
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পিঠে এক হাতে স্কুলব্যাগ, আর অন্য হাতে কাঠের বাক্স। সন্ধ্যা হলেই ঘুম আর ক্ষুধায় চোখ জোড়া লাল। ক্লাস সিক্সে ফেল করা ছেলেটি হয়তো তখন ভাবতেও পারেনি, একদিন সে দাঁড়িয়ে থাকবে জাতিসংঘের মঞ্চে। তার হাতে থাকবে ৩৪০ কোটির প্রতিষ্ঠান, আর হাজার তরুণের কর্মসংস্থানের দায়িত্ব। নাম তার পি সি মুস্তাফা—আজকের ভারতের “ব্রেকফাস্ট কিং”।
যেখানে দিন শুরু হতো না খেয়ে, আজ শুরু হয় তার খাবার দিয়ে
কফির বাগানে কাজ করতেন মুস্তাফার বাবা। দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারে স্কুল ছিল বিলাসিতা, প্রাতঃরাশ ছিল স্বপ্ন। এমন পরিবারে সন্তান মুস্তাফা হয়েছিলেন পরিবারের সঙ্গে বাঁচার সংগ্রামে এক নামহীন সৈনিক। স্কুল ছুটির পর বাবার সঙ্গে কুলির কাজ, রাতে পড়তে বসলে ঘুমে চোখ বন্ধ। অভাবের চাপে ক্লাস সিক্সে ফেল। যেন যাত্রার শুরুতেই হার।
কিন্তু মুস্তাফা থামেননি। পরের পাঁচ বছরে বদলে যায় দৃশ্যপট। ক্লাস টেনের বোর্ড পরীক্ষায় প্রথম হয়ে তাক লাগিয়ে দেন সবাইকে। সেই থেকেই শুরু যাত্রা উড়াল পাখির মতো।
ইঞ্জিনিয়ার, ইউরোপ প্রবাসী, তবু তৃপ্তি নেই—মাটি ডাকে
মুস্তাফার ভাগ্য খুলেছিল জাতীয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (NIT) ভর্তি হয়ে। পরে চাকরি পান একাধিক বহুজাতিক সংস্থায়। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যও আসে। কিন্তু ভেতরের অস্থিরতা থামেনি। যেন মাথা নিচু করে কোনও কিছু তার মাটির কাছ থেকে ডাকছে—গ্রামের সেই দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে বারবার।
২০০৫ সালে ৫০০ স্কয়ার ফিটের এক ছোট্ট অফিসে শুরু হয় মুস্তাফার প্রতিষ্ঠান “iD Fresh Food”। তখন দিনের বিক্রিও ছিল মাত্র ৫০ প্যাকেট ইডলি উপকরণ। সেই প্রতিষ্ঠান আজ ভারতজুড়ে প্রতিদিন হাজার হাজার প্যাকেট খাবার সরবরাহ করে।
প্রথম বছরে ৫,০০০ কেজি চাল দিয়ে শুরু করা সংস্থা এখন প্রতিদিন তার চার গুণ উৎপাদন করে। দশ বছরের মাথায় বাৎসরিক আয় ছাড়িয়ে যায় ১০০ কোটি রুপি। এরপর তা বেড়ে ১৮২, আর গত অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ২৯৪ কোটি রুপিতে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৪০ কোটি।
অভিনব ব্যবসা নয়, এটা বিশ্বাসের সঞ্চয়
iD Fresh Food শুধু ব্যবসা নয়, এটা বিশ্বাসের গল্প। মুস্তাফা বারবার বলেন, “আমি বড় হতে চেয়েছি, কিন্তু একা না—সবাইকে নিয়েই।”
আজ তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন হাজারের বেশি গ্রামীণ তরুণ। মুস্তাফা দেখিয়েছেন, যাদের একবেলা খাবার ছিল না, তারাও একদিন দেশের মানুষের জন্য খাবার জোগানদাতা হয়ে উঠতে পারে।
জাতিসংঘ পর্যন্ত পথ, কফি বাগান থেকে
নিজের এই উত্তরণে আজ গর্ব শুধু ব্যক্তিগত নয়, জাতীয়ও। জাতিসংঘে বক্তৃতা দিয়েছেন মুস্তাফা। ভারতের শীর্ষ ১০ “সেল্ফ মেড ম্যান”–এর তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। আর সব কিছুর পেছনে রয়েছে একটাই বার্তা—সাহস যদি থাকে, গল্পটা বদলে যেতেই পারে।