
বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়ে গেছে। সেই পূজা নির্বিঘেœ করতে মাদরাসার ছাত্ররা স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতে রাজি বলে ইতোমধ্যে জানিয়েছেন ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘‘মাদরাসার ছাত্ররা বলেছেন, পূজা কমিটি যদি চায় তারা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে সম্মত আছে। শুধু তাই নয়, দুর্গাপূজার সময় নিরাপত্তায় আকাশে হেলিকপ্টার থাকবে, দশমীর দিন ডুবুরি থাকবে। দুর্গাপূজার অনুদান ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা করে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। আমরা একটা তালিকা করে অসচ্ছল মন্দিরগুলোকে এই চার কোটি টাকা জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে বিতরণ করব। প্রতি পূজা মন্ডপের জন্য ৫০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হতো। আমার মন্ত্রণালয় থেকে এটা ২০০ কেজি পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছি।’’ প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও ঢাকার সচিবালয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে দুর্গাপূজার আইনশৃঙখলা নিয়ে আয়োজিত সভা শেষে সাংবাদিকদের এ আগ্রহের কথা জানিয়ে ছিলেন ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা।
এ সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এসময় ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর ও সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, ঢাকা মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেব ও সাধারণ সম্পাদক ড. তাপস পাল প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, যেহেতু আমাদের লোক যাওয়া-আসা করে, এপারের লোক ওপারে পূজা দেখতে যায়, আবার ওপারের লোক এপারে পূজা দেখতে আসে।
এখানে সবাইকে আমি অনুরোধ করেছি, এবার আপনারা বর্ডার বেল্টে ভালো ভালো পূজামন্ডপ করেন। যাতে আমাদের লোক ওপারে না যায় পূজা দেখার জন্য। ওপারের লোক যেন এপারে না আসে, এটার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এসব পূজামন্ডপে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্গাপূজার সময় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি হলো স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা। এবারের স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ একটু আলাদা হবে। বাংলাদেশের যেকোন নাগরিককে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করা হবে। এই
স্বেচ্ছাসেবকদের সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। যেমন ধরুন, স্বেচ্ছাসেবক (ক) রাত একটা থেকে রাত তিনটা পর্যন্ত, স্বেচ্ছাসেবক (খ) রাত তিনটা থেকে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত। তাদের সংখ্যা সর্বনিম্ন রাতে তিন জন এবং দিনে দুই জন হবে। ব্যবস্থা নেওয়া হবে যানজট নিরসনেও। উপদেষ্টা বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে আযান এবং নামাজের সময় মাইক বা বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখা। এবারও অন্যান্য বছরের মতো উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন করবেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।
