
এম,এ রাশেদ,বগুড়া জেলা প্রতিনিধি: রক্তাক্ত সংঘাত-সংঘর্ষে শেষ হলো পঞ্চম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। বগুড়ার গাবতলীতে ৯টি ইউনিয়ন পরিষদের ৫ম ধাপের নির্বাচনে বালিয়াদিঘী ইউনিয়নের কালাইহাটা ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনার সময় ব্যালট পেপার ছিনতাইকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী নিহত হয়েছে। এছাড়া রামদার কোপে আরও একজন মারা গেছে। এসময় প্রশাসনের গাড়ি ভাঙচুরসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আহত হয়েছেন।
বুধবার (০৫ জানুয়ারি)ভোটের দিন সকালটা শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও বেলা গড়াতেই বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা। কেন্দ্র দখল, জালভোট, প্রতিপক্ষের এজেন্টকে বের করে দেয়াসহ ছিলো নানা অভিযোগ। ভোট গণনার সময়ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে বুধবার সকাল ৮টায় শুরু হয় ভোটগ্রহণ। যা চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রে ভিড় বাড়তে থাকে। তবে কেন্দ্রগুলোতে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কুয়াশা কেটে সূর্যের উঁকি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রগুলোতে বাড়তে থাকে বিশৃঙ্খলা। একে একে আসতে থাকে সংঘাত, অনিয়ম আর সংঘর্ষের খবর।
গাবতলী উপজেলায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহতরা হলেন কালাইহাটা গ্রামের মকবুলের ছেলে আলমগীর হোসেন (৪০), ইফাত উল্লাহর ছেলে আব্দুর রশিদ (৪৫), ছহির উদ্দিনের ছেলে খোরশেদ (৭০) এবং খোকনের স্ত্রী কুলসুম আকতার (৩৫)। গত ০৫ জানুয়ারি বুধবার রাতি ১০ টার দিকে গাবতলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো: জিয়া লতিফুর রহমান এই চারজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বুধবার সকাল ৮টা থেকে শুরু হয় গাবতলী উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ভোটগ্রহণ। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তার কারণে প্রায় ইউনিয়নে সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ চলছিল।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে বুধবার বেলা ২টায় রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের জাইগুলি হাইস্কুল ভোটকেন্দ্রের বাইরে ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য প্রার্থী ডাঃ সাহিদুল ইসলাম (টিউবওয়েল মার্কা) ও ইউপি সদস্য প্রার্থী ফেরদৌস হোসেন মিঠু (ফুটবল মার্কা) সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষ চলছিল। এ সময় স্থানীয় ফিন্যানশিয়াল অলনাইন’এর সাংবাদিক পরিচয় দেয়া বগুড়ার নিরাপদ সড়ক চাই এর সদস্য জাইগুলি গ্রামের মৃত নঈম উদ্দিন ওরফে লয়া মিয়ার ছেলে জাকির হোসেন জাকির (২৮) ওই সংঘর্ষের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করতে গেলে ফেরদৌস হোসেন মিঠুর লোকজন রামদার কোপে গুরুতর জখম করে। আহত জাকিরকে বগুড়া শজিমেক হাসপাতালে নিলে ওইদিন বিকেল ৩টায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ছাড়া ভোটগ্রহণ চলাকালে বেলা সোয়া ১১টায় রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের পাঁচকাতুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে নৌকা প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, ইট পাটকেল নিক্ষেপ ছাড়াও ৪টি ককটেলের বিস্ফোরণ ও কেন্দ্র দখলের ঘটনা ঘটে। এতে বেলা সাড়ে ১১টায় ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়ে যায়। ৩ঘন্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে প্রিজাইডিং অফিসার আমিনুল ইসলাম দুপুর আড়াইটায় পুনরায় ভোটগ্রহণ শুরু করেন। এছাড়াও রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের সাগাটিয়া ভোটকেন্দ্রে ৬টি, কালাইহাটা ভোটকেন্দ্রে ৩টি ও শুভপাড়া ভোটকেন্দ্রে ৪টি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
অপর দিকে বালিয়াদিঘী ইউনিয়নের কালাইহাটা ভোটকেন্দ্রে ভোট গণনার সময় আনুমানিক সাড়ে ৫টায় বালিয়াদিঘী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী ইউনুছ ফকিরের নেতৃত্বে নৌকা মার্কার সমর্থকরা ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা করে। এ সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে তিনজন পুরুষ ও একজন নারী মারা যান। এ সময় কমপক্ষে ৪০জন আহত হন। এছাড়াও রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটে।
গাবতলী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিয়া লতিফুল ইসলাম জানান, কালাইহাটা ভোটকেন্দ্র ভোট গণনার সময় ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের চেষ্টা করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে তিনজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা মারা গেছেন। এছাড়াও জাইগুলি ভোটকেন্দ্রের বাইরে দুই ইউপি সদস্য প্রার্থী সাহিদুল ও ফেরদৌস হোসেন মিঠু’র সমর্থকদের মারামারি চলাকালে জাকির হোসেন জাকির রামদার আঘাতে মারা যান।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত ৪জন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার বিষয়টি বালিয়াদিঘী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ নেওয়াজ জাকি জানান। বগুড়া র্যাব-১২ এর কর্মকর্তা মোঃ সাইফুল ইসলাম জানান, জাইগুলি হাইস্কুলের পূর্বপার্শ্বে দোকানের পেছনে বাজারের ব্যাগে রাখা পরিত্যক্ত অবস্থায় ৮টি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে।
গাবতলীর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রওনক জাহান জানান, তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিভিন্ন অভিযোগে ৪জনকে ৫হাজার ৮’শ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন। উপজেলার দূর্গাহাটা ইউনিয়নের বাইগুনি গ্রামের বাবলুর ছেলে নীরব (৩৫) এর কাছে ধারালো অস্ত্র (চাকু) থাকায় ৫ হাজার টাকা জরিমানা, মহিষাবান ইউনিয়নের মরিয়া গ্রামের ছলেমান শেখের ছেলে রুবেল (৩২) গাবতলী সদর ইউনিয়নের তরফসরতাজ ভোটকেন্দ্রে ঘোরাফেরা করায় ১’শ টাকা জরিমানা, ভোটকেন্দ্রে অবৈধভাবে মোটর সাইকেল চালানোর অপরাধে সাবগ্রামের মানিকের ছেলে রাকিবুল (৩০) এর কাছ থেকে ৩’শ টাকা এবং একই কারণে রামেশ্বরপুরের মৃত আবুল কালামের ছেলে খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছ থেকে ৪’শ টাকা জরিমানা আদায় করেন। এ দিকে, গুলিবিদ্ধ আব্দুল্লাহ (৪৫), ছহির উদ্দিন (৪৫) ও রাকিব হোসেন (১৬) কে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।