
নিজস্ব প্রতিবেদক
দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পদত্যাগ করেছেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেল ৫টা ১ মিনিটে দিকে ‘অসুস্থ কারণ’ দেখিয়ে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
রাষ্ট্রপতির অফিসিয়াল প্যাডে লেখা ‘রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ’ শীর্ষক এই চিঠিতে তার স্বাক্ষর ও বক্তব্য ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পদত্যাগপত্রে যা লিখলেন রাষ্ট্রপতি
পদত্যাগপত্রে স্পিকার বরাবর রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, তিনি ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সংবিধানের প্রতি আনুগত্য রেখে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বিশেষভাবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশে সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছিল। সেই সংকট নিরসনে তিনি সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের আওতায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত নেন এবং সেই অনুযায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেন।
পরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচনের ভিত্তিতে বর্তমান সরকার গঠনের বিষয়টিও তিনি চিঠিতে উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতির ভাষায়, তার ভূমিকার কারণে দেশে কোনো সাংবিধানিক বিপর্যয় ঘটেনি।
স্বাস্থ্যগত কারণই মূল
পদত্যাগের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে তার শারীরিক অসুস্থতা। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে—হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিকস, কিডনি জটিলতাসহ নানা রোগে ভুগছেন। ইতোমধ্যে তার হৃদ্যন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। সাম্প্রতিক পরীক্ষায় ‘অটোনোমিক নিউরোপ্যাথি’ ধরা পড়েছে, যার ফলে তিনি মাঝে মাঝে অচেতন হয়ে পড়ছেন।
এই অবস্থায় রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করে তিনি দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান।
সংবিধানের কোন ধারায় পদত্যাগ
রাষ্ট্রপতি তার পদত্যাগপত্রে সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করেছেন। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি স্পিকারের কাছে লিখিতভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিলে তা কার্যকর হয়।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গুরুতর স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, বিকেল ৫টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি। যা জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পরপরই সংবিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।
এর আগে মো. সাহাবুদ্দিন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ-এর নিকট পদত্যাগপত্র জমা দেন।
স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরিত পদত্যাগপত্রে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, আমি গুরুতর অসুস্থ। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছি। আমার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ইদানিং স্বাস্থ্য পরীক্ষায় Autonomic Neuropathy নামক রোগ শনাক্ত হয়েছে। এই রোগের কারণে আমি মাঝে মাঝে ক্ষণিক অচেতন হয়ে যাই। রোগসমূহের প্রাদুর্ভাবে শারীরিক ও মানসিক অসামর্থ্যতার কারণে রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদের দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। আমার দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা প্রয়োজন।
তিনি আরও লিখেন, এ অবস্থায়, সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির পদ হতে পদত্যাগ করছি।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।