প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ১৭, ২০২৬, ৭:৪০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ১৭, ২০২৬, ৪:৩৭ অপরাহ্ণ
পদ্মার চরে লাশের মিছিল: কাকন বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে উত্তপ্ত ৪ জেলার চরাঞ্চল

আবুল হাশেম
রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার বিস্তীর্ণ পদ্মার চরে থেমে নেই হত্যাকাণ্ড। কাকন বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও অবৈধ বালু উত্তোলনের টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে একের পর এক গোলাগুলি ও খুনের ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গত ১৫ জুন দিবাগত রাত থেকে ১৬ জুন ভোর পর্যন্ত লালপুরের রাইটার চরে গুলিতে নিহত হয়েছেন সাহাবুল প্রামাণিক, ৪২।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাকন গ্রুপের এক সদস্য জানান, কাকনের অবর্তমানে বাহিনীর দায়িত্ব পাওয়া ঈশ্বরদী পৌর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিলন চৌধুরী ও ঝড়ু মস্তানের মৃত্যুর পর সশস্ত্র বাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত আবু বক্কর ওরফে কিলার বক্কারের মধ্যে অবৈধ বালু উত্তোলনের নিয়ন্ত্রণ ও টাকা ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ চরমে পৌঁছেছে।
তার ভাষ্যমতে, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে চার জেলার পদ্মার চরে কাকন বাহিনীর ছিল একক আধিপত্য। ইঞ্জিনিয়ার কাকন রাজনৈতিক সমর্থনে গড়ে তোলেন বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। এই বাহিনী দিয়ে তিনি চরের ফসলের জমি, বালু মহাল, চোরাচালান ও মাদকের কারবার নিয়ন্ত্রণ করতেন।
৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে কাকনের সাম্রাজ্য হুমকির মুখে পড়ে। তবে সুচতুর কাকন বিএনপির কিছু অসৎ রাজনৈতিক ব্যক্তি, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও প্রশাসনের একটি অংশকে হাত করে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। ৫ আগস্টের পর স্থানীয় কৃষক, রাখাল, জেলে ও নদীপারের সাধারণ মানুষের ওপর চাঁদা আদায় শুরু করলে প্রতিবাদ ও মামলা বাড়ে। ফলে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে।
গত ১৭ জুলাই ২০২৫ যৌথ বাহিনীর অভিযান পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কাকনের অংশীদার হিসেবে উঠে আসে মিলন চৌধুরী, লালপুর উপজেলা বিএনপি নেতা শিল্পী, ভেড়ামার বিএনপি নেতা ফাহাদ, বিপ্লব মালিথা, হেলাল, বাগাতিপাড়া উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম মোল্লা, আরআরপি গ্রুপের পরিচালক রফিক ও সাংবাদিক পায়েল হোসেন রিন্টুর নাম।
গত ২৭ অক্টোবর ২০২৫ দৌলতপুরের পদ্মা নদীর দুর্গম চরে এই বাহিনীর গুলিতে দুই কৃষক নিহত হলে শীর্ষ গণমাধ্যমে কাকনের ছবিসহ সংবাদ প্রকাশ হয়। এরপর প্রশাসন ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ নামে বিশেষ অভিযান চালায়। এরপর থেকে কাকন আত্মগোপনে চলে যান। চলতি বছরে লালপুরের দিয়াড়বাহাদুপুর বালু মহাল সরকারিভাবে ইজারা না দেওয়ায় কাকন বাহিনীকে রাতের আঁধারে চুরি করে বালু তুলতে হচ্ছে।
ঝড়ু মস্তান নিহত হওয়ার পর তার স্থলে দায়িত্ব পান কিলার বক্কার। মিলন চৌধুরী আগে থেকেই দায়িত্বে ছিলেন। ১৫ জুন রাতে লালপুরের রাইটার চরে চুরি করে বালু তোলার পর ভোরে টাকা ভাগাভাগি নিয়ে মিলন চৌধুরী বাহিনীর লোক ও কিলার বক্কারের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। সকাল ৭টার দিকে বক্কার মিলন চৌধুরীর লোকজনের ওপর হামলা করলে সাহাবুল প্রামাণিক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। আরেকজন নিখোঁজ রয়েছেন।
বর্তমানে কিলার বক্কার ও মিলন চৌধুরী বাহিনীর মধ্যে কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে।
শাহাবুলের মরদেহ উদ্ধার প্রসঙ্গে লালপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, “হত্যাকাণ্ডের ঘটনাসংক্রান্ত আমরা কোনো সূত্র এখনো পাইনি, শুধুমাত্র লাশ পেয়েছি। এটা খুন কিনা তা কনফার্ম না। ঘটনাস্থল নৌ পুলিশের আন্ডারে থাকায় লক্ষ্মীকুন্ড নৌ পুলিশ ফাঁড়ি লাশ উদ্ধার করে নিয়ে গেছে। ময়নাতদন্ত হবে। কেউ মামলা দিলে আইন অনুযায়ী তদন্ত হবে।”
লক্ষ্মীকুন্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পুলিশ পরিদর্শক মোঃ সেলিম মিয়া বলেন, “দুপুর ১২টার দিকে লালপুর থানা থেকে বিষয়টি জানতে পারি। পরে লালপুর রায়টা উত্তর চরে ভাসমান নৌকার ভেতর থেকে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল রিপোর্টের জন্য থানা হেফাজতে রাখা আছে, আইনি প্রক্রিয়া চলমান।
Copyright © 2026 GonoManusherAwaj.com-দৈনিক গণমানুষের আওয়াজ. All rights reserved.