
আল-হেলাল : ভারি বৃষ্টিপাত এবং ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীসহ সকল শাখা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিতীয় দফা বন্যায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জের মানুষ। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পানিতে শতভাগ প্লাবিত হয়েছিল পৌর সদরসহ জেলার ৬টি উপজেলা। ১৫ জুন বুধবার সকাল থেকে সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ পৌরশহরের ষোলঘর পয়েন্টে দিয়ে বিপদ সীমার ৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে ২০ জুন সোমবার পর্যন্ত বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত অতিক্রম করে। ৬ দিনের একটানা বন্যায় মানুষ,গবাদিপশু,হাঁসমুরগী,খাদ্যশষ্য,গোখাদ্য,পরনের কাপড় চোপড়,বইপত্র সিলিন্ডারসহ গ্যাসের চুলা,লাকড়িসহ জ্বালানী ও কাচা আধাপাকা বসতবাড়ী সবকিছুই বানের জলে ভেসে যায়। ১৯৭৪,১৯৮৮ ও ২০০৪ সালে বড় ধরনের বন্যা হয় সুনামগঞ্জে।
কিন্তু এবারের বন্যা অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। তবে সবাই বলছে প্রশাসন যদি পূর্ব থেকে এরকম বন্যার সতর্কবার্তা মাইকযোগে প্রচারাভিযান পরিচালনা করে সকলকে অবগত করতো তাহলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই লাগব করা যেত। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো, ভারতের মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় সুনামগঞ্জের সুরমাসহ সবকটি শাখা নদী ও হাওরের পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু অবস্থার যে এতটুকু অবনতি হবে তা পাউবোসহ কেউই ভাবতে পারেনি। জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়,পাহাড়ি ঢল ও টানা বর্ষণে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা,দোয়ারাবাজার,ধর্মপাশা,সুনামগঞ্জ সদর,দিরাই ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা বন্যা প্লাবিত হয়েছে।
পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার দোয়ারাবাজার,তাহিরপুর,বিশ্বম্ভরপুর,ধর্মপাশা ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। সম্প্রতি জেলায় আড়াইশরও বেশি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে পানি ঢোকায় তড়িঘড়ি করে ধান কেটে নিয়েছিলেন যেসব কৃষক,তারাও হয়েছিলেন নতুন বিপদের সম্মুখীন। অনেকের গোলার ধান পানিতে ভেসে গেছে। জেলা প্রশাসক,জেলা ও দায়রা জজ,জেলা পুলিশ সুপারের বাসভবন,বিদ্যুৎ অফিস,গ্যাস অফিসসহ শহরের সকল সরকারী বেসরকারী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পানিতে পুরোদমে নিমজ্জিত ছিল। টানা ৬দিন সারা দেশের সাথে সুনামগঞ্জের সকল ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন ছিল।
সুনামগঞ্জের তেঘরিয়া এলাকার বাসিন্দা আহমদ মিয়া বলেন, টানা বৃষ্টির আর পাহাড়ি ঢলে দ্বিতীয় দফায় বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আসবাবপত্রের ক্ষতি হয়েছে। তাছাড়া রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মানবেতর জীবন যাপন করছিল এলাকার মানুষ। সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বসতভিটা হারানো আব্দুস ছাত্তার বলেন,পাহাড়ি ঢলে আমার সব নিয়ে গেছে। আমার আর কিছুই বাকী থাকেনি। কাম কাজ করে টাকা জমিয়ে একটা ঘর করেছিলাম, কিন্তু আমার কষ্টের ঘরটাও পাহাড়ি ঢলে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো।
