হোম » প্রধান সংবাদ » আমার দেখা শ্রেষ্ঠ অবক্ষয়

আমার দেখা শ্রেষ্ঠ অবক্ষয়

 নাসিমা খাতুন রুপা: হিসেব মিলিয়ে কোন কিছু লেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বয়স তো প্রায় পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। এই সময়ের মধ্যে কত শত মূল্যায়ন আর অবমূল্যায়নের চিত্র যে চোখের সামনে ধরা দিয়েছে তার হিসেব কষা বড়ই কঠিন। আজ এমনই একটি পারিবারিক, সামাজিক অবমূল্যায়নের চিত্র তুলে ধরলাম আপনাদের সামনে।

“হায়রে জীবন” আধুনিক সমাজে এমন অবক্ষয়ের খুব প্রভাব চোখের সামনে দেখতে কার ভাল লাগে বলুন? নিঃশ্চয়ই আমার মত আপনাদেরও ভাল লাগবে না।

জানতাম, জীবন মানেই সংগ্রাম। কিন্তু আজকের সমাজে জীবন মানে একজন গৃহকর্তার জন্য তার সন্তানদের সম অধিকার টাকা পয়সা, বাড়ি, গাড়ি তৈরী করে দেওয়া। যিনি এই প্রতিযোগীতায় হেরে যাবেন- তার আর রক্ষা নেই। বৃদ্ধ বয়সে সন্তানদের হাতে, প্রতি পদে পদে লাঞ্চিত, কলঙ্কিত হওয়া, মারধর, বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া আরো কত কিছু। শেষ পর্যন্ত গৃহকর্তার অবস্থান হয় ভাঙ্গাঁ একটা রিক্সা নিয়ে রাস্তায় বেরুনো। তারপর বৃদ্ধের রিক্সায় সবাই চড়তে নারাজ। কারণ তার শরীরে শক্তি সামর্থ্য কম। সময় মত যথাস্থানে পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হন। এমন করতে করতে বৃদ্ধের ঠিকানা হয় সাড়ে তিন হাত জায়গা।

এবার আসুন, গৃহকর্তীর কথায়, যে মেয়েটি স্বামীর বাড়ি আসে লাল শাড়ী পড়ে আর বের হয় কাফনের কাপড় পড়ে। সেই মেয়েটিই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে পরিবারকে সুখী সমৃদ্ধ করে তুলতে জন্ম দেন সন্তান সন্তুতির। সে মা সন্তানদের দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে, বুকে আগলে রেখে বড় করেন। কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে। নিজে না খেয়ে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেবার জন্য সে কী মায়ের ব্যস্ততা, ব্যকুলতা? এভাবে যখন সন্তানেরা বড় হয়, শিক্ষা নিয়ে কর্মজীবনে পর্দাপণ করেন তখনও কি মায়ের চিন্তা শেষ হয়? এবার সন্তানের জীবনে একজন সঠিক জীবন সঙ্গী খুঁজে দেওয়ার পালা। এভাবে গৃহকর্তী যখন কঠিন পরিশ্রম করে সন্তানদের আলোর পথ দেখান ততক্ষণে তার দেহে শক্তি সামর্থ্য শেষ হয়ে যায়। এমতাবস্থায় গৃহকর্তীর জীবনে নেমে আসে অন্তিম সময়। শুরু হয় করুণ ইতিহাসের আরও এক অধ্যায়।

আমি সমাজের সবার কথা বলছি না। দু-চারজন মানিয়ে চলতে পারেন বাকীদের অবস্থা আমার এই লেখনীর ধারাল অস্ত্রের মতই সত্য। ছেলের বউ ঘরে এসেই আর গৃহ কর্তাকে সহ্য করতে পারেনা। আলাদা হয়ে যাওয়া, খেতে না দেওয়া, নানা রকম অশ্লীল আচরণ, সব মিলিয়ে স্বর্গের মত সংসারটি হয়ে ওঠে নরক। গৃহকর্তী, যে সে তো না। মা তো জীবন দিয়ে সন্তানদের মঙ্গল কামনা করেন। তখন সব হিসেব মিলিয়ে গৃহকর্তী মা বলেন, বাবা বউমাকে কিছু বলোনা, আমাকেই না হয় আলাদা করে দাও। আমি বুঝতে পাচ্ছি আমার জন্য তোমাদের মধ্যে এত ঝামেলা হচ্ছে। তখন প্রিয় সন্তানটি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে মাকে বাড়ির পিছনের দিকে বেল গাছ তলায় একটি ঘর করে দেয়। তখন গৃহকর্তীর নাম হয় বুড়ি। তাকে ছেলের বউ বুড়ি বলে সম্বোধন করেন। নাতী নাতনীরাও বুড়ি বলে ডাকে কারণ ওদের আর কী দোষ বাবা-মায়ের শিক্ষাই তো বাচ্চারা দেখে শেখে। ছেলের বউরা বকাঝকা করে তিন বেলা ভাত পাঠায় বুড়ির ঘরে। দায় সারা মাত্র।

এভাবে চলতে থাকে অনাদরে, অবহেলায়, অধীক মানসিক চাপে ভারসাম্যহীনতায় ধীরে ধীরে বুড়ি চরম অসুস্থ্য হয়ে বিছানায় পড়ে যায়। তখন ছেলের বউরা এক হাজার টাকা মাইনে দিয়ে একটি মেয়েকে ঠিক করে দেয় বুড়িকে দেখাশোনা করার জন্য। এভাবে মুমূর্ষতার মধ্য দিয়ে কেটে যায় প্রায় নয় মাস।

এই ভাবে হয়তো বুড়ি তার ফেলে আসা স্মৃতিগুলোর সাথে, চরম আনন্দগুলো কীভাবে যে, হতাশায়, অবহেলায় আর অনাদরে পরিণত হয় সেই হিসেব মেলাতে মেলাতে বুড়ি বিধাতার দেওয়া তাঁর জীবনের শেষ সময়টুকু পর্যন্ত মেলাতে পারেনি। এবার বুড়ির জীবনের যবনিকাপাত হল। হঠাৎ সকাল বেলা বুড়ির জন্য ঠিক করা মেয়েটি এসে ঘরের দরজায় হাজারও কড়া নেড়েও বুড়িকে আর জাগাতে পারেনি। রাত্রীর কোন এক প্রহরে বুড়ি হয়তো পানি চাইতে চাইতে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েছেন। “হায়রে জীবন, কোথায় আমাদের আশার আলো।”

(১ম পর্ব)

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!