এবার দেশজুড়ে ৩২ হাজার ৬৬৬ মন্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপন হবে। এ ছাড়া ঢাকার দুই সিটিতে ২৪৫ টি মন্ডপে পূজা উদযাপন হবে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ১৫৭ টি ও উত্তর সিটিতে ৮৮ টি মন্ডপ হবে। তবে পূজা মন্ডপের যে সংখ্যা বলা হচ্ছে তা সরকারি বা পূজা উদযাপন পরিষদের তালিকা নয়। এটি একটি সম্ভাব্য তালিকা। এই সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা আরও একটু বেশী বলে অনেকের ধারনা। গত বছর মোট পূজা মন্ডপের সংখ্যা ছিল ৩৩ হাজার ৪৩১। পূজা উপলক্ষে দেশজুড়ে সার্বিক আইনশৃঙখলা কঠোর থাকবে। উল্লেখ্য, ৯ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। গত বছর দুর্গাপূজা ছিল অক্টোবরের শেষ ভাগে কিন্তু এই বছরের শারদীয়া দুর্গাপূজা অক্টোবরের প্রথম ভাগে পড়েছে। মহাষষ্ঠী পড়েছে ৯ অক্টোবর বুধবার, মহাসপ্তমী ১০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার, মহাষ্টমী ১১ অক্টোবর শুক্রবার, মহানবমী ১২ অক্টোবর শনিবার আর বিজয়া দশমী পালিত হবে ১৩ অক্টোবর ২০২৪ রবিবার।
এই বছর কোজাগরী লক্ষীপূজা পালিত হবে আগামী ১৭ অক্টোবর ২০২৪ বৃহস্পতিবার। কালীপূজার আনন্দে সবাই মেতে উঠবে আগামী ৩১ অক্টোবর বৃহস্পতিবার। ভাইফোঁটা বা ভ্রাতৃদ্বিতীয়া পড়েছে আগামী ৩ নভেম্বর ২০২৪ রবিবার। হিন্দুশাস্ত্র মতে, এই বছর মহাসপ্তমী বৃহস্পতিবার পড়ায় দেবীর আগমন হবে দোলা বা পালকিতে। শাস্ত্র অনুসারে দোলা বা পালকিতে দেবীর আগমন হলে সূচিত হয় ভয়ঙ্কর মহামারী, যাতে বিপুল প্রাণহানীর আশঙ্কা থাকে। আবার ২০২৪-এ বিজয়া দশমী রবিবার পড়ায় এই বছর দেবী ফিরে যাবেন গজ বা হাতিতে। গজ হল দেবীর উৎকৃষ্টতম বাহন, দেবীর আগমন বা গমন হাতিতে হলে মর্ত্যালোক ভরে ওঠে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে আর ভক্তদের মনের ইচ্ছে পূরণ হয়।
বাংলায় দুর্গাপূজার শুরু ঠিক কবে থেকে এ নিয়ে নানান পন্ডিত ও গবেষকদের মধ্যে নানা মত থাকলেও মোটামুটি একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, ষোড়শ শতকে সম্রাট আকবরের শাসনামলে রাজশাহীর তাহিরপুর অঞ্চলের সামন্ত রাজা কংস নারায়ণ ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গদেশে সর্বপ্রথম মহাআড়ম্বরে শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপন শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেই সময়ের পূজা মোটেও আজকের দিনের মতো ছিলো না। তৎকালীন হিন্দু সমাজ গোত্র-বর্ণ দ্ব›েদ্ব তখন এতটাই বিভক্ত যে, দুর্গাপূজা তখনো সর্বজনীন হয়ে উঠার সুযোগ পায়নি। উৎসবে অন্য ধর্মের মানুষদের সাদরে বরণ করে নেয়া তো অনেক দূরের ব্যাপার, ব্রাহ্মণবাড়ির পূজায় বৈশ্য-শুদ্রের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো।
