প্রিন্ট এর তারিখঃ জুলাই ৫, ২০২৬, ৭:১৪ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুলাই ৫, ২০২৬, ৪:৩৬ পি.এম

মোহাম্মদ খোরশেদ হেলালী
বাংলাদেশের জন্য ফিফার দেয়া উপহারের বিশ^মানের ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণ অবশেষে আলোর মুখতে যাচ্ছে! দীর্ঘ পাঁচবছর নানা ধরণের ‘রশি টানাটানি’র পর প্রকল্পের ‘খরা’ দূর হয়েছে। জমি নিয়ে দীর্ঘ জটিলতা কাটিয়ে প্রকল্পটির জন্য জমি বরাদ্দ সম্পন্ন হয়েছে। টেকনিক্যাল সেন্টারটি স্থাপনের জন্য কক্সবাজারের রামুর রশিদনগরে স্বপ্নতরী বিনোদন কেন্দ্রের পাশে মহাসড়ক লাগোয়া ১৫.২০ একর জমির বরাদ্দ পেয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেড়ারেশন (বাফুফে)। প্রকল্পটির জন্য ৮৮ কোটি টাকা (৬.৬ মিলিয়ন ডলার) বরাদ্দ করেছে ফিফা।
প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জমি বরাদ্দের ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমোদন সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করছে বাফুফে। রেজিস্ট্র সম্পন্ন হলেই শুরু হবে টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের কাজ। এমনটি জানিয়েছেন বাফুফে’র শীর্ষ কর্মকর্তারা।
উক্ত প্রকল্পে যা থাকবে :
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন , জাতীয় দল ও বয়সভিত্তিক দলগুলোর নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কোচিং শিক্ষা এবং ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট কার্যক্রমকে এক ছাতার নিচে আনতেই এই টেকনিক্যাল সেন্টার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন এই সেন্টারে থাকবে আন্তর্জাতিক মানের একাধিক প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ঘাসের ফুটবল মাঠ, জিমনেশিয়াম, চারতলা বিশিষ্ট আবাসিক ভবন, ক্লাসরুম এবং স্পোর্টস সায়েন্স সুবিধা, ইনডোর ট্রেনিং সুবিধা, স্পোর্টস সায়েন্স ও মেডিকেল ইউনিট, ফিজিওথেরাপি ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, ভিডিও অ্যানালাইসিস ল্যাব, কোচিং এডুকেশন সেন্টার, ডাইনিং ও কনফারেন্স সুবিধা, বয়সভিত্তিক দলের জন্য পৃথক আবাসন। এ কেন্দ্র থেকেই ভবিষ্যতে জাতীয় দল, নারী দল, অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-২০, অনূর্ধ্ব-২৩সহ সব বয়সভিত্তিক দলের দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ পরিচালিত হবে।
বাফুফে কর্মকর্তাদের মতে, এই টেকনিক্যাল সেন্টার চালু হলে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মানের স্থায়ী প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে উঠবে। এতে বিদেশে প্রশিক্ষণের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে, খেলোয়াড়দের বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত হবে, কোচ ও ম্যাচ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ উন্নত হবে এবং সারাদেশ থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে বাংলাদেশ ফুটবল নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে শুধু কক্সবাজার নয়, পুরো বাংলাদেশের ফুটবল উন্নয়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই টেকনিক্যাল সেন্টার স্থাপন হলে জাতীয় ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দু হবে কক্সবাজার!
