
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি:
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং স্থানীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে গত ২ জুলাই ২০২৬ স্থানীয় সরকার বিভাগ একটি নতুন নীতিমালা জারি করে। কিন্তু সেই প্রজ্ঞাপন কার্যকর হওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে তাঁর নিজ জেলায় পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকারি নীতিমালার সমান প্রয়োগ নিয়ে প্রশাসনিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপন নং-৪৬.০৬৭.০১৫.০০.০০.০৬৬.২০১৫-৫২৭-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ জেলা এবং স্বামী বা স্ত্রীর জেলা ব্যতীত অন্য যেকোনো জেলায় পদায়ন বা বদলি করা যাবে। নীতিমালার উদ্দেশ্য হিসেবে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, স্বার্থের সংঘাত পরিহার এবং স্থানীয় প্রভাবমুক্ত পরিবেশে সরকারি দায়িত্ব পালনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
কিন্তু ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে জারি করা এলজিইডির এক অফিস আদেশে সদর দপ্তরে কর্মরত নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) জাহানারা পারভীন-কে টাঙ্গাইল জেলা কার্যালয়ে পদায়ন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর স্থায়ী ঠিকানা টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলা। তিনি আরও জানিয়েছেন, তাঁর স্বামীও একই জেলার স্থায়ী বাসিন্দা। ফলে সদ্য জারি করা নীতিমালার আলোকে এই পদায়ন কতটা বিধিসম্মত—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এলজিইডি দেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন বাস্তবায়নকারী সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার সড়ক, সেতু, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিজ জেলায় দায়িত্ব পালনকে সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) এড়ানোর স্বার্থেই নতুন নীতিমালায় সীমাবদ্ধ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
এটি অবশ্য এলজিইডিতে নিজ জেলায় পদায়ন নিয়ে প্রথম বিতর্ক নয়। এর আগে লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. কাওসার আলম এবং নারায়ণগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসানুজ্জামান-কে নিজ জেলায় পদায়নের আদেশ দেওয়া হলেও পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করা হয়।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—একই ধরনের ঘটনায় একজনের ক্ষেত্রে বদলির আদেশ বাতিল হলেও অন্য ক্ষেত্রে তা বহাল থাকছে কেন? এ ক্ষেত্রে কি কোনো বিশেষ প্রশাসনিক অনুমোদন বা আইনি ব্যতিক্রম রয়েছে, নাকি একই নীতিমালার প্রয়োগে ভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহানারা পারভীন গণমাধ্যম কে জানান, তিনি ও তাঁর স্বামী উভয়েই টাঙ্গাইল জেলার স্থায়ী বাসিন্দা। তবে নতুন বদলি নীতিমালার সঙ্গে তাঁর পদায়নের সামঞ্জস্য সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এবিষয়ে টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুজ্জামান বলেন, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে একটি চক্রের মাধ্যমে এই বদলী করা হয়েছে। সরকারি বিধিমালা অনুয়ায়ী নিজ জেলায় কাজ করার কোন সুযোগ নেই।
এর ব্যতিক্রম হলে নানাবিধ জটিলতা দৃষ্টি হতে পারে বলে উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা।
বিশ্লেষকদের মতে, কোনো নীতিমালা জারির পর তার প্রথম দিকের বাস্তবায়নই সরকারের নীতিগত অবস্থান ও প্রশাসনিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটায়। একই ধরনের ঘটনায় যদি ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেখা যায়, তাহলে নীতিমালার সমান প্রয়োগ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং সংস্কার উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তাদের মতে, যদি এই পদায়নের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ আইনি ছাড়, সরকারি অনুমোদন বা ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত থেকে থাকে, তবে জনস্বার্থে তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অন্যথায় নতুন বদলি নীতিমালার কার্যকারিতা ও সমান প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে।
এখন সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন—সরকারের জারি করা বদলি নীতিমালা কি বাস্তবেই সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর, নাকি বিশেষ ক্ষেত্রে তার ভিন্ন ব্যাখ্যা বা প্রয়োগ হচ্ছে? এই প্রশ্নের স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট উত্তরই এলজিইডির বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়ায় জনআস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।