হোম » প্রধান সংবাদ » টঙ্গীতে নাটোরের কামরুল হত্যাকান্ডের ভয়ঙ্কর কাহিনি

টঙ্গীতে নাটোরের কামরুল হত্যাকান্ডের ভয়ঙ্কর কাহিনি

মোস্তাফিজুর,নাটোর প্রতিনিধি:গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীতে ছিনতাইকারীর হাতে নিহত নাটোরের চাঞ্চল্যকর কামরুল ইসলাম হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৩ ছিনতাইকারীকে আটক করেছে র‌্যাব। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেঃ কর্ণেল মো. সারওয়ার-বিন-কাশেম। সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কারওয়ান বাজারে র‌্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য জানান। এর আগে র‌্যাব-১ এর একটি বিশেষ টিম তাদের রোববার রাতে আটক করে। র‌্যাব জানায়, আটক ছিনতাইকারীদের কেউ বাস ড্রাইভার, কেউ কন্ডাক্টর, কেউবা অটোরিকশা চালক। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তারা কাজ করেন। এরপর রাত গভীর হলে তারা ভয়ঙ্কর ছিনতাইকারী হয়ে যায়।

কাজের ফাঁকে যাত্রীবাহী বাসে নিয়মিত যাতায়াত করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের গতিবিধি অনুসরণ করেন তারা। কোন প্রতিষ্ঠান কবে বেতন-ভাতা দিবে সেই খোঁজ খবরও রাখেন। আর বাসে ভাড়া নেওয়ার সময় যাত্রীর কাছে কি পরিমাণ টাকা আছে এবং কোন ম‚ল্যবান সামগ্রী আছে কিনা সেটা অনুমান করার চেষ্টা করে। কোনো যাত্রীর কাছে মোটা অঙ্কের টাকা অথবা ম‚ল্যবান সামগ্রী আছে জানতে পারলে বাস থেকে সেই যাত্রী নেমে যাওয়ার পরপরই তারা দলের অন্য সদস্যদের যাত্রীর বেশ-ভ‚ষা ও কোথায় নেমেছে তার বিস্তারিত জানিয়ে দেয়।তারপর সযোগ বুঝে ছিনিয়ে নেন। বাধা দিলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভিকটিমকে মারাত্মকভাবে জখম করে যাত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। গাজীপুরের টঙ্গীতে ছুরিকাঘাতে কামরুল ইসলাম হত্যার ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে এই ভয়ঙ্কর ছিনতাই চক্রের সন্ধান পেয়েছে র‌্যাব।

গ্রেফতার করা হয়েছে চক্রটির তিন সদস্যকে, যারা জিজ্ঞাসাবাদে ছিনতাইয়ের জন্য আরএফএল কোম্পানির সিলেট জেলার জেনারেল ম্যানেজার কামরুলকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। গ্রেফতাররা হলেন- আব্দুল হক রনি ওরফে বাবু (১৯), মোঃ সুজন ওরফে শাহজালাল (২১) ও মোঃ আউয়াল হাওলাদার (২৬)। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, তারা একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্রের সক্রিয় সদস্য এবং প্রত্যেকে পেশাদার ছিনতাইকারী। এছাড়া তারা প্রত্যেকে যাত্রী পরিবহনের কর্মী। তাদের মধ্যে আসামি বাবু বাসের চালক, আউয়াল অটোরিক্সা চালক ও সুজন বাসের কন্ডাক্টর। জিজ্ঞাসাবাদে আব্দুল হক রনি (বাবু) জানান, তিনি সাত বছর ধরে আব্দুল¬াহপুর-বাড্ডা রুটের বাস চালাচ্ছেন। পাঁচ বছর ধরে তিনি মাদকাসক্ত। টঙ্গী থানায় তার নামে একাধিক ছিনতাই ও মাদক মামলা রয়েছে। ঘটনার রাতে তিনিই দলের সবাইকে ছিনতাইয়ের উদ্দেশে একত্রিত করেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ীই দলের সবাই আসামি আউয়ালের অটোরিকশায় বেরিয়ে পড়েন। পথে কামরুল ইসলামকে একাকী পেয়ে তারা আক্রমণ করেন।

