রায়হানুল ইসলাম, বগুড়া
২১ জুন বগুড়ায় বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর শিশু রিফাত (৮) অপহরণ ও হত্যা মামলায় ৫ আসামির ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বগুড়ার বিচারিক আদালতে একসঙ্গে ৫ জনের ফাঁসির রায় ঘোষণার এটাই প্রথম ঘটনা। একই মামলার অন্য ৫ আসামিকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। দীর্ঘ ৮ বছর পর ঘোষিত এই ঐতিহাসিক রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন নিহত শিশুর পরিবারসহ বগুড়াবাসী।
রবিবার (২১ জুন) দুপুরে বগুড়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক মো. আনোয়ারুল হক জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।
বিশ্বকাপ ফাইনালের রাতে অপহরণ:
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৫ জুলাই বিশ্বজুড়ে যখন ফুটবল বিশ্বকাপ ফাইনালের উন্মাদনা চলছিল, ঠিক সেই রাতে নিখোঁজ হয় শিশু রিফাত। সে বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার গোহাইল ইউনিয়নের খাদাস বাজারের ব্যবসায়ী ও সাবেক কুয়েত প্রবাসী এনামূল হকের ছেলে।
সন্ধ্যা থেকে রিফাতকে খুঁজে না পেয়ে পরিবার ও গ্রামবাসী রাতভর সন্ধান চালায়। পরদিন সকালে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের পরামর্শে শাজাহানপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। জিডির পর পরই তৎপরতা শুরু করে পুলিশ।
৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার :
নিখোঁজের পরদিন, অর্থাৎ ১৬ জুলাই সকাল ৯টার দিকে রিফাতের বাবা এনামূল হকের মোবাইল ফোনে অজ্ঞাত পরিচয় থেকে কল আসে। অপহরণকারীরা রিফাতের মুক্তির জন্য ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং সেই টাকা নিয়ে জামাদারপুকুর বাসস্ট্যান্ডে আসতে বলে।
টাকা দাবির পর পুলিশি তদন্ত আরও বেগবান হয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এবং গোয়েন্দা তৎপরতায় জড়িতদের পরিচয় নিশ্চিত করে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে একাধিক সন্দেহভাজনকে আটক করা হলেও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা মুখ খোলেনি এবং রিফাতের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয়নি।
নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার ও মামলা:
অপহরণের তিন দিন পর, ১৮ জুলাই সকালে শাজাহানপুর উপজেলার পোয়ালগাছা ভদ্রাবতী নদীর সিংহবাড়ি ব্রিজের নিচ থেকে শিশু রিফাতের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সন্তানের মরদেহ পাওয়ার পর বাবা এনামূল হক বাদী হয়ে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে শাজাহানপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া:
দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে রবিবার আদালত এই রায় প্রদান করেন। রায় ঘোষণার পর আদালতের বাইরে অপেক্ষমাণ নিহত রিফাতের পরিবার অশ্রুসিক্ত চোখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। মামলার বাদী ও রিফাতের বাবা বলেন, "আমরা দীর্ঘ ৮ বছর ধরে এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলাম। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে, এখন দ্রুত রায় কার্যকর দেখতে চাই।"
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, একসঙ্গে ৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের এই রায় বগুড়ার বিচারিক ইতিহাসের একটি মাইলফলক, যা সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমাতে বড় ভূমিকা রাখবে।