
শেখ হান্নান: ঘরের মধ্যে কাঁপাকাঁপা কন্ঠে আফসোস জড়ানো ভাষায় কথা বলছিলো বুলবুলি। শুনছিলো জুড়ান এবং জুড়ানের স্ত্রী পিড়পিড়ি। পানিতে ধোঁয়া নদীর শীতল বাতাস জানালা দিয়ে বয়ে গেলেও বুলবুলি কথায় জুড়ানের দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। জুড়ানের স্ত্রী যদি সাথে না থাকতো, তাহলে বুলবুলির মতো সেও তার না বলা কিছু কথা, যুদ্ধ শেষে তার ফিরে না আসার কথা বুলবুলিকে বলার সুযোগ পেতো। এই দুঃখ জুড়ানকে বেদনাভারাক্রান্ত করে তুলেছিলো। বুকের মধ্যে এক চাপা যন্ত্রণা খচখচ করে বিঁধতে ছিলো তার। বুলবুলির প্রিয় মানুষটিকে আজ থেকে প্রায় ৪০/৪৫ বছর পর, তার সামনে পেয়েছে।
আবেগে উচ্ছ্বাসে পাগল হলেও লোকলজ্জার ভয়ে নিজেকে সংযত করে বললো-
-করাতি, সবই কপাল। কপালে নাই তাই
হয় নাই। এইডাই হয়তো ভালো। ওই সব
থাইক। বউ নিয়া বেড়াইতে আইছেন,
আমার কপাল ভালো আপনার বউরে
দেইখা চক্ষু জুড়াইলাম, অনেক শান্তি
পাইলাম। কপালের নাম গোপাল
বয়াতি! আমার কপাল! বুলবুলি আরো কিছু বলতে চেয়েছিলো। বুদ্ধি করে কথা আড়াল করে সামনে এগিয়ে হাজারো জং ধরা, মরিচার আস্তর পড়া, বাঁশের খোলে মোড়ানো লৌহপাত টেন এনে জুড়ানের সামনে মেলে ধরে বললো-
-ধরেন! মুক্তিযুদ্ধের সময় এই করাত
আমার বাপের কাছে রাইখা চৈলা
গেছিলেন। দ্যাখেন জিনিস ঠিক আছে কিনা?
জুড়ান স্তম্ভিত! বিশ্বাস হচ্ছিলো না। হ্যাঁ ঠিক আছে! এটা তার সেই করাত! কত স্মৃতি এই করাতে। এইটাতো তার ফেলে যাওয়া সেই করাত! জুড়ান কাঁপানো হাতে করাতটি ধরামাত্রই একটি টিকটিকি করাতের মাথা থেকে লাফ দিয়ে পিড়পিড়ির মাথায় পতিত হওয়ায় সে ভয়ে দৌড়ে ঘরের বাইরে চলে গেলে। জুড়ান ঘরের বাইরে যাবার জন্য এক কদম সামনে এগুতেই বলবুলি আবার বললো-
-খাড়ান! জুড়ান শরীরটা ঘুরিয়েই দেখলো বাঁশের চুঙ্গার মধ্য থেকে পুরাতন কাপড়ে মোড়ানো একটি ক্ষুদ্র পুটলি বের করে জুড়ানের হাতে দিয়ে বললো-
-দ্যাখেন! আমার বাপের কাছে যে
আমানত রাখছিলেন, তা ঠিক আছেনি! অন্তরের মধ্যে চৌদ্দবছর বয়সে বুলবুলির অন্ধ ভালোবাসার যে ক্ষত হয়েছিলো, সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে সেইক্ষত আজকে আবার নতুন করে জেগে উঠলো। জুড়ান ভাবতে ছিলো কী আছে ওই পুটলিতে? কী থাকতে পারে? মনে ভয় পাচ্ছিলো তার। সে ধীরস্থির ভাবে পুটলির গিঁট খুলে দেখলো-১৯৭১ সালে জিন্নাহর ছবি যুক্ত পাকিস্তান আমলের দুইটি দশ টাকার নোট।
সেই সময় দশ দশ কুড়ি টাকা অনেক টাকা! তার স্পষ্ট মনেপড়ে গেলো বুলবুলির বাবা চৈতা খার কাছে এই টাকা জমা রেখছিলো। জুড়ান বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেলো। বুলবুলির বাবা চৈতা খাঁর প্রতি অপার শ্রদ্ধা আর পরম ভক্তিতে নিজেকে অপরাধী মনে হলো। এমন বিশ্বাসী মানুষকে কেনো সে মূল্যায়ণ করেনি। হায়! চৈতা চাচা! আমার আমানত আমাকে ফিরিয়ে দিলেন কিন্তু আপনি যে আমানত আমার জন্য রেখে ছিলেন, আমি আপনার সেই আমানত যথা সময়ে নিতে পারি নাই। আপনার বুলবুলিরে আমি নিজের কৈরা নিতে পারি নাই! আমি তার রাইখা যাওয়া পবিত্র আমানত রক্ষা করতে পারি নাই। জুড়ানের চোখের পানি আর লুকাতে পারলোনা। বুলবুলির দুহাত জড়িয়ে ধরে জুড়ান বলতে লাগলো-
-বুলবুলি তোমার হাত জড়িয়ে ধরার
অধিকার আমার নাই। কিন্তু আজ
আমি বড়ই অসহায় হয়ে তোমার হাত
ধরেছি। আমার স্ত্রী দেখছে তাতেও
আমার ভয় নাই। আমি যে হাত ধরেছি
এই হাতে চৈতা চাচার স্নেহের স্পর্শ
আছে। সে এতো বড় মহান মানুষ
আছিলো আমি বুঝি নাই বুলবুলি।
আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। চাচা
আমাকে এতো ভালোবাসতো আগে
বুঝিনাই। আমাকে মাফ কৈরা দিও।
আমি টুলটুলির কাছেও ক্ষমা চামু
!!চলবে!!
শেখ হান্নান
নাট্যকার লেখক।
আজিমপুর, লালবাগ।
ঢাকা -১২০৫.
১৮ জানুয়ারি, মঙ্গলবার,
২০২২খ্রিঃ।