হোম » শিরোনাম » সাংবাদিক সৈয়দ আহসানের দৃস্টিতে জার্মানের ইতিকথা

সাংবাদিক সৈয়দ আহসানের দৃস্টিতে জার্মানের ইতিকথা

সৈয়দ আহসানঃ বন্ধুগন আমি আহসান আজ চল্লিশ বছর হলো জার্মানিতে অবস্থান করছি। সেই ২৪ বছর বয়সে আমি জার্মানিতে এসেছিলাম। এদেশের মাটি ,জলবায়ু , প্রকৃতি আমাকে লালন করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা , চাকুরী ছাড়াও জার্মান যুবসমাজের সাহায্য বন্ধুত্ত্ব ও সহযোগিতা নিজের ক্যারিয়ারের সঙ্গে যোগ হয়েছে। এ ছাড়াও জার্মান শিল্প ,সাহিত্য ,সঙ্গীত ইত্যাদির সাথে নিবিড় ভাবে পরিচিত হয়েছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জার্মানির জনগনের তথা এই জাতির চিন্তা ধারার একটা পরিবর্তনের মাধ্যমে জার্মানি এখন বিশ্বমানচিত্রে একটা বিরাট মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। আমি এখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী জার্মানির ইতিহাস নিয়ে কিছু লিখতে চাই। এসম্পর্কে কিছু লিখতে গেলে সর্বপরি হিটলারের কথা চলে আসে।

অস্ট্রীয় বংশোদ্ভূত জার্মান রাজনীতিবিদ হিটলারের জন্ম হয় ১৮৮৯ সালের ২০শে এপ্রিল, তিনি ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃত্ব দিয়ে জার্মানীকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জাতীতে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। হিটলার ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জার্মানির চ্যান্সেলর এবং ১৯৩৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত সে দেশের ফিউরার ছিলেন।হিটলারের জীবনী পৰ্য্যালোচনা করলে দেখা যায় তার বাবা Alois সমাজ স্বীকৃত বৈধ ভাবে জন্মগ্রহণ করেন নি। তিনি সরকারী কাস্টম্‌স অফিসে কাজ করতেন। সরকারী কাস্টম্‌স থেকে অবসর গ্রহণের পর হিটলারের বাবা সপরিবারে আপার অস্ট্রিয়ার লিন্‌ৎস শহরে চলে আসেন। এখানেই হিটলারের বাল্যকাল অতিবাহিত হয়। ১৯০৩ সালে বাবা মারা যান। বাবার রেখে যাওয়া পেনশন ও সঞ্চয়ের অর্থ দিয়েই তাদের সংসার কোনমতে চলতে থাকে। অনেক ভোগান্তির পর ১৯০৭ সালে মাতাও মারা যান।

হিটলার নিঃস্ব হয়ে পড়েন। এজন্য পড়াশোনায় বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি।এক সময় তিনি পোস্টকার্ড ও বিজ্ঞাপনের ছবি এঁকে সামান্য উপার্জন করতেন। এই অর্থ দিয়ে ভিয়েনার এক হোস্টেল থেকে আরেক হোস্টেলে বাস করতে থাকেন।১৯১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রীয় সামরিক বাহিনীতে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করে বিফল হন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধে সাহসিকতা ও বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে ১ ৯১৮ সালের আগস্টে ফার্স্ট ক্লাস আয়রন ক্রস দেয়া হয়। একজন করপোরালের পক্ষে এটা বেশ বড় প্রাপ্তি। হিটলার খুব উৎসাহের সাথে যুদ্ধ করেছেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে জার্মানির অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে । জার্মানিতে ভাইমার প্রজাতান্ত্রিক সরকারের দুর্বলতা নানা দিক দিয়ে ফুটে বেরুতে থাকে । দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব, শিল্পবাণিজ্যে মন্দা, জনস্ফীতি, খাদ্যসংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ইত্যাদি নানান সমস্যার কারণে মানুষের জীবন যখন দুর্বিষহ হয় ওঠে ও ভার্সাই সন্ধির অপমানজনক শর্তগুলো জার্মানদের মধ্যে গভীর উত্তেজনা ও প্রতিশোধ স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। ওই সময় জার্মানির নব গঠিত ভাইমার প্রজাতন্ত্র সাম্যবাদী আদর্শকে ঠেকালেও জনগণের স্বপ্নকে সার্থক করে তুলতে বা তাদের নতুন আশা আকাঙ্ক্ষাকে পূরণ করতে পারছিল না ।এই পরিস্থিতিতে এ্যাডলফ হিটলার নামক জার্মানির জনৈক্য সৈনিক তাঁর ‘মেইন ক্যাম্প’ বা আমার সংগ্রাম নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে একটি রাজনৈতিক দলের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন।

Holiday gift box or present with bow ribbon against blue bokeh background. Magic christmas greeting card. Copy space for data or design.

