প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৪, ২০২৬, ৮:৩০ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ এপ্রিল ২৭, ২০২২, ৮:৫৭ অপরাহ্ণ
সাঁতারঃ আমার জীবনের অভিজ্ঞতা

আমার বয়স তখন তিন কি চার বছর। আমার অন্যতম খেলার সাথী ছিল রিয়া আপু,নিপা,দিনা,সোভা। নিপার বাসা ছিল আমার বাস থেকে ২ মিনিটের রাস্তা। হঠাৎ, একদিন দুপুরের শেষ সময় প্রচুর চিৎকার আর কান্নাকাটির শব্দ। বাসা থেকে বেরিয়ে শুনি মসজিদের পাশের পুকুরে ডুবে মারা গেছে নিপা। আমরা দ্রুত ছুটে গিয়ে দেখি ওর মা মসজিদের সামনে আঁচল পেতে মেয়ের জীবন ভিক্ষা চাচ্ছে। কিন্তু, হায় যে চলে যায় সে তো আর ফিরে আসে না।
মাত্র তিন আথবা চার বছর বয়সে একজন খেলার সাথীকে হারনোর যে বেদনা আজও আমার একুশ বছর বয়সি মনকে বিতারিত করে। মাঝে মধ্যে নিপার মা বড়োআম্মু আমাকে দেখলে বলে 'মা' আমি পুকুরে ডুবে গোসল করতে পারি না।
আমি তখন অষ্টম কি নবম শ্রেণিতে পড়ি। আমাদের স্কুলে সোয়াদ নামের একটা মেয়ে বাচ্চা প্রায় স্কুলে আসতো। আসলে স্কুলের পাশে ওর বাসা আর আমাদের প্রধান শিক্ষক এবং একজন সহকারী শিক্ষিকার ভাইয়ের মেয়ে। আমরা যখন সমাবেশে প্রতিদিন পিটি করতাম ও-ই পিচ্চি আমাদের পিটি করা দেখে হাসত। স্কুল থেকে পিকনিকে যাওয়া হয়েছিল মহাস্থানগড়ে। দুপুর ১২টা বাজে হঠাৎ করে শুনতে পেলাম, সোয়াদ পানিতে ডুবে মারা গেছে। আসলে সোয়াদ সবার সাথে পিকনিকে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু ওর মা ওকে আসতে দেননি। কারণ, কিছু দিন আগে সোয়াদ পুকুরে পরে গিয়ে হাত ভেঙ্গে গেছে।যার ব্যাথাটা এখনো ঠিক হয়নি। সোয়াদকে বলা হয়েছিল পরের বার যেতে দেওয়া হবে। আমরা সোয়াদের মৃত্যুর কথা শুনে সাথে সাথেই বাসে উঠেছিলাম। কিন্তু ফিরে এসে আন্টির অবস্থার কথা আমি বলে বা লিখে প্রকাশ করতে পারব না।
প্রথমে যে নিপার কথা বললাম, ওর একজন চাচাতো ভাই নাম মেহেদী। বয়স সাত অথবা আটের কম হবে না। ওদের পুরো পরিবার ঢাকায় থাকে। একদিন মেহেদী ওর আম্মুকে না বলে বন্ধুর সাথে নদীর ধারে গিয়েছিল। যখনি ঘাটে নেমেছে আর উঠতে পারেনি। ওকে যখন ঢাকা থেকে বাসায় আনা হয়েছিল সেই মহূর্তের অবস্থার কথা বলা দুর্বিষহ। আমার অবশ্য বাচ্চাটাকে বেশ ভালোই লাগতো। প্রতি ঈদে যখন ওরা বাসায় আসতো, পিচ্চির মুখে ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায় কথা শুনতে খুব ভালো লাগত।
আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে, ঈদুল ফিতরের আগের দিনের পড়ন্ত বিকেল। বাসায় ছোট ভাই,বোনদের হাতে মেহেদী লাগাচ্ছি। হঠাৎ, বিকট কান্নার আওয়াজ। বাসা থেকে বের হতে না হতেই শুনি একটা এগারো-বারো বছরের মেয়ে পানিতে ডুবে গেছে। আসলে ওরা নাকি পুরো পরিবার একদিন আগেই এসেছে গ্রামে ঈদ করবে বলে। বাচ্চটার মা বার বার বলতেছিলো আমার মেয়ে নতুন জামা কিনে নিয়েছে গ্রামের বাসায় ঈদ করবে বলে। প্রায় ১ ঘন্টা খোঁজ করার পরে বাচ্চাটাকে পাওয়া যায়। কারণ কিছুদিন আগেই ওই পুকুরটা থেকে বালু উঠানো হয়েছে। লিখতে লিখতে চোখে পানি চলে আসতেছে। আসলে সেদিন একসাথে তিনটা বাচ্চা পানিতে পরেছিল। রাস্তা দিয়ে যাওয়া সময় একজন লোক তা দেখে দ্রুত পানিতে নেমে দু'জনকে উঠাতে পেরেছে। আর, বাকীজন চিরতরে চলে গেলো।
আরো দুজন মামাতো, ফুপাতো ভাই বোন এক সাথে একি পুকুরে ডুবে মারা গেছে। সে কাহিনী আমি আর বর্ণনা করেতে পাচ্ছি না।
এই মৌসুমে আশেপাশের সব পুকুর, ডোবা, নদী পানিতে ভাসছে। তাই, খুব সাবধানে রাখবেন বাসার ছোটদের। যেমন টা দায়িত্ব নিয়ে বাচ্চাদের হাঁটতে, কথা বলতে শিখানো হয়। তেমনি সাঁতারটাও শিখাবেন।
হয়তোবা, বাচ্চাদের সাঁতার শেখানোর সময় কিছু বার পানি খাবে। কিছুক্ষণ পরে আবার ঠিক হয়ে যাবে। দীর্ঘ সময় পানিতে থাকলে হয়তো বা জ্বর হবে। সাধারণ সিরাপে কাজ না হলে, এন্টিবায়োটিক খাওয়ালে ঠিক হয়ে যাবে। অনেক বাচ্চার পুকুরের পানিতে এলার্জির সমস্যা হয়। বিশ্বাস করেন দীর্ঘায়িত চিকিৎসা করলে ঠিক হবে।কিন্তু, চিরতরে হারানোর ব্যাথা বলে বা লিখে শেষ করা যায় না।
লেখক: শারমিন আক্তার
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.