আমি একেবারে অসহায় হয়ে গেলাম। এরকম একটা ঘর কি আর আমি বানাতে পারবো? আমারতো এমন একটা ঘর করার মত ক্ষমতা নাই। এখন আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার। সুনামগঞ্জ শহরতলীর ইব্রাহিমপুর গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য মোঃ এমরান হোসেন বলেন,গরীবের কথা ভাসি হইলেও ফলে। আমরা বারবার বলছি পাহাড়,সমতল ও হাওড় এই তিনে মিলে সুনামগঞ্জ। পাউবো যদি বাঁধ করতেই হয় তাহলে তারা যেন জেলার হাওর অংশে বাঁধ করে। সুনামগঞ্জ সদর থানার সুরমা,জাহাঙ্গীরনগর ও রঙ্গারচর এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সলুকাবাদ ইউনিয়নের ধোপাজান চলতি নদীর পাড়ে বাঁধের কোন প্রয়োজন নেই বা ছিলনা।
কারণ এই এলাকায় যেমন বোরো ফসলের আবাদ খুব কম তেমনি নদীর দুই পারে বাঁধের কাজ করলে পাহাড়ী ঢলের পানি চারদিকে যেতে পারেনা। বাঁধের কারণে পানি বাধাগ্রস্থ হয়ে ধোপাজান নদী অতিক্রম করে সরাসরি একদিকে সুরমা নদীতে এসে প্রবল শ্রোতধারায় পতিত হয়ে প্রথমেই আঘাত হানে সুনামগঞ্জ পৌরসভা ও শহরতলীর ইব্রাহিমপুর মইনপুর হালুয়ারঘাট বাজারসহ সুরমা পাড়ের দুই তীরের জনবসতি বাজারসহ সরকারী বেসরকারী স্থাপনার উপর। তারপরও সরকারী বরাদ্দ লুটতরাজের উদ্দেশ্যে অপ্রয়োজনীয় বাঁধ দিয়ে বন্যার সৃষ্টি করেছে পাউবো ও পিআইসির লোকজনেরা। বাপ-পুতের পিআইসি দিয়ে সরকারী বরাদ্দ লুটপাটের এ মহোৎসবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সুরমা,জাহাঙ্গীরনগর ও রঙ্গারচর ইউনিয়নের লাখো মানুষ।
১৫-২০ জুনের দ্বিতীয়বারের বন্যায় মারাত্মক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় ইব্রাহিমপুরসহ নদীরপাড়ের গ্রামগুলিতে। ৩ ইউনিয়নের লোকজনের চলাচলের প্রধান রাস্তা ইব্রাহিমপুর-ডলুরা বোর্ডার হাট ও হালুয়ারঘাট রাস্তা প্লাবিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন এবারের দুদফা বন্যায় প্রথম ভিকটিম ইব্রাহিমপুর,সদরগড়,জগন্নাথপুর ও মইনপুর গ্রামের বাসিন্দারা। সুরমা ইউনিয়নের সংরক্ষিত ১,২,৩ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যা মোছাঃ তানজিনা বেগম রোকশানা বলেন,আমার বসতঘরে যখন বুক পর্যন্ত পানি উঠে তখন আমি আমার পরিবার পরিজন নিয়ে ইব্রাহিমপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুতালায় আশ্রয়কেন্দ্রে উঠি।
সেখানে আমার মতো শতাধিক বন্যার্ত পরিবার আশ্রয় নেয়। পরিবার পরিজন নিয়ে টানা ৩দিন অনাহারে থাকাবস্থায় ১৭ জুন শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় আমার পিতা জারীগানের শিল্পী আশরাফ আলী,আশ্রয় কেন্দ্রেই মারা যান। এবারের বন্যায় পিতা বসতঘর গবাদিপশু ইত্যাদি সবকিছু হারিয়ে আমরা একেবারে নি:স্ব হয়ে গেছি। সুনামগঞ্জ পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ডের সুলতানপুর গ্রামের বাসিন্দা মাফরোজা সিদ্দিকা বুশরা বলেন,দ্বিতীয় দফা বন্যার প্রবল ¯্রােত ১৫ জুন বুধবার ভোরে প্রথমেই আঘাত হানে জাউয়ার হাওরপাড়ের গ্রাম পূর্ব সুলতানপুরের আমাদের বসতঘরে। ২০ জুনের মধ্যে সারা পৌরশহর পানিতে তলিয়ে যায়।
আমাদের বসতঘরে যখন বন্যার পানি বুকের উপরে অতিক্রম করে তখন নিরুপায় হয়ে আমরা সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজ সংলগ্ন স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইন্সষ্টিটিউট এর নির্মাণাধীন ৫ তলা ভবনে উঠি। এবং এখানেই এখনও আশ্রয় কেন্দ্রেই অবস্থান করছি। বন্যার পানি না নামায় আমরা এখনও বাসায় ফিরতে পারিনি। দৈনিক সুনামগঞ্জ প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক আহমদুজ্জামান হাসান বলেন, গত ৬ দিনে বন্যা চলাকালে আমাদের উকিলপাড়াস্থ বাসায় গাড়ির পরিবর্তে নৌকা পার্কিং করা হয়েছিল। তিনি বলেন,সুরমা নদী খনন,অবৈধভাবে দখলকৃত খাল নালা উদ্ধার ও পৌরসভার ড্রেনেজ ব্যবস্থা পরিকল্পনা মাফিক না করা হলে ভবিষ্যতে প্রতিবছর এরকম বন্যার মোকাবেলা করতে হবে শহরবাসীকে। নতুবা শহরবাসীকে গাড়ীর পরিবর্তে বছরের ৩ মাস সময় জুড়ে নৌকা রাখতে হবে নিরাপদে চলাচলের ও জীবন জীবিকার প্রয়োজনে।