এছাড়াও ধনীসমাজ ছাড়া পূজা আয়োজন করাটাও সবার পক্ষে সম্ভবপর ছিলোনা, তাই সমাজের একটা বিশাল অংশ এই পুরো আয়োজনে ছিলো শুধুই দর্শকমাত্র। জমিদারি প্রথাকালীন সময়েও এই পূজার রূপ ও আয়োজন ছিলো সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে। বিভিন্ন এলাকার জমিদারেরা দুর্গাপূজাকে নিজ
পরিবার ও বংশের সম্মান- আভিজাত্যের বিষয় হিসেবে দেখতেন, তাই এই পূজায় অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির জন্য দূরদূরান্ত থেকে বিখ্যাত কারিগর যোগাড় করে আনতেন জমিদারেরা। মন্ডপ তৈরিতেও থাকতো অর্থ-বিত্ত ও সৃজনশীলতার বৈচিত্র। তাছাড়া ইংরেজ বাবুদের মন্ডোপের চাকচিক্য দেখিয়ে, প্রতিমায় ভিন্নতা এনে, উৎসবের নানাবিধ খাবারের আয়োজনে তুষ্ট করে, দামি উপহার দিয়ে খুশি করার প্রচেষ্টারও কমতি থাকতোনা। জমিদারদের দেখাদেখি এই অঞ্চলের উচ্চবিত্ত ও সম্ভ্রান্ত পরিবার গুলোও দুর্গাপূজাকে বাড়ি কেন্দ্রিক ও বংশ কেন্দ্রিক করেছিল। এমনকি এখনো দেশের গ্রামীন এলাকাগুলোতে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকার বড় বড় পূজাগুলো ‘রায়বাড়ির পূজা’, ‘সেন বাড়ির পূজা’ এভাবে বিভিন্ন বংশের নামে পরিচিত। মোটকথা দুর্গাপূজা জনপ্রিয় আর সর্বজনীন হয়ে উঠার জন্য আমাদেরকে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার হয়েছিল। স্বাধীনদেশে আস্তে আস্তে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হতে থাকে, পূজার ধরন তখন পাল্টাতে থাকে। দুর্গাপূজা উচ্চবিত্ত ও জমিদারদের আলিশান মহল থেকে সাধারণ মহলে বেরিয়ে আসে। গুটিকয়েকের ধর্মীয় আচার থেকে বেড়িয়ে পরিণত হয় সমাজের সকল শ্রেণির, সকল মানুষের উন্মুক্ত উৎসবে। খেটে খাওয়া শ্রমিক, মজুর, কৃষক ও সাধারণ মানুষও তাদের বাৎসরিক আনন্দ উৎসব হিসেবে দুর্গাপূজাকে বরণ করে নেয়। এরপর দুর্গাপূজায় দিন দিন সাম্য, সৌহার্দ্য ও অংশগ্রহণ শুধুই বেড়েছে। এখন শহরে পূজা হচ্ছে
বিভিন্ন মন্দির আর হাউজিং সোসাইটিকে কেন্দ্র করে। আবার বিভিন্ন এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা একত্র হয়ে চাঁদা তুলে আয়োজন করছেন পূজা, আর সেই পূজায় বিভিন্ন বয়সের মানুষের আগমন নিশ্চিত করতে রাখা হচ্ছে নানান ইভেন্ট।

পূজা মন্ডপের চারপাশে উৎসবের আমেজ রাখতে বসেছে মেলা, স্টলে স্টলে থাকছে পূজার নাড়–-লাড্ডু আর ছানা থেকে শুরু করে জিলাপি, সন্দেশসহ রকমারি সব খাবারের আয়োজন। শিশুদের আনন্দের কথা ভেবে রাখা হচ্ছে চরকি ও নাগরদোলা। এসবই করা হচ্ছে আয়োজনটিকে সকলের জন্য একটি উৎসবে পরিণত করার প্রয়াস হিসেবে। সেই আয়োজনে অন্য ধর্মের মানুষদের অংগ্রহণও দিন দিন বাড়ছে, এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে ও সামাজিকভাবে এই আয়োজনে তারা সাহায্য ও সহযোগিতাও করছে। সারদীয় দুর্গাপূজার এই আয়োজন এখন মানুষের আনন্দ উৎসবের একটি সামাজিক উপলক্ষ হয়ে উঠেছে।
পূজায় এখন আর বর্ণ-গোত্র নিয়ে কোন ভেদাভেদ নেই, মন্ডপে ঢুকে দেবী দর্শন করতে চাইলে আপনি অন্য ধর্মের লোক বলে বা ব্রাহ্মণ না বলে