# রামুর রশিদ নগরে ১৫.২০ একর জমি বরাদ্দ
# চূড়ান্ত অমুনোদনের জন্য ভূমি মন্ত্রনালয়ে ফাইল
# শিগগিরই অনুমোদনের প্রত্যাশায় বাফুফে
# সূচনা হবে ফুটবলের নতুন অধ্যায়
বাফুফে’র দাপ্তরিক সূত্রে জানা গেছে, বাংদেশের ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই টেকনিক্যাল সেন্টারটি উপহার দিচ্ছে ফিফা। ২০২২ সালে বাংলাদেশের জন্য এই ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার বরাদ্দ করে ফিফার নির্বাহী কমিটি। তখনই কাজ শুরু করতে নিদের্শনা দেয় বিশ^ফুটবলের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তারই আলোকে স্থান নির্ধারণের জন্য সারাদেশের বিভিন্ন স্থানের সমীক্ষা চালায় বাফুফে। সমীক্ষা শেষে সার্বিক উপযোগিতার ভিত্তিতে কক্সবাজারে বেছে নেয়া হয়।
এ ব্যাপারে বাফুফে’র প্রকল্প কর্মকর্তা তানভির আহমেদ ছিদ্দিকী দৈনিক আজাদীকে জানান, কক্সবাজারকে বেছে নেওয়ার পেছনে রয়েছে ভৌগোলিক সুবিধা, প্রশস্ত জায়গা এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনা। মহাসড়কের পাশে অবস্থান হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও সহজ হবে। এর অংশ হিসেবে ২০২২ সালেই কক্সবাজারে জমি নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রথমে রামু উপজেলার খুনিয়াপালংয়ে একটি জমি নির্ধারণ করা হয়। একই বছল জুলাইয়ে রামুর খুনিয়াপালংয়ে ২০ একর জমিটি বাফুফের অনুকূলে হস্তান্তর করে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ।
তিনি আরো জানান, বাফুফে সেখানে সেন্টার নির্মাণের প্রস্তুতি নিয়ে ফিফার কাছে এনভায়রনমেন্ট সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অ্যানালাইসিস রিপোর্ট পাঠায়। কিন্তু পরে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ জানায়, জায়গাটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে পড়ায় সেখানে নির্মাণকাজে পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে। একই সাথে পরিবেশ অধিপ্তরের আপত্তি ও পরিবেশ আইনবিদ সমিতি-বেলার সুপারিশে সেটি বাতিল হয়। এরপর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বাফুফেকে বিকল্প জায়গায় টেকনিক্যাল সেন্টার নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু এরপর বিভিন্নভাবে জমি খুঁজেও পাওয়া যায়নি। তিন বছর পর ২০২৫ সালে রামুর রশিদ নগরের ধলিরছড়া মৌজার খাস শ্রেণীর ১৫.২০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারণের পর জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে জমিটি বাফুফে’র নামে বন্দোবস্তমূলক ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টারটি নির্মাণে বরাদ্দ করা হয়। এক লাখ টাকা অনুদানে বরাদ্দ সম্পন্ন হয়।
এ ব্যাপারে প্রকল্পের স্থানীয় লিঁয়াজো কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ জানান, জমির জন্য ২০২২ সাল থেকে নানা প্রক্রিয়া চলে আসছে। তার জন্য বাফুফে’র শীর্ষ কর্মকর্তারা দফা দফায় কক্সবাজার আসেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের সুপারিশে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বর বাফুফের একটি উচ্চ পর্যায়ের দল পরিদর্শনে আসেন। দলটি রশিদনগরের ধলিরছড়া মৌজার জমিটি চূড়ান্ত করেন। উক্ত জমিটি তৎকালীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল জবর দখলে রেখেছিলেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার’র পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দীন বলেন, ‘জমিটি পাহাড় শ্রেণীর নয়। এছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নে গাছ-পালাসহ পরিবেশগত ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। পরিবেশ অধিদপ্তর সার্বিক সমীক্ষা করে ফুটবল টেকনিক্যাল সেন্টার স্থাপনে অনাপত্তিপত্র ইস্যু করেছে।’
কক্সবাজারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরান হোসাইন সজীব বলেন, ‘গত বছর (২০২৫) প্রকল্পটির জমি বরাদ্দে ব্যবস্থা নেয়ার দেয়ার জন্য যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়। সে মোতাবেক বাফুফে’র সাথে সমন্বয় করে জমি নির্ধারণ করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।’
বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান কামরুল হাসান হিলটন বলেন, ‘জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত্র স্থানীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকল্পের ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে অনুমোদনের পর বন্দোবস্তের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সাথে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, শিগগিরই অনুমোদন হয়ে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের নানা সংকট ও সীমাবদ্ধতার কারণে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি দীর্ঘসূত্রিতা হয়েছে। ফিফার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে আমরা দফায় দফায় সময় নিয়েছি। এতে একাধিকবার বাতিলের কথাও জানায় ফিফা। বহু অনুরোধ করে একাধিকবার চিঠি দিয়ে প্রকল্পটি রক্ষা করেছি। এমন সুযোগ হাতছাড়া হলে আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে যেতো। আমরা এবার সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় প্রকল্পটি দ্রæত বাস্তবায়ন করতে চাই।