ছলেবলে কৌশলে ইউরোপের জার্মান ভাষাভাষি মানুষদের নিয়ে বিশাল জার্মান সাম্রাজ্য গঠন করে জার্মানিকে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শক্তিধর জাতিরূপে গড়ে তোলাই ছিল হিটলারের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল । সেই সময় হিটলারের নাৎসিবাদে আকৃষ্ট হয়ে জার্মানির অসংখ্য যুবক যুবতী, কৃষক ও ব্যবসায়ী ও সর্বশ্রেণির জার্মান তাঁর নাৎসি দলে যোগদান করতে থাকে ।

\অচিরেই হিটলার ও তাঁর নাৎসি দল জনপ্রিয় ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে । ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে দেশের রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন প্রার্থী হয়ে হিনডেনবার্গ -এর কাছে হিটলার পরাজিত হন । ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিনডেনবার্গ হিটলারকে তাঁর প্রধানমন্ত্রী (চ্যান্সেলার) নিযুক্ত করেন ।

জার্মানিতে চ্যান্সেলর পদটি আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো একটি প্রশাসনিক পদবি। এই ঘটনার ঠিক দেড় বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৩৪ সালের আগস্ট মাসে ফন হিল্ডেনবার্গ মারা যান। হিটলার তখন প্রেসিডেন্ট পদটিও দখল করে ফেললেন। জার্মানির ইতিহাসে একমাত্র হিটলারই একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ও চ্যান্সেলর উভয় পদ অাঁকড়ে ছিলেন আমৃত্যু। তাকে কি প্রেসিডেন্ট বলা হবে নাকি চ্যান্সেলর এই সমস্যা দূর করার জন্য তিনি নতুন একটি উপাধি গ্রহণ করলেন। তার এই উপাধিটির নাম ছিল ফুয়েবার অর্থাৎ ত্রাণকর্তা।হিটলার দলে নিজের ক্ষমতা সংহত করার উদ্দেশ্যে কয়েকটি নীতি ও আদর্শের কথা ঘোষণা করেন । ঘোষণা অনুযায়ী হিটলার কতকগুলি কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ।

১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই জুলাই এক আইন প্রণয়ন করে রাজনীতিতে নাত্সী দল ছাড়া অন্য সব রাজনৈতিক দলগুলিকে নিষিদ্ধ করা হয় ।সমস্ত সরকারি কর্মচারী ও সৈনিককে নাত্সী দলের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে বাধ্য করা হয় ।প্রাদেশিক সরকারগুলির সব স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়ে সেগুলিকে নাত্সী শাসনের অধীনে নিয়ে আসা হয় ।ইহুদীদের সঙ্গে জার্মানদের বিয়ে নিষিদ্ধ হয় এবং সব রকমের চাকরি থেকে ইহুদীদের অপসারিত করা হয় ।

সংবাদপত্রের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে সেগুলিকে নাত্সী দলের প্রচার যন্ত্রে পরিণত করা হয়, যাতে সংবাদপত্রগুলি সর্বদা এই দল ও দল পরিচালিত সরকারের গুণগানে মুখর থাকে ।(৭) জার্মানদের সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয় ।ইউরোপ তথা সারা বিশ্বে জার্মানিকে প্রধান শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হিটলার পররাজ্য গ্রাস বা বিস্তার নীতি অবলম্বন করে । বিস্তারধর্মী পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গ হিসাবে ভার্সাই সন্ধির শর্ত উপেক্ষা করে তিনি জার্মানির সামরিক শক্তিকে শক্তিশালী করেন এবং ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনের সঙ্গে নৌ-চুক্তি স্বাক্ষর করেন । ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে হিটলার ইতালির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং পরের বছর লোকার্নো চুক্তির শর্ত উপেক্ষা করে রাইন অঞ্চলে সৈন্য পাঠান । এইভাবে হিটলার পররাজ্য গ্রাস শুরু করেন ।

১৫ই সেপ্টেম্বর ১৯৩৫ সালে রাইখশট্যাগে একটি ন্যুরেমবার্গ আইন চালু করা হয়.তাতে রাইখ নাগরিকত্ব আইনে সংশোধনী এনে অ জার্মানদের জার্মান নাগরিকত্বের সুবিধাসমূহ থেকে বঞ্চিত করা হয়। জার্মান রক্ত ও সম্মান কে বিশুদ্ধ রাখা”র নাম দিয়ে ইহুদী ও অইহুদী জার্মানদের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ করে আইন পাশ করা হয়।