কেউ আপনাকে আটকাবে না।
হিন্দু ধর্মশাস্ত্র অনুসারে, দেবীদুর্গা ‘দুর্গতিনাশিনী’ বা সকল দুঃখ-দুর্দশা বিনাশকারিনী। ‘সকল আসুরিক শক্তির দমন হয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে সাম্য’- দুর্গাপূজার মূল বাণী এটিই। অতীতের জমিদার বাড়ির অন্দরমহল থেকে এই যে দেবী দুর্গা আজ পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে বর্ণ-গোত্র-ধর্ম ভেদে মানুষের উৎসবের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন, সেটা সেই সাম্যকেই বারবার প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্ঠা করেছে।
হিন্দুধর্মগ্রন্থ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ থেকে জানা যায়, দুর্গাপূজার প্রবর্তক ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা কৃষ্ণ বৈকুণ্ঠের আদি-বৃন্দাবনের মহারাসামলে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। দেবীভাগবত পুরাণ অনুসারে, ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু পৃথিবীর শাসক হয়ে ক্ষীরোদসাগরের তীরে দুর্গার মাটির মূর্তি তৈরি করে পূজা
করেছিলেন। শ্রী শ্রী চন্ডীতে দুর্গাপূজা প্রচলনের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া রাজা সুরথ, মধুকৈটভ, শুম্ভ নিশুম্ভের কাহিনি থেকে দুর্গাপূজার কথা জানা যায়। তন্ত্র শাস্ত্র মতে, সব স্থান আর সময়ই
দুর্গাপূজার জন্য উপযুক্ত। তবে বিশেষ সময় বা তিথি অনুসারে, বছরে মূলত চারটি নবরাত্রি হয়ে থাকে। যার মধ্যে দুটিকে গুপ্ত নবরাত্রি হিসেবে ধরা হয়। গুপ্ত নবরাত্রি আষাঢ় ও মাঘ মাসে হয়, অন্যদিকে প্রত্যক্ষ নবরাত্রি আশ্বিন ও চৈত্র মাসে পালন করা হয়। এ হিসেবে আশ্বিনের দুর্গাপূজাকে একটি প্রত্যক্ষ নবরাত্রি বলা যায়। এই নবরাত্রির তিথি অনুযায়ী, ভক্তরা ৯ দিনে দেবী দুর্গার ৯ টি রূপকে আরাধনা করে থাকে। অবাঙালি হিন্দুরা এই নবরাত্রির পূজা উৎসব বেশি করে থাকে। বাঙালিদের শারদীয় দুর্গাপূজা কিন্তু নবরাত্রির মতো নয়। এই পূজা উৎসবে ৯ দিনে দেবীর ৯ টি রূপ আরাধনার পরিবর্তে ৫ দিন ধরে দেবীর একটি রূপেরই আরাধনা করা হয়ে থাকে। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষ বা দেবীপক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে ‘দুর্গাষষ্ঠী’, ‘দুর্গাসপ্তমী’, ‘মহাষ্টমী’, ‘মহানবমী’ ও ‘বিজয়াদশমী’ নামে পরিচিত। পৃথিবীতে দেবীপক্ষের সূচনা ঘটে অমাবস্যার মধ্য দিয়ে, যা
মহালয়া নামে পরিচিত। এই দিন হিন্দুরা তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। বাঙালি সমাজে বর্তমানে যে শারদীয় দুর্গা উৎসব প্রচলিত রয়েছে সেটিকে মূলত ‘অকালবোধন’ বলা হয়।