এসময় আসামি সুজন ও আউয়াল অটোরিকশা নিয়ে দ‚রে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কামরুলের সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তির একপর্যায়ে আসামি রনি তার কাছে থাকা সুইস গিয়ার চাকু দিয়ে কামরুলের ডান উরুতে আঘাত করে এবং পালিয়ে যায়। আসামি সুজন জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, বাবু যে বাসের চালক, সেই একই বাসের কন্ডাক্টর সুজন। কাজের সুবিধার জন্যই তারা একই গাড়িতে কাজ করেন। বাবুর মতোই সুজনও সাত-আট বছর ধরে পরিবহন খাতে কাজ করছেন, জড়িত ছিনতাইকারী চক্রের সঙ্গেও। ছিনতাইকারী চক্রের অন্যতম পরিকল্পনাকারী তিনি। আসামি আউয়াল হাওলাদার জানায়, একসময় পোশাক কারখানায় কাজ করলেও ছিনতাইকারী চক্রের সঙ্গে জড়িত হওয়ার পর পেশা পরিবর্তন করেন তিনি। দিনে মাঝে মধ্যে দিনমজুর হিসেবে কাজ করলেও রাতে অটোরিকশা চালার তিনি। কামরুলকে ছিনতাইয়ের সময়ও তার অটোরিকশাই ব্যবহার করে ওই চক্র।

তার বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক ছিনতাই মামলা। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেঃ কর্ণেল মো. সারওয়ার-বিন-কাশেম জানান, ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত কামরুল নাটোর জেলার সদর থানাধীন শ্রীকৃষ্ণপুর গ্রামের মৃত আবুল কাসেমের বড় ছেলে। তিনি আরএফএল কোম্পানির সিলেট জেলার জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঘটনার দুই দিন আগে কামরুল ইসলাম সাপ্তাহিক ছুটিতে নাটোরে তার নিজ বাড়িতে যান। সেখান থেকে পরবর্তীতে ঢাকায় আরএফএল কোম্পানির প্রধান অফিসে অফিসিয়াল মিটিং এ অংশগ্রহণের উদ্দেশে রওনা হন। ৭ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে চারটায় কলেজ গেট এলাকায় পৌঁছলে অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জন ছিনতাইকারী ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাকে অতর্কিত আক্রমণ করে।

এ সময় ছিনতাইকারীদের বাধা প্রদান করায় তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ভিকটিমকে মারাত্মকভাবে জখম করে তার কাছ থেকে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও নগদ ৩৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। ছিনতাইকারীরা কামরুলের ডান উরুতে ধারালো ছোড়া (সুইচ গিয়ার) দিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। এসময় এলাকার লোকজন খবর দিলে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করে। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকান্ডের ছায়া তদন্ত করে র‌্যাব। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব নিশ্চিত হয় এটা সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের কান্ড। রোববার রাত আড়াইটার দিকে এরশাদনগর থেকে ছিনতাইকারীদের আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৩টি ধারালো সুইচ গিয়ার চাকু, হত্যার সময় ব্যবহৃত ১টি অটোরিক্সা ও ভিকটিমের ব্যবহৃত ১টি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।

 

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামিরা এ হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তিনি আরো বলেন, গাজীপুরের টঙ্গী কলেজ গেট এলাকায় ভোরে ছিনতাইকারী চক্রের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন আরএফএল কোম্পানির কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম (৩৫)। ঘটনাস্থলের দুইটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসি ক্যামেরা) ফুটেজে দেখা যায়, ছিনতাইকারীরা কামরুলের কাছ থেকে সবকিছু ছিনতাই করে নেওয়ার পর তাকে ছুরিকাঘাত করেন। ওই ফুটেজের স‚ত্র ধরেই ছিনতাইকারী চক্রটির তিন জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব)-১।

কামরুলকে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মোট পাঁচ জন অংশ নেয়। তিন জন কামরুলকে ছুরিকাঘাত, মারধর ও জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার কাজ করে। বাকি দু’জনের একজন রিকশাচালক, অন্যজন রিকশায় বসে ছিল। এদের মধ্যে ছিনতাইয়ে অংশ নেওয়া তিন জনের একজনকে (রনি) গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি দু’জনকে গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে। হত্যাকান্ডের ঘটনায় ভিকটিমের ছোট ভাই মোঃ আবুল কালাম মতিউর রহমান বাদী হয়ে টঙ্গী প‚র্ব থানায় অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!