
মোঃ শরিফ উদ্দিন: ‘এক বছর ধইরা কাম বন্ধ কইরা ফালাইয়া থইছে। অহন মেঘ বৃষ্টির সময় যেকোনো মুহূর্তে গাঙ্গে (নদী) ঢল আইয়া পড়ব। তহন বাড়িঘরেও পানি উঠব। আমগরের হিবার কষ্টের মধ্যে পড়ন লাগব’- এ কথা বলছিলেন ভোগাই নদী তীরের বাসিন্দা রমিজা বেগম।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী পৌর শহরের উত্তর গড়কান্দার ভোগাই নদীতে শহররক্ষা বাঁধের কাজ বেশ খানিকটা করার পর গত প্রায় ১০ মাস ধরে বন্ধ রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রিফাত এন্টারপ্রাইজ। এ অবস্থায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো), ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে ভোগাই নদীর ঢলে শহরের উত্তর গড়কান্দা এলাকায় নদীর ১০০ মিটার বাঁধ ভেঙে যায়। এই ভাঙন অংশ দিয়ে ঢলের পানি প্রবেশ করে চারটি মহল্লার প্রায় ৭০০ বাড়িঘরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
এ সময় বাঁধের সামনে বাগানবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে ভুক্তভোগী অনেক পরিবার স্কুলের
বারান্দায় এবং নিজ বাড়ি ছেড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নেন।
পরে ২০২২ সালে বাঁধটি সংস্কারে পাউবোর পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়। ৩৮ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয় ১১০ মিটার এ বাঁধ নির্মাণে। এ কাজের দায়িত্ব পায় রিফাত এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
গত বছরের ৪ মে বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু সময়মতো কাজ শুরু না করায় গত বছরের ১৭ জুন ফের পাহাড়ি ঢলে ওই ভাঙন অংশ দিয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে উত্তর গড়কান্দা, গড়কান্দা, গুনাপাড়া ও শিমুলতলা মহল্লায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এ সময় উত্তর গড়কান্দা এলাকায় ৫০০ মিটার সড়ক পানিতে ডুবে যাওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
পরে গত বছরের ২৩ জুন ১১০ মিটারজুড়ে ভাঙনের স্থানে পাইলিং করতে গাছের গুঁড়ি পোঁতাসহ ৪ হাজার ৩৫০টি জিও ব্যাগ প্রস্তুত করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এ সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না পাওয়ায় বাঁধে জিও ব্যাগ ফেলার কাজে বিলম্ব হয়। গত বছর জুন ও জুলাই
মাসে বাঁধ সংস্কারের ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু এর পরই সংস্কার কাজ ফেলে রেখে ঠিকাদার লাপাত্তা হয়ে যান।
সময় পেরিয়ে গেলেও ভাঙন অংশ সংস্কার না হওয়ায় এ বছর ফের পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন এলাকাবাসী। ৫৫ বছরের চাতাল শ্রমিক খোদেজা বেগম বলেন, ‘চাতালে কাম কইরা দিনে ২০০ টেহা পাই।
স্বামী অসুস্থ কামে যাইবার পায় না। কত কষ্ট কইরা দিন চালাই। শেষ সম্বল বাড়ি ভিডাটাও এর আগেরবার নদীয়ে ভাইঙ্গা নিয়া গেছে গা। গাছের খুডি আর ব্যাগ গুইলা কতদিন থাইক্কা ফেলাই রাখছে কাম তো করেই না আরও নষ্ট হইতাছে। বাঁধ না দিলে তো এইবারও ভাইঙ্গা নিয়া যাব গা।
এইবার বাড়ি ভাইঙ্গা নিয়া গেলে আর কই থাকমু।’ ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত ইউসুফ আলী বলেন, ‘মেলাদিন থাইক্কা ঠিকাদার অর্ধেক কাম কইরা আর কোনো খোঁজ খবর নেয় না। তহন যদি জিও ব্যাগ ফালানো অইত, তাইলে আমগর বাড়িঘর ভাঙতো না। বাঁধ ঠিক না হওয়ায় আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। এইবার পাহাড়ি ঢল আইলে কই থাকমু, কই যামু।’
এ ব্যাপারে পৌরসভার মেয়র আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘কাজটা তাড়াতাড়ি করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের
সঙ্গে আমি একাধিকবার যোগাযোগ করেছি। সামনে বর্ষা-বৃষ্টির সময় তাই দ্রুত কাজ শেষ করা না হলে ওই এলাকার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়বেন।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো.শাহজাহান বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে কাজটি বন্ধ রয়েছে।
তাকে একাধিকবার চিঠি দেয়া দেয়া হয়েছে কাজ সম্পন্ন করার জন্য। গত বছর জুন মাসে বাঁধ সংস্কার কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সে আগামী সাতদিনের মধ্যে কাজ শুরু করবে বলে কথা দিয়েছে।
এবার কাজটি না করলে তার কাজ বাতিল, জরিমানার পাশাপাশি লাইন্সেস কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।’
এ বিষয়ে রিফাত এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘বাঁধ সংস্কারের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ করা হয়েছে। স্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে জিও ব্যাগে ভরা বালুর মূল্য নিয়ে কিছুটা ঝামেলা হয়েছে।
এ কারণে কাজটি শেষ করতে বিলম্ব হয়েছে। আশা করছি সামনের সপ্তাহে বাকি কাজ শুরু করা হবে।’

আরও পড়ুন
আলফাডাঙ্গায় প্রবাসীর বাড়িতে হামলা ও লুটপাট, ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল
ক্ষেতলালে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান: ৩১ পিস ট্যাপেনটাডলসহ ২ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার
বাঘা পৌরসভার প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ঠিকাদারের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