
আওয়াজ অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে আছে এক অনন্য রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে। দীর্ঘ আলোচনার পর, বহু প্রতীক্ষিত ও আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ আজ শুক্রবার বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে—এমন প্রত্যাশায় দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে ঐতিহাসিক উত্তেজনা ও কৌতূহল।
কিন্তু স্বাক্ষরের ঠিক প্রাক্কালে আবারও দেখা দিয়েছে বিভাজন ও অনিশ্চয়তার ছায়া। সূত্র বলছে, শেষ মুহূর্তেও সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান পুরোপুরি এক হচ্ছে না। সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ জাসদ এবং এনসিপি—এই পাঁচ দল আজকের অনুষ্ঠানে যাচ্ছে না বা শর্তসাপেক্ষে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত। জামায়াতে ইসলামীর নেতারা রাতভর বৈঠক শেষে আজ ভেন্যুতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই সনদ শুধু একটি দলিল নয়—এটি হতে পারে জাতীয় ঐক্যের নতুন সংবিধান, কিংবা অন্তত তার সূচনা। তবে যতই আশার বার্তা শোনা যাক না কেন, সনদ নিয়ে মতভেদ ও সন্দেহ এখন তারই ছায়ায় আড়াল হয়ে পড়ছে। কেউ বলছেন, সনদে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘোষণা বাদ দেওয়া হয়েছে, আবার কেউ মনে করছেন এটি রাজনৈতিক দায়মুক্তির পথ খুলে দিতে পারে। ফলে সমঝোতার টেবিল বারবার অচল হয়ে পড়ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সভাপতি অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বুধবারের জরুরি বৈঠকে বলেছিলেন, “আপনারা অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। এটি বাংলাদেশের জন্যই নয়, গোটা বিশ্বের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।”
তবে তার এই আশাবাদ সত্ত্বেও দলগুলোর মধ্যে যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা সহজে কাটছে না। বিএনপি ও জামায়াত যেমন ইতিবাচক অবস্থানে, তেমনি বামপন্থী দলগুলো বলছে, “মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণা বাদ দেওয়া কোনো দলিলে আমাদের স্বাক্ষর সম্ভব নয়।”
গতকাল পুরানা পল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “জুলাই সনদের পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদের তপশিলে থাকা স্বাধীনতার ঘোষণা বাদ দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।”
তিনি আরও জানান, “সনদের অঙ্গীকারনামায় আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার অধিকার বাতিল করা হয়েছে—এটি নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।”
সিপিবি, বাসদ (মার্কসবাদী) ও জাসদ একই সুরে বলেন, “জাতীয় ঐকমত্য মানে সর্বসম্মতি। সেখানে ভিন্নমত উপেক্ষা করে চূড়ান্ত কপি প্রকাশ করা হলে সেটি ঐকমত্য নয়, চাপিয়ে দেওয়া দলিল।”
এনসিপি জানিয়েছে, তাদের তিনটি মূল দাবি পূরণ না হলে তারা সনদে স্বাক্ষর করবে না। গণফোরাম বলেছে, তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেবে, কিন্তু তাদের পর্যবেক্ষণ মানা না হলে সই করবে না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, “আমাদের প্রস্তাবিত বিষয়গুলো লিপিবদ্ধ থাকলে আমরা অবশ্যই স্বাক্ষর করব।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, “দেশ এখন এক ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত বা দলীয় হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির স্বার্থে এক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায়, ‘জুলাই সনদ’ ইতিহাসের এক অপূর্ণ অধ্যায় হিসেবেই থেকে যাবে।”
সবশেষে বলা যায়, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ আজ শুধু একটি রাজনৈতিক চুক্তি নয়—এটি হতে পারে দীর্ঘ বিভক্তির পর জাতি হিসেবে বাংলাদেশের পুনর্জাগরণের দলিল। কিন্তু এই মাহেন্দ্রক্ষণ সত্যিকার অর্থে ঐতিহাসিক হয়ে উঠবে কি না, তা নির্ভর করছে নেতৃবৃন্দের সদিচ্ছা, সাহস এবং দূরদর্শিতার ওপর।
দেশজুড়ে তাই এখন একটাই প্রশ্ন—জাতি কি আজ সত্যিই ঐক্যের ইতিহাস লিখতে পারবে, নাকি সুযোগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েই আবার হারাবে এক নতুন সূর্যোদয়ের সম্ভাবনা?