হোম » সারাদেশ » বাল্যবিবাহ ঠেকানো যাচ্ছে না কেন?

বাল্যবিবাহ ঠেকানো যাচ্ছে না কেন?

করোনার মহামারিতে প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর গত ১২ সেপ্টেম্বর খুলেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এর পরই প্রকাশ পাওয়া শুরু করেছে বাল্যবিবাহের ভয়াবহ চিত্র। এর মধ্যে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সারডোব উচ্চ বিদ্যালয়ের ভয়াবহ চিত্রটি সবার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। পত্র-পত্রিকার তথ্য মতে, ঐ স্কুলের নবম শ্রেণিতে ছাত্রী ছিল ৯ জন। করোনা মহামারিতে বিদ্যালয় বন্ধের সময় তাদের মধ্যে একজন ছাড়া বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে সব ছাত্রী। একই অবস্থা দশম শ্রেণিতে। চার ছাত্রীর মধ্যে তিনজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। বাদ যায়নি ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীরাও। ষষ্ঠ শ্রেণিতে একজন, সপ্তম শ্রেণিতে দুজন এবং অষ্টম শ্রেণির চারজনকে গোপনে বিয়ে দিয়েছে পরিবার।

এই বাল্যবিবাহ একটি চলমান সমস্যা। প্রতিনিয়ত দেশের কোথাও না কোথাও বাল্যবিবাহ হচ্ছে। শুধু কুড়িগ্রামে না যদি আপনার-আমার বাড়ির পাশের মাধ্যমিক বিদ্যালয় কিংবা মাদ্রাসা গুলোতে খোজ নেওয়া হয় তাহলে কমপক্ষে দুই-একটি বা তার বেশি বাল্যবিবাহের কথা শোনা যাবে, এই করোনাকালে। তাহলে দেশের মোট ৫৩ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গড়ে মাত্র ২ টি করে বাল্যবিবাহ ধরে হিসাব করলে সংখ্যাটা লাখের কোটায় পৌঁছে যায়। সত্যিই যদি এমন হয় তাহলে দেড় বছরে এক লাখ বাল্যবিবাহ উদ্বিগ্ন হওয়ার বিষয়। এই করোনা কালে যে মেয়েরা পড়াশোনায় তুলনামূলক পিছিয়ে যাদের বিশ্ববিদ্যালয় পড়া, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন ছিল না তাদের বাবা-মায়েরাই মুলত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলা ধরা হচ্ছে।

একবিংশ শতাব্দীর ২য় দশকে এসে ২১ বছরের আগে ছেলের বিয়ে ১৮ আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়া একটি অপরাধ এটা জানেন না এমন মানুষ খুজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু তারপরও বাল্যবিবাহ গুলো হচ্ছে। কেন হচ্ছে? কেন রুখতে পারছি না? এর দায়ভার কাদের?

আমাদের দেশে বাল্যবিবাহ প্রথম সমস্যা দারিদ্র্য। দারিদ্রের কারণে বিদ্যমান সামাজিক অবস্থায় নারীকে বোঝা মনে করা হয়। তাই বাবা-মা যতদ্রুত সম্ভব চায় মেয়ের বিয়ে দিতে। আর্থিক অবস্থায় একটু সচ্ছল পরিবার থেকে বিয়ের আলাপ আসলেই সেটা লুপে নিয়ে পিছুপা হয় না তারা। সাধারনত এক্ষেত্রে মেয়েদের অর্থনৈতিক অবস্থার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাল্যবিবাহে উৎসাহিত করে ছেলেদের পরিবার। দ্বিতীয় সমস্যা, বখাটেদের উৎপাত।

বখাটেদের উৎপাতে বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পান না। ফলে সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে অনেক অভিভাবকেরা মেয়েদের বিয়ে দেন। নিরাপত্তার অভাবে অনেক সময় বাবা-মা মেয়েদের স্কুলে পাঠাতেও চান না। তাঁদের মধ্যে যৌন হয়রানি হওয়ার ভয় কাজ করে। এছাড়া সব থেকে বড় সমস্যা অনেক অভিভাবক বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন নন। এমনও অনেক পরিবার থাকে যারা ছেলের বিয়ের কথা চিন্তা করে এ জন্য যে সংসারে বাড়তি একজন কাজের মানুষের প্রয়োজন। আবার কখনও কখনও তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার প্রবনতা থেকেও বাল্য বিবাহের দিকে ঝুকে পড়ে গ্রাম্য পরিবারগুলো।

এছাড়াও অনেকে ইসলামের দোহাই দেয় বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে। তবে ইসলাম কখনো কারও ওপর কিছু জোর করে চাপিয়ে দেয় না। একজন মানুষ কী গ্রহণ করবে কী বর্জন করবে, এর জন্য বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় কোনো কিছু গ্রহণ করে, তাহলেই সেটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে। নয়ত নয়। উল্লেখযোগ্য এই কারনগুলো ছাড়াও আরও অনেক কারনেই বাল্য বিবাহ দেওয়া হচ্ছে ।

এই বাল্যবিবাহ রুখতে আইন আছে। আইনে অর্থ ও কারাদন্ডে মত শাস্তির কথা উল্লেখ আছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ অনুযায়ী কোন এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ কর্তৃক উল্লেখিত বয়স (ছেলে ২১ বছর, মেয়ে ১৮ বছর) পূর্ণ না হলে তা বাল্য বিবাহ বলে গন্য হয় এবং উক্ত বিবাহ ব্যাবস্থাপনার দায়ে ব্যবস্থাপকদের অনধিক ২  বৎসর ও অন্যূন ৬ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

