিনিস কে বিশ্বমানবের ও ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ।” তাই সাহিত্য কে বলা যায় জীবনের প্রতিবিম্ব।

আধুনিক সভ্যতায় তথ্য, প্রযুক্তির যুগে সাহিত্য চর্চ্চার দারুন সুযোগ রয়েছে।শুধু প্রয়োজন অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যবোধ ও সৌন্দর্য চেতনাকে উজ্জীবিত, উচ্ছ্বসিত ও উদ্ভাসিত করে তোলা। যদি শিক্ষার্থীদের কথা বলতে যাই,তাহলে দেখা যায় যে, বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর হাতেই এখন অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল দেখা যায়। স্কুল – কলেজে ব্যবহারের সুযোগ না পেলেও প্রতিষ্ঠানের বাইরে এর বহুমূখী ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ফেইসবুক, ইউটিউব থেকে শুরু করে ইন্টারনেট ব্রাউজিং তাদের কাছে একেবারেই সহজ এবং নৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেকের কাছে আবার তা নেশার মত।

কিন্তু প্রশ্ন হলো তারা আসলে কি দেখে বা শুনে?

আমি অভিভাবককে এমনও অভিযোগ করতে শুনেছি যে, তাঁর সন্তান রাত ১০ টা থেকে ভোর ৪ টা পর্যন্ত মোবাইল চালায়।কিছু বললে উগ্রতা প্রকাশ করে।