১৯৩৮ সালে কয়েকজন ইউরোপীয় নেতাকে সঙ্গে নিয়ে হিটলার মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুসারে পোল্যান্ডে অবস্থিত সুডেটল্যান্ডকে জার্মানির একটী জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয় যা ছিল ভার্সাই চুক্তির ঠিক উল্টোটা । এই চুক্তির জন্য হিটলারকে ১৯৩৮ সালে টাইমস ম্যাগাজিনে “বর্ষ সেরা ব্যক্তি”র উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
এই কূটনৈতিক সাফল্য জার্মানির কর্তৃত্বকে নতুনভাবে শানিত করে। যার ফলে ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জার্মানির পোল্যন্ড আক্রমনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। পোল্যান্ড আক্রমনের দুই দিন পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

১৯৪০ সালে নরওয়ে, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস এবং বেলজিয়াম আক্রমনের মাধ্যমে হিটলার তার সামরিক পরিসর বৃদ্ধি করতে থাকেন। জুলাই মাসে হিটলার যুক্তরাজ্য আক্রমনের উদ্দেশ্যে বোমা নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। জার্মানির পূর্বের সহযোগী জাপান এবং ইতালি সহ এই তিন দেশকে বলা হত অক্ষশক্তি। অক্ষশক্তি সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ভয় দেখিয়ে যুক্তরাজ্যকে সহযোগিতা করার থেকে নিবৃত করার ব্যাপারে একমত হয়।


২২ শে জুন ১৯৪১ সালে হিটলার ১৯৩৯ সালে জোসেফ স্ট্যালিনের সাথে করা ‘অনাক্রমণ চুক্তি’ ভেঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপুল পরিমান জার্মান সৈন্য প্রেরণ করেন। হিটলার তার আক্রমণকারী বাহিনীকে সাময়িক যুদ্ধ বিরতি দিয়ে লেনিনগ্রাদ এবং কিয়েভ ঘিরে ফেলার নির্দেশ দিতে দিতেই তার বাহিনী রাশিয়ার বিশাল ভূখন্ড দখল করে ফেলে। তার নির্দেশ পেয়ে জার্মান বাহিনী সাময়িক যুদ্ধ বিরতি দেয় এবং সুযোগে ১৯৪১ এর ডিসেম্বরে রাশিয়ার রেড আর্মি বাহিনী হিটলার বাহিনীকে প্রতিআক্রমণ করে মস্কোর মধ্যে তাদের কোণঠাসা করে ফেলে।১৯৪২ সালের শেষের দিকে, জার্মান বাহিনী স্ট্যালিনগ্রান্ডের যুদ্ধে (১৯৪২-৪৩) পরাজিত হয় যা যুদ্ধকে একটি নতুন দিকে মোড় দেয়।৬ই জুন ১৯৪৪ যা ইতিহাসে ডি-ডে নামে পরিচিত সেদিন পশ্চিমা মিত্র বাহিনী ফ্রান্সের উত্তরাংশে অবতরণ করে ।

এই উল্লেখযোগ্য বিপর্যয়ের ফলে, অনেক জার্মান কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এবার তাদের পরাজয় নিশ্চিত এবং হিটলারের নিয়মিত শাসনের ফলে দেশটি ধ্বংসের মুখে চলে গিয়েছে। ১৯৪৫ সালের প্রথম দিকে হিটলার উপলব্ধি করেন যে জার্মানি যুদ্ধে হারতে বসেছে। সোভিয়েত বাহিনী জার্মান বাহিনীকে চাপের মুখে পশ্চিম ইউরোপে ঠেলে পাঠাতে থাকে এবং মিত্রবাহিনী পশ্চিম জার্মানির দিকে অগ্রসর হয়ে বার্লিন দখল করে নেয়। শত্রূ সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে হিটলার এবং ব্রাউন ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল অর্থাৎ তাদের বিয়ের পরের দিন আত্মহত্যা করেন। তাদের মৃতদেহ রাইখ চ্যান্সেলেরির বাইরে একটি বোমা বিস্ফোরক এলাকাতে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। ২ মে, ১৯৪৫ সালে বার্লিনের পতন হয় এবং জার্মানি নিঃশর্তভাবে মিত্রশক্তির কাছে আত্মসমর্পন করে।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!