সাংবাদিক মিজানুর রহমান মিজান বলেন,চলমান দুর্যোগের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিদ্যুৎ গ্যাস ও মোবাইল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল সুনামগঞ্জে। মানুষ প্রাণ বাঁচাতে উচু ব্রীজে,বহুতল ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলো। কে কোথায় কি অবস্থায় ছিল এখনও কেউ জানেনা। সংবাদকর্মী মইনুল হক খান বলেন,সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মানুষ এখনও বন্যার পানিতে ভাসছে। বন্যার ৫ দিনেও কোন সহায়তা পায়নি হুরারকান্দা,সাহেবনগর,মুসলিমপুর,সদরগড় ও ইব্রাহিমপুরের মানুষ। বন্যা পরিস্থিতিতে কোন পণ্য সামগ্রী কেনার জন্য শহরে ও স্থানীয় বাজারগুলোতে বন্যার্তদের উপচেপড়া ভীড়ের সুযোগে কতিপয় অসাধূ ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধগতি আরোপ করেছিলো।
প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে। ২০ টাকা প্যাকেটের মোমবাতি ২শত টাকায়,২০ টাকার ল্যাম্প বাতি ১০০ টাকায়,১০০ টাকার হারিকেন ৫শত টাকায়,৫ টাকার সিগারেট ১৫ টাকায়,৬০ টাকা কেজির চিড়া ১৫০ টাকায়,মুড়ি কেজি প্রতি ২৫০ টাকায়,২০ টাকা লিটারের পানি ৫০ টাকায়,২০ টাকা কেজির আলু ৬০ টাকায়,৮০ টাকা কেজির ডাল দেড়শ টাকায়,৭০ টাকা লিটারের কেরোসিন ১০০ টাকায় বিক্রি করেছে শহরের চিহ্নিত সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা। এছাড়া ১৪০০ টাকা মূল্যের গ্যাস সিলিন্ডার ৪০০০ টাকায় বিক্রয় করা হয়েছে।
জেলা সদরের মধ্যবাজার,পশ্চিম বাজার,জেলা সদর হাসপাতাল পয়েন্টের দোকানগুলো এক একটা কসাই খানায় পরিণত হয়েছিল গত ৬দিনে। আবহাওয়া সতর্কীকরণ অধিদপ্তরের উদ্ধৃত্তি দিয়ে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, ১৫ জুন দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সকল প্রধান নদ-নদীসমূহের পানি সমতল বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে ৩৫ সেন্টিমিটার এবং নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা ও সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার সুমেশ্বরী নদীর পানি বিপদসীমার ৪২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিলো। ঐ সময়ে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ৮১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ফলে ৬ দিনের বিরতিহীন ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ী ঢলের পানিতে সুনামগঞ্জে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা শুরু হয়েছিলো।
উল্লেখ্য এর আগে প্রথম দফায় গত ১৭ মে মঙ্গলবার সকাল থেকে সুনামগঞ্জের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার ৩৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। প্রায় এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফা বন্যায় সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় ৫ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছিলো। সরকারী হিসেবেমতে জেলার ৭০ হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে ২৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিসংখ্যাণ নিরুপন করতে হলে প্রশাসনকে আরো সময় নিয়ে মাঠ পর্যায়ে জরীপ চালাতে হবে। তবে জেলার সকল শ্রেণিপেশার মানুষের অভিমত দ্বিতীয় দফা বন্যায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সুনামগঞ্জ। কেবলমাত্র দুর্যোগ পরবর্তী স্থায়ী পূণর্বাসন,নদীখনন ও বহুতল ভবনে মানুষের উপযুক্ত আশ্রায়নই এ ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা হলেও লাগব করতে পারে।