ঐ শিক্ষার্থীকে ৭ দিন অবজারভেশনে রেখে যা জানলাম তা হলো, প্রতিরাতেই তাকে কিছু ভিডিও দেখতে হয়,কয়েকজন বন্ধু এবং বান্ধবীর সাথে নিয়মিত চ্যাটিং করতে হয়।এটি তার এখন নেশা। একরাতও মোবাইল ছাড়া তার ঘুমানো সম্ভব না। কিন্তু শিক্ষার্থীও এমন আসক্তি থেকে বাঁচতে চায়। ভাবলাম, এ অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। আমি তাকে বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় এর ‘ পথের পাঁচালী ‘ পড়তে দিলাম।এরপর মোবাইলে আরো কিছু বই – এর অ্যাপস্ ডাউনলোড করতে বলেছিলাম। নির্দেশ মত পড়েছে।আস্তে আস্তে তার মধ্যে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম।
আসলে বই মানুষের জীবনকে বদলে দিতে পারে।দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে যেমন বিনয়ী, মেধাবী মুখ আছে তেমনি কিছু কিছু তরুণদের মধ্যে এর ব্যতিক্রমও লক্ষ্য করা যায়। সাম্প্রতিক ফেইসবুকে দেখলাম, রাস্তা আটকিয়ে একদল তরুন ভিডিও তৈরী করছিল। সাইড দিতে বলায় হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। অবশেষে পুলিশ একটি ছেলেকে আটক করে।
রাস্তাঘাটে প্রায়ই দেখা যায় কিছু কিছু তরুণ হাইস্পিডে বাইক চালায়,ইভটিজিং করে,মাদক,মারামারি ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকে।এরা পরিবারের সদস্যদের সাথেও হয়তো এমন আচরণ করে। কিন্তু শিক্ষার সংজ্ঞায় বলা হচ্ছে ‘ আচরণের কাংখিত পরিবর্তনই হলো শিক্ষা।’ এদেরকে উপদেশ দিতে গেলে কখনও নিজের সম্মান ধরে রাখাটাও কঠিন হয়ে যায়।তাই অনেকে বিব্রত অবস্থায় পাশ কাটিয়ে চলে যায়। একবার এক শিক্ষার্থীকে তার চুল কাঁটার স্টাইল দেখে শিক্ষক সুন্দর করে দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেছিলেন আগামীকাল চুল কেটে আসতে। তারপর ঐ শিক্ষার্থীকে আর স্কুলে কখনও দেখা যায়নি।হয়তো অন্য কোন স্কুলে ভর্তি হয়েছে নয়তো পড়ালেখাই বাদ দিয়েছে।
সাহিত্য চর্চ্চা এসব অপকর্ম থেকে দূরে থাকার মহোঔষধ।করোনার এই মহামারীতে বিশ্বজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীর হাতে আছে পর্যাপ্ত সময়।এ সময় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের বই পড়লে সময়ও কাটবে, আনন্দও পাবে।আর নিজের মধ্যে সততা,নিষ্ঠা, প্রজ্ঞা ও প্রগতিশীল চিন্তা লালন করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে আত্মত্যাগে মানব সেবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাই একজন শিক্ষার্থীর ব্রত হওয়া উচিত। তাই তাদের প্রচুর বই পড়তে হবে।একদিকে যেমন পাঠোভ্যাস গড়ে উঠবে তেমনি পরিশুদ্ধ মানসিকতায় নিজেকে মেধাবী করে গড়ে তুলবে।শিক্ষার্থীকে সাহিত্য পাঠে উদ্বুদ্ধ করা শিক্ষক, অভিভাবক উভয়েরই গুরু দায়িত্ব। মাধ্যমিক শিক্ষার শুরু থেকেই সাধারণত সাহিত্য চর্চ্চা শুরু হয়।তাই শিক্ষার্থীকে তার মনোজগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া একান্ত প্রয়োজন।এর জন্য শিক্ষককে বন্ধুসুলভ আচরণের মধ্য দিয়ে সাহিত্য চর্চ্চার গুরুত্ব শিক্ষার্থীদের মাঝে তুলে ধরতে হবে।বিশেষ করে যারা বাংলা পড়ান তাদের আরো বেশি আন্তরিকতার সহিত বিষয়টিকে দেখতে হবে। ডায়রিয়া হলে যেমন স্যালাইনের পাশাপাশি স্বাভাবিক খাবার খেলে পাতলা পায়খানা এমনিতেই বন্ধ হয়ে যায় তেমনি সাহিত্য চর্চ্চায় শিক্ষার্থী যখন বিভিন্ন গল্প,উপন্যাস,প্রবন্ধ, কবিতা ইত্যাদি পড়ে এবং অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেও লেখার চেষ্টা করবে তখন তার ভিতরের সমস্ত সময় অপচয়কারী,সমাজ কুলষিত কর্ম ও চিন্তাগুলো স্তব্ধ হয়ে এক সময় বিলীন হয়ে যাবে।অন্তরাত্মাকে আলোকিত স্বপ্নের পরমরাজ্যে উদ্ভাসিত করে সত্য,সুন্দর ও পবিত্রতাকে উজ্জীবিত করবে।তাই মান সম্মত শিক্ষা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীকে নিজে থেকেই সাহিত্য চর্চ্চায় মনোনিবেশ করে সুশ্রী, ভদ্র ও মেধাবী হয়ে গড়ে উঠতে হবে।’কালের কণ্ঠ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ড. মো. নাছিম আখতার লিখেছেন, ” দেশে মানসম্মত শিক্ষা বিস্তারের শক্তিশালী ও দুর্বল দিকগুলো উন্মোচন আমাদের সুস্থ দেহ, প্রশান্ত মন ও কর্মোদ্দীপনাময় আত্মপ্রত্যয়ী নব প্রজন্ম তৈরির পথ দেখাবে বলে আমার বিশ্বাস। ”
শিক্ষার্থীকে তার দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে তা আস্তে আস্তে পরিত্যাগ করে পজিটিভ ও শক্তিশালী দিকগুলোকে দৃঢ় প্রত্যয়ে সংকল্পবদ্ধ সৃজনশীল মননে সাহিত্য চর্চ্চার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।তবেই এ দেশ বিশ্ব মানচিত্রে সম্মানী জাতি ও মর্যাদার প্রতীক হয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখকঃ জুলফিকার বকুল
শিক্ষক, ঢাকা ইন্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল, ডুয়েট ক্যাম্পাস,গাজীপুর।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!