‘অকালবোধন’ মানে অকালে বা অসময়ে দেব বা দেবীর আরাধনা করাকে বোঝায়। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। যে কারণে এই সময়টি পূজার জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। কিন্তু রাম রাবনের যুদ্ধের সময় রাজা রাম যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য নিরুপায় হয়ে এই সময় দেবীর আরাধনা করেছিলেন। অকালের এই পূজা তাই ‘অকালবোধন’ বলে মর্ত্যবাসীদের কাছে পৌঁছায়। এরপর থেকেই স্মৃতিশাস্ত্রসমূহে শরৎকালে দুর্গাপূজার বিধান দেওয়া হয়েছে। ধরাধামে শান্তি প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জীবনে নানা ঘাত প্রতিঘাত থেকে ভক্তরা নিজেকে জয়ী সৈনিক হিসেবে পৃথিবীর বুকে মেলে ধরতে আর দেবী দুর্গার কৃপা পেতে এই সময়টাতেই তাই মেতে ওঠেন দেবী আরাধনায়। আর ভক্তের ডাকে পৃথিবীতে তখন বিরাজ করে দেবী পক্ষ। অর্থাৎ সেই সময়টুকু আধ্যাশক্তি মহামায়ার শক্তি পৃথিবীতে উপস্থিত হয়। আর ভক্তের ডাক ও আরাধনায় সন্তুষ্ট হয়ে সেই শক্তি দিয়েই ভক্তের কৃপা করেন দেবী মহামায়া দুর্গা।
প্রতি বছর শরতের এই সময় বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের কোটি কোটি সনাতন ধর্মাবল¤ী^রা তাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উদযাপন করেন। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই উৎসব পালিত হলেও বাঙালীদের কাছে এটি দুর্গাপূজা নামে পরিচিত। ভারতের বিভিন্ন এলাকাতেও এই পূজা আলাদা নামে ও আঙ্গিকে উদযাপিত হয়। প্রতিবছর শরতের সময় এই পূজার আয়োজন করা হলেও তারিখে পার্থক্য দেখা যায়। হাজার বছর ধরেই এই রীতি চলে আসছে। সনাতন ধর্মের শাস্ত্র অনুযায়ী, প্রতিবছর শরৎকালে দুর্গাপূজা উদযাপন করা হয়। এই কারণে একে শারদীয় দুর্গোৎসবও বলা হয়ে থাকে। চাঁদপুরের রামকৃষ্ণ মিশনের অধ্যক্ষ স্বামী স্থিরাত্মানন্দ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘‘আমরা যেমন সাধারণ জীবনে সূর্যের হিসাবে দিনক্ষণ হিসাব করি, কিন্তু আমাদের ধর্মে সেটা করা হয় চন্দ্রের তিথি হিসাবে। যেমন চাঁদ নিজের কক্ষপথে পুরো ঘুরতে সময় নেয় সাড়ে ২৯ দিন, তিনঘণ্টা কমবেশি আছে। কখন চাঁদ দেখা যাবে, সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবীর অবস্থান হিসাব করে তিথি নির্ধারণ করে নেয়া হয়।’’ দুর্গাপূজার নিয়ম অনুযায়ী, আশ্বিন মাসে প্রথম যে অমাবস্যা হবে, সেটির নাম মহালয়া। এরপরে যে চাঁদ উঠবে, সেই চাঁদের ষষ্ঠ দিনে দেবীর বোধন বা মহাষষ্ঠীর মাধ্যমে দুর্গাপূজা শুরু হবে।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, এই দিন পিতৃপক্ষের অবসান হয় মাতৃপক্ষের শুরু হয়। অর্থাৎ দুর্গাপূজার আক্ষরিক সূচনা শুরু হল। এদিন থেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা দেবী দুর্গার আগমন কামনা করতে শুরু করেন। তাদের পুরাণ অনুযায়ী, মহাষষ্ঠীর দিনে দেবী পৃথিবীতে নেমে আসেন। মহালয়া শব্দের অর্থ মহান আলয় বা আশ্রম। হিন্দু ধর্মে বলা হয়ে থাকে, এদিন দেবী দুর্গার চক্ষুদান হয়েছিল। পুরাণ মতে, ব্রহ্মার বরে মহিষাসুর অমর হয়ে উঠেছিলেন। তবে সেই বরে বলা ছিল, শুধুমাত্র কোনও নারীশক্তির কাছে তার পরাজয় ঘটবে। ফলে অসুরদের কারণে যখন দেবতারা অতিষ্ঠ, তখন ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর মিলে দেবী দুর্গাকে সৃষ্টি করেন। দেবতাদের দেয়া অস্ত্র দিয়ে তিনি অসুরকে বধ করেন।
-মোঃ মনিরুল ইসলাম-
সিনিয়র ব্যাংকার, জনতা
ব্যাংক পিএলসি.
রাজশাহী।