
আওয়াজ অনলাইনঃ জাহিদুল হত্যার রহস্য উদঘাটনসহ হত্যার সাথে জড়িত ৭ মলমপার্টির সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-১১।
রূপগঞ্জের চাঞ্চল্যকর জাহিদুল ইসলাম হত্যার রহস্য উদঘাটনসহ এই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত মলমপার্টির ৭ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-১১। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বার্তায় বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নারায়ণগঞ্জ আদমজীনগরের র্যাব-১১এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল তানভীর মাহমুদ পাশা (পিএসসি)। সোমবার রাতে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানায় র্যাব। গ্রেফতারকৃতরা হলো মো. সাইফুল ইসলাম (৩০), মো. শামীম (৪০), মো. রনি মিয়া ওরফে টনি (৩০), মো. আ. মান্নান শেখ (২২), মো. সুমন (৩৮), মো. মামুনুর রশিদ (৩৫) ও মো. হাবিবুল্লাহ (৫২)।
বার্তায় র্যাব জানায়, ২১ জুলাই জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার টেংরারটেক এলাকার এশিয়ান হাইওয়ে রোডের পশ্চিম পার্শ্বে অবস্থিত একটি মাল্টিব্র্যান্ড গ্রæপের বাউন্ডারি সংলগ্ন ডোবার মধ্যে ভাসমান অবস্থায় অজ্ঞাত এক ব্যক্তির মরদেহ পাওয়া যায়। গত ২৪ জুলাই হাসপাতাল মর্গে উপস্থিত হয়ে মো. কাজল হোসেন (২১) নামক এক ব্যক্তি মরদেহের আলোকচিত্র ও তার পরনে থাকা কাপড় দেখে দেহটি তার বাবা জাহিদুল ইসলাম (৫০) এর বলে সনাক্ত করে। এই ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় কাজল বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। (যার মামলা নং-৪০, তারিখ-২৫/০৭/২০২১)।
এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহসহ প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং ঘটনায় জড়িত থাকা আসামীদের গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে ছায়া তদন্ত শুরু করে র্যাব-১১’র একটি গোয়েন্দা দল। তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে র্যাব সূত্র বিহীন এই লোমহর্ষক হত্যাকাÐের মূল রহস্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়।
তারই ধারাবাহিকতায় ১৬ আগস্ট রাতে র্যাব-১১ এর একটি চৌকস দল দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে এই হত্যাকাÐের সাথে জড়িত এবং দলের মূল হোতা গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা থানার আদর্শ গ্রামের গফুর আলী’র ছেলে সাইফুল ইসলামসহ তার ৬ সহযোগী একই জেলা ও থানার দুর্গপুর গ্রামের ইব্রাহীম খলিলের ছেলে রনি মিয়া, পঞ্চগড় জেলার সদর থানার মসজিদপাড়া গ্রামের মৃত গিয়াসউদ্দিনের ছেলে শামীম, রংপুর পীরগাছা থানার অন্যদানগর গ্রামের ইব্রাহীম শেখের ছেলে আ. মান্নান শেখ, নাটোরের সিংড়া থানার পুটিমারী গ্রামের লস্কর প্রামাণিকের ছেলে মো. সুমন, নাটোরের বাগাতিপাড়া থানার গালিমপুর গ্রামের মৃত তাইজ উদ্দিন এর ছেলে মামুনুর রশিদ ও গাজীপুর জেলার জয়দেবপুর থানার চান্না বৌবাজার গ্রামের মৃত ইয়াছিনের ছেলে মো. হাবিবুল্লাহকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
র্যাব জানায় তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এবং গ্রেফতারকৃত আসামীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, গত ১৮ জুলাই এই চক্রের মূলহোতা সাইফুল ইসলাম ঢাকার কেরাণীগঞ্জ হতে ও তার সহযোগী রনি মিয়া গাইবান্ধা হতে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় অবস্থানরত শামীম, মান্নান, সুমন, মামুন ও হাবিবুল্লাহসহ ৯ জনের একটি দল সাইফুলের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হয়। সাইফুলের আরেক সহযোগী নাটোর থেকে আরও ৫ জনের একটি দল ১টি ট্রাক নিয়ে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা এসে সাইফুলের দলের সাথে মিলিত হয়। ১৯ জুলাই ভোর রাতে তারা একত্রিত হয়ে নারায়ণগঞ্জ হয়ে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।