প্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করলে তিনি অনধিক ২ বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড দন্ডিত হবেন এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক কোন নারী বা পুরুষ বাল্যবিবাহ করলে তিনি অনধিক ১ (এক) মাসের আটকাদেশ বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। এছাড়াও পিতা-মাতা, অভিভাবক অথবা অন্য কোন ব্যক্তি, আইনগতভাবে বা আইন বহির্ভূতভাবে বাল্যবিবাহ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে কোন কাজ করলে অথবা করার অনুমতি বা নির্দেশ দিলে অথবা স্বীয় অবহেলার কারণে বিবাহটি বন্ধ করতে ব্যর্থ হলে তিনি অনধিক ২ বৎসর ও অন্যূন ৬ মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

আপেক্ষিক দৃষ্টিতে এই আইন অনেক কড়া। তবু্ও  হরহামেশাই বাল্য বিবাহ হচ্ছেই। মানুষের কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই, ভীত হওয়া তো দুরের বিষয়। এর প্রধান কারন আইন আছে কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ নাই। এক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা, উপজেলা প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিকে দায়ী করা যেতে পারে। কারন বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ অনুযায়ী কোন ব্যক্তির লিখিত বা মৌখিক আবেদন অথবা অন্য কোন মাধ্যমে বাল্যবিবাহের সংবাদ প্রাপ্ত হইলে উপরের উল্লেখিত ব্যক্তি বর্গ উক্ত বিবাহ বন্ধ করার অথবা বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। হয়ত তাদের অবধি সংবাদ পৌঁছে না নয়ত তারা সংবাদ পাওয়ায় তৎপর হন না।

এছাড়া ঘটক, বিবাহ রেজিস্ট্রারদের এক্ষেত্রে দায়ী করা যায়। ঘটক বাল্যবিবাহসহ প্রায় সব ধরনের বিয়ের জন্য মেয়ে ও ছেলে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার কাজ করেন। রেজিস্ট্রাররা রেজিস্ট্রি করেন। কেউ বিবাহ রেজিস্ট্রারের কাছে এসে বললেন, তাঁর মেয়ের বয়স ১৯ বছর। কিন্তু দেখে মনে হলো, ১৫ বা ১৬ বছরের বেশি নয়। তখন রেজিস্ট্রাররা টাকার বিনিময়ে মেয়ের বয়স বৃদ্ধি দেখিয়ে বিয়ে দিতে বর এবং কনে পক্ষকে সহায়তা করে। কিংবা যারা বাল্য বিবাহে ইচ্ছুক তারা যে কোন উপায়ে জন্ম নিবন্ধনে মেয়ের বয়স টাকার বিনিময়ে বৃদ্ধি করে নেয় ।এর ফলে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে কাজীদের সচেতন না হওয়া ছাড়া উপায় নাই।

তবে বলতে গেলে, বাল্যবিবাহে যুক্ত পরিবার, পরিবারের বাইরের এলাকার আপনি আমি, নারী-শিশু নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন, বাল্যবিবাহ মেনে নেওয়া ছেলে মেয়ে, কাজী, ঘটক, স্থানীয় প্রশাসন আমরা সবাই দায়ী। কারন বাল্যবিবাহ রোধে বাংলাদেশ সরকারের হটলাইন আছে ১০৯. এখন মোবাইল সবার ঘরে ঘরে। কল করেই তথ্য দিলেই বাল্যবিবাহ রুখে দেওয়া যায়। এমন খবর সবার জানা। তবুও আমরা কল করি না। এক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ নিরোধে সর্বপ্রথম আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে। বাল্যবিবাহ রুখতে হলে আওয়াজ তুলতে হবে তালে তালে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নজরদারিতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং ঘটক ও কাজীদের শাস্তির আওতায় আনার ব্যাবস্থা গ্রহন করতে হবে। তাহলে কিছুটা হলেও বাল্যবিবাহের হার কমানো যেতে পারে।

এছাড়াও বাল্যবিবাহ বন্ধে শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।তাই মেয়েদের শিক্ষার ওপর বেশি জোর দিতে হবে। আবার এ শিক্ষা কর্মক্ষেত্রে কতটা কার্যকর, সেটাও দেখতে হবে। মেয়েরা চাকরি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে কি না, সেটাও দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেয়েদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

দরিদ্র পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে গেছে তাই ঝরে পড়া শিশুদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ, বাল্যবিবাহ যেন না হয়, সে জন্য জাতীয়ভাবে প্রচারণা চালানো। টেলিভিশন গুলোতে বারবার বাল্যবিবাহ নিরোধ প্রচারণা চালানো এবং বাল্যবিবাহের ফলে শারীরিক মানসিক সমস্যা সমুহকে হাইলাইট করে ভীতি জাগ্রত করার চেষ্টা করা ভীষণ জরুরি।

লেখক: সোয়াদুজ্জামান সোয়াদ,

শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস সাংবাদিক, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
শেয়ার করুন আপনার পছন্দের সোশ্যাল মিডিয়ায়
error: Content is protected !!