
হুমায়ুন কবির সুমন, সিরাজগঞ্জ : ঘুর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে ও তাড়াশ চলনবিলে আমন ধান পানিতে তলিয়ে আছে যে কারণে দুশ্চিন্তায় দিশেহারা কৃষক। ঘুর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে আকস্মিক বৃষ্টি ও দমকা বাতাসে সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার ৩০ হেক্টর জমির রোপা আমণ ক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে। দমকা বাতাসে আধাপাকা আমণ ধান পড়ে গেছে। অপরদিকে চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ঘুর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারনে ২৫ হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে।
ফসলি মাঠে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সরিষা আবাদে দুশ্চিন্তায় পড়েছে এ অঞ্চলের কৃষকরা। কারণ কার্তিক মাসের মাঝামাঝিতে সরিষা, গম, ভুট্টা, কালাইসহ বিভিন্ন ধরনের রবিশস্য চাষের উপযুক্ত সময়। কিন্ত হঠাৎ করে দুই উপজেলার ফসলি মাঠগুলোতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সরিষার আবাদ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
২৯ অক্টোবর (শনিবার) সরজমিনে কাজিপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ধানক্ষেতে ঘুরে দেখা গেছে, পড়া ধানগাছ বৃষ্টির জমানো পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এসব ধান এভাবে পানিতে পড়া অবস্থায় থাকলে একেবারে পঁচে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকগণ। এতে করে প্রায় অর্ধকোটি টাকার ক্ষতি হবে বলে ধারণা করছে উপজেলা কৃষি অফিস।
কাজিপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি আমণ মৌসুমে এবার উপজেলার ১২ ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার ১১ হাজার একশ হেক্টর জমিতে রোপা আমণ ধানের চাষ হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধেক জমির ধান আধাপাকা অবস্থায় রয়েছে। হঠাৎ করে দমকা বাতাসসহ বৃষ্টিতে ধানগাছগুলো মাটিতে পড়ে গেছে।
সোনামুখী গ্রামের কৃষক আব্দুল হান্নান জানান, “আমার জমিটি নিচু। প্রায় পাঁচবিঘা জমির আধাপাকা ধান বৃষ্টি আর দমকা বাতাসে মাটিতে পড়ে গেছে। বৃষ্টিতে ওই জমিতে পানি জমেছে। ফলে ধানগুলো পানিতে পড়ে দুইদিন পরেই পঁচে যাবে। এতে করে আমার অনেক ক্ষতি হবে।” মাইজবাড়ী চরের বর্গাচাষী ছকিম মিয়া জানান, “অনেক আশা হইরা জমি বর্গা নিয়া রোয়া (রোপা) ধান লাইছিলাম। এহন বিষটিত আর বাতাসে মাটিত সব ধানগাছ পইড়া গ্যাছে। আমার এহন চালানই উঠবো না।
কাজিপুর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ রেজাউল করিম বলেন, ‘এবার আমণের বাম্পার ফলন হয়েছে। আকস্মিক বৃষ্টি এবং বাতাসে ৩০ হেক্টরের মতো জমির ধান নষ্ট হাবার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য ফসলাদির তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। তবে পানি দ্রুত নেমে গেলে এই ক্ষতির পরিমাণ কমে যাবে।
২৮ অক্টোবর (শুক্রবার) সরজমিনে তাড়াশ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের ধানক্ষেতে ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির জমানো পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে সকল আমন ধান। এসব ধান এভাবে পানিতে ডুবে থাকলে একেবারে পঁচে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকগণ। এতে করে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হবে বলে ধারণা করছে উপজেলা কৃষি অফিস। তবে তারা এই ধানের ক্ষতির চেয়ে সরিষা আবাদে ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা দেখছেন বলে দুশ্চিন্তায় কুষি সম্প্রসারন ও কৃষক।
তাড়াশ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ লুৎফুন্নাহার লুনা বলেন, ঘুর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে আমার উপজেলার প্রায় ২৫ হেক্টর জমির আমন ধান ক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে। ফসলি মাঠে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সরিষা আবাদে দুশ্চিন্তায় পড়েছে এ অঞ্চলের কৃষকরা।কারন এ সময় আমাদের এখানে ধানের চেয়ে সরিষার আবাদ বেশি হয়ে থাকে। তাই পানি দ্রুত মাঠ থেকে নেমে না গেলে সরিষার আবাদে সব চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে। চলতি মৌসুমে উপজেলার আট ইউনিয়নে সরিষা আবাদের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ হাজার ২শত ৭০ হেক্টর জমি। এরমধ্যে টরি-৭, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৭, বারি সরিষা-১৮ ও বিনা সরিষা-৯ আবাদ করা হয় এ অঞ্চলে।
তিনি আরো জানান, গত বছরে বর্ষার পানি মাঠ থেকে আগাম নেমে যাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২১০ হেক্টর জমিতে বেশি চায় হয়। আর ওই সব জমিতে বারি-১৪ ও দেশি টোরি জাতের সরিষা চাষ হয়েছিল। এ বছর পানি এখনো না নামায় কিছুটা দুশ্চিন্তায় কৃষকেরা। পানি দ্রুত নেমে না গেলে এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যাঘাত ঘটবে।
উপজেলার সগুনা ইউনিয়নের মাকড়শোন গ্রামের কৃষক ফজলার রহমান জানান, কার্তিক মাসের মাঝামাঝিতে সরিষা, গম, ভুট্টা, কালাইসহ বিভিন্ন ধরনের রবিশস্য চাষের উপযুক্ত সময়। কিন্ত হঠাৎ পানি বৃদ্ধির কারণে ও মাঠ থেকে পানি নামতে দেরি হলে সরিষার আবাদ ব্যহত হওয়ায় শংকা রয়েছে।
উপজেলার মাগুড়া বিনোদ ইউনিয়নের মাগুড়া গ্রামের কৃষক শাহাদত হোসেন বলেন, সরিষার আবাদ দেরিতে হলে বোরো ধান চাষও পিছিয়ে যাবে। দেরিতে চাষ করা বোরো ধান অনেক সময় নিচু এলাকায় আগাম বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়।