ঘটনার দিন দুপুরবেলা তারা কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকায় এসে পৌছায় এবং সেখানে তারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। সন্ধ্যার পর চক্রের প্রধান সাইফুল যাত্রী বেশে ঈদে ঘরমুখো সাধারণ যাত্রীদেরকে কম টাকায় পরিবহনের আশ^াস দিয়ে ঘটনার শিকার জাহিদুল ইসলাম (৫০)সহ তার ৪ সঙ্গী আলম (৫০), আরিফ (৩০), শরীফুল ইসলাম (৫০) ও সবুজ (৩০)কে সু-কৌশলে তাদের ট্রাকে উঠিয়ে নাটোরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সেখান থেকে কিছুদূর আসার পরে রাস্তার মধ্যে যাত্রীদের দেখিয়ে শুকনো খাবার ও কোমল পানীয় ক্রয় করে। পরবর্তীতে তারা তাদের ট্রাকে পূর্ব থেকেই রাখা ঘুমের ঔষধ মিশ্রিত অনুরুপ শুকনো খাবার ও কোমল পানীয় কৌশলে পরিবর্তন করে এই ৫জনকে খাইয়ে অজ্ঞান করে তাদের কাছে থাকা সবকিছু লুট করে নেয়।
এ সময় একজন যাত্রী অজ্ঞান পার্টির দেয়া খাবার না খাওয়ায় তাকে বেধড়ক মারধর করে এবং কুমিল্লার দাউদকান্দি ব্রীজ পার হয়ে প্রথমে ৩ জন যাত্রীকে অজ্ঞান অবস্থায় রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। এরপর কিছুদূর আসার পর অজ্ঞান না হওয়া যাত্রীকে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। সবশেষে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে এসে এশিয়ান হাইওয়ে রোডের পশ্চিম পার্শ্বের ঝোপঝাড়ের মধ্যে জাহিদুল ইসলামকেও অজ্ঞান অবস্থায় ফেলে দেয়। কিন্তু তাকে ফেলার আগে অজ্ঞান অবস্থায় তার কাছে টাকা পয়সা বেশী ছিল না বলে আসামীরা ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে তাকে উপুর্যপুরি কিল ঘুষি ও প্রচন্ড মারধর করে। র্যাবের ধারণা ঔষধের বিষাক্ত প্রভাব এবং প্রচন্ড মারধর করার ফলে জাহিদুলের মৃত্যু হয়েছে।
গ্রেফতারকৃতদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায় যে, তারা প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর যাবত ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় কখনও এককভাবে আবার কখনও সংঘবদ্ধ হয়ে যাত্রীদের খাবারের সাথে ঘুমের ঔষধ মেশানোসহ বিভিন্নভাবে অজ্ঞান করে টাকা ও মূল্যবান সামগ্রীসহ তাদের সর্বস্ব হাতিয়ে নিত।
ক্রাইম ডাটাবেজ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন থানায় বিভিন্ন অপরাধে সাইফুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে বলে সত্যতা খুঁজে পাওয়া গেছে।
সাইফুলের বিরুদ্ধে গাইবান্ধার সাঘাটা থানায় চেতনানাশক ঔষধ খাইয়ে চুরি করার অপরাধে ২০১৬ সালে ২৯ নভেম্বর ১টি, ২০১৯ সালে জুয়া আইনে ১টি এবং ২০১৯ সালের ৩ এপ্রিল তারিখে বগুড়া সদর থানায় চেতনানাশক ঔষধ খাইয়ে চুরি করার অপরাধে ১টিসহ মোট ৩টি মামলা রয়েছে। এসব ঘটনায় সে বিভিন্ন সময় কারা ভোগ করেছে।
আসামী রনির বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানায় নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করিয়ে অটোভ্যান চুরি করার চেষ্টার অপরাধে ও ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর সাঘাটা থানায় প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করার অপরাধে ২টি মামলা রয়েছে। এই দুই মামলায় রনি ৩ বছর কারাভোগ করে।
আসামী মান্নান এর বিরূদ্ধে ২০২০ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানায় চুরি করার অপরাধে ১টি মামলা রয়েছে। এই মামলায় সে ৫ দিন কারাভোগ করে।
আসামী মামুন এর বিরূদ্ধে ২০০৬ সালে চুয়াডাঙ্গা জেলার জিআরপি থানায় ১টি, ২০০৮ সালে ৭ সেপ্টেম্বর নাটোরের লালপুর ও বড়াইগ্রাম থানায় নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন করিয়ে চুরি করার অপরাধে ২টি ও ২০২১ সালের ১১ জানুয়ারি নাটোর সদর থানায় একই অপরাধে ১টিসহ মোট ৪টি মামলা রয়েছে। মামুন এসব মামলায় মোট প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাভোগ করে। মামুন অজ্ঞানপার্টির এই চক্রের সাথে ২০ বছর যাবত সম্পৃক্ত আছে বলে স্বীকার করেছে।
উল্লেখ্য যে, একই দিনে উক্ত চক্রটি গাজীপুর চৌরাস্তা এলাকায় ৩ জন ব্যক্তিকে ঘুমের ঔষধ মিশ্রিত কোমল পানীয় মিরিন্ডা খাইয়ে অজ্ঞান করে ১৩ হাজার টাকা এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে এক গরু ব্যবসায়ীকে একই কায়দায় অজ্ঞান করে ১ লক্ষ ৩৪ হাজার লুট করে নিয়েছে বলে স্বীকার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট হস্তান্তর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানিয়েছে